আজকের লড়াই তাই স্রেফ খেতাব দখলের নয়, কোন শিবির তাদের ‘সবুজের অভিযান’ প্রজেক্টে অধিকতর সফল—সেই বার্তা পৌঁছে দেওয়ার দ্বৈরথও বটে!

পালমার-দেম্বেলে
শেষ আপডেট: 13 July 2025 12:28
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘আপনার দল কি কষ্ট পেতে প্রস্তুত? এই যে, পিএসজি কাল ম্যাচের আগাগোড়া বল পজেশন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখবে, সেটা মেনে নিতে মানসিক ও শারীরিকভাবে তৈরি তো?’
সাংবাদিকের কিছুটা অবমাননাকর, কিঞ্চিৎ ভিত্তিহীন প্রশ্ন মন দিয়ে শুনে ফের একবার রিপিট করার অনুরোধ জানালেন চেলসি ম্যানেজার এনজো মারেস্কা। দু’নম্বরবার কানে যেতেই ভেসে এল সংক্ষিপ্ত জবাব: ‘এই কথাগুলো আপনাকে কে বলল?’
মাঠের বাইরে চেলসি যতই ঝাঁজ দেখাক না কেন, যতই দলের অধিনায়ক রিস জেমস জোরগলায় দাবি করুন: শুধু পিএসজি নয়, গোটা ফুটবলবিশ্ব আজ অবাক হতে চলেছে, একথা অস্বীকারের কোনও জায়গা নেই, ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনালে ধারেভারে চেলসির চাইতে অনেক গুণ এগিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগজয়ী ফরাসি ক্লাব। যতই কনফারেন্স লিগে আত্মবিশ্বাসে টগবগ করুক না কেন, লন্ডনের টিম আজকের মহারণে ছাপমারা আন্ডারডগ!
যদিও ইতিহাস বলছে, সবাই নাকচ করে দিলে, জয়ের আশা ক্ষীণতম থাকলেই দাপট দেখায় চেলসি। বায়ার্ন মিউনিখ কিংবা ম্যাঞ্চেস্টার সিটির বিরুদ্ধে চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে কেউ কল্পনাও করেনি জিততে পারে। কিন্তু সবাইকে ভুল প্রমাণ করে খেতাব হাতে তুলেছিল নীল ব্রিগেড।
চেলসি এখনও পর্যন্ত ক্লাব বিশ্বকাপে ৮০ মিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি ঘরে তুলেছে। যদিও এনজো ফার্নান্দেজদের আসল লক্ষ্য সম্পদ উপার্জন নয়। তাঁরা চাইছেন মাঠে নিজেদের শক্তি প্রমাণ করতে। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ফাইনালে প্রতিপক্ষ পিএসজি। এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দল। যদিও চেলসি তাদের বিরুদ্ধে যে স্রেফ রক্ষণের খোলসে আটকে থাকবে না, কোচ এনজো মারেস্কা তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন। ডিফেন্সে দশ জন ভিড়িয়ে ‘বাস পার্ক’ করার কোনও প্রশ্ন নেই। ম্যাচের আগের সাংবাদিক সম্মেলনে তাঁর কণ্ঠে ভরপুর আত্মবিশ্বাস। বললেন, ‘ওরা বিশ্বের সেরা দল। তবু আমরা নিজেদের খেলা বদলাব না। মাঠে দেখা যাবে কী হয়!’
এর কারণও আছে। চেলসি অনেক সমালোচনা, চোট-আঘাত, কোচ নিয়ে নাটকীয় পালাবদলের মধ্যেও নিজেদের নীতি থেকে সরে আসেনি। ধৈর্য ধরে তরুণদের নিয়েই ভবিষ্যতের দল গড়েছে। ২০২৩ সালের গোড়াতেই চেলসি বোর্ড জানিয়ে দিয়েছিল, সাফল্য আসুক চায় ব্যর্থতা, দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যপূরণের কথা মাথায় রেখে এই পথই মেনে চলা হবে।
তাই পচেত্তিনোকে সরিয়ে এনজো মারেস্কার হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়। অভিজ্ঞতা কম হলেও ট্যাকটিক্সে পারদর্শী ইতালীয় ম্যানেজার আসার পর চেলসির ফুটবলে বাঁকবদল বেশ স্পষ্ট। ডান দিকের রক্ষণভাগে খেলা মালো গুস্তোর কথায়, ‘আগের চাইতে অনেক বেশি কৌশলগত ফুটবল খেলি। আর সেটা কোচের কারণেই সম্ভব হয়েছে!’
শুধু খেলা নয়, চেলসির রিক্রুটমেন্ট টিমও এখন অনেক গোছানো। পল উইনস্ট্যানলি, লরেন্স স্টুয়ার্ট, স্যাম জুয়েল, জো শিল্ডসদের নিয়ে তৈরি নতুন দল ট্রান্সফার মার্কেটে সফল। মূল স্কোয়াড আগের চাইতে অনেক নির্মেদ, ঝরঝরে।
হিসেব অনুযায়ী, চেলসি ক্লাব বিশ্বকাপে কমবয়সি টিমের তালিকায় দু’নম্বরে। এক নম্বরে পিএসজি। আজকের লড়াই তাই স্রেফ খেতাব দখলের নয়, কোন শিবির তাদের ‘সবুজের অভিযান’ প্রজেক্টে অধিকতর সফল—সেই বার্তা পৌঁছে দেওয়ার দ্বৈরথও বটে!
তবে চেলসির কাজ সহজ নয়। পিএসজি দানবীয় ফর্মে। চলতি টুর্নামেন্টে একের পর এক বড় ক্লাবকে হারিয়ে ফাইনালে এসেছে। ম্যানচেস্টার সিটি, লিভারপুল, আর্সেনাল, অ্যাস্টন ভিলা—চ্যাম্পিয়ন লিগ ও ক্লাব বিশ্বকাপে প্রিমিয়ার লিগের যতগুলো টিমকে বাগে পেয়েছে, সবাইকে টেক্কা দিয়েছে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে ইন্টার মিলানকে ৫-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর ক্লাব বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদকে ৪-০-তে হারানো মুখের কথা নয়। দুটো বড় ম্যাচই হাসতে হাসতে ট্রেনিং সেশনের মতো জিতেছে লুই এনরিকে বাহিনী। রিয়ালের ম্যাচে পাওয়া সহজ সুযোগ কাজে লাগালে ফলাফল ১০-০ হতে পারত, এমন মন্তব্যও শোনা গেছে!
আসলে পিএসজির ফুটবল ভয়ঙ্কর আক্রমণাত্মক। উসমান দেম্বেলে, ডেসিরে ডুয়ো, খভিচা কভারাত্সখেলিয়া—তিন ফরোয়ার্ড প্রতিপক্ষের রক্ষণে সুযোগ পেলেই হানা দেন। সঙ্গে আছে ভিতিনিয়া, ফাবিয়ান রুইজ আর জোয়াও নেভেসের মতো বিচক্ষণ ও টেকনিক্যালি পোক্ত মিডফিল্ডার।
তাই বলে কি আদ্যন্ত অপরাজেয় পিএসজি? ফিফার টেকনিক্যাল ব্রিফিংয়ে পর্তুগালের ম্যানেজার রবার্তো মার্টিনেজ জানিয়েছেন, ফ্রান্সের ক্লাবকে হারাতে হলে ‘ম্যান টু ম্যান’ প্রেস করতে হবে। সেটাও নিখুঁত ছন্দে। কারণ প্রেসিংয়ে একবার ভুল মানেই কাউন্টার অ্যাটাকে পিএসজি অবধারিতভাবে গোল করবে।
চেলসিও জানে প্রতিপক্ষ কতটা শক্তিশালী। তবু অকুতোভয় দলের ডিফেন্ডার লিভাই কোলউইল। বলছেন, ‘চেলসির হয়ে খেললে ভয় পাওয়া চলে না!’ সেই সঙ্গে যোগ করেন, ‘সবাই ভাবছে পিএসজি সহজে জিতবে। কিন্তু ওরাও জানে আমাদের আক্রমণভাগ কতটা ধারাল। আমরা নিজেদের বদলাব না। এত দূর এসেছি তো এভাবে খেলেই!’ কোচ মারেস্কাও সুরে সুর মিলিয়ে একই কথা বলেছেন, ‘পিএসজি ভয়ঙ্কর দল। কিন্তু প্রতিটি ম্যাচ আলাদা। আমরাও চেষ্টা করব নিজেদের সেরাটা দিতে!’
যদিও ময়দানে নামার আগে চোট ও দলবদলের ধাক্কায় কিছুটা হলেও বিভ্রান্ত চেলসি। দলের অন্যতম উইঙ্গার ননি মাদুয়েকে ক্লাব ছেড়ে আর্সেনালের পথে। ট্রান্সফার ফি ৫২ মিলিয়ন পাউন্ড। গোলকিপার পেট্রোভিচও বোর্নমাউথে পাড়ি দিচ্ছেন। নিকোলাস জ্যাকসনকে চাইছে এসি মিলান, যদিও স্ট্রাইকারের নামের পাশে আকাশছোঁয়া প্রাইস ট্যাগ ঝুলিয়েছেন টড বোহলি। পাশপাশি কপালের ভাঁজ বাড়িয়েছে চোট। রোমেও লাভিয়া আগেই ছিটকে গিয়েছেন। মইসে কাইসেডোর গোড়ালিতে চোট। শুক্রবারের অনুশীলনে তিনি পুরোটা করতে পারেননি। মারেস্কা জানিয়েছেন, ‘মইসে খুব গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। ওর খেলা নিয়ে সিদ্ধান্ত ম্যাচের দিনই নিতে হবে!’
তবু চেলসির হাতে অস্ত্রের কমতি নেই। কোল পালমার স্বভাবসিদ্ধ ছন্দে। পেদ্রো নেতো ও লিয়াম ডেলাপ কাউন্টার অ্যাটাকে ভয়ংকর। সেমিফাইনালে ফ্লুমিনেন্সের বিরুদ্ধে জোয়াও পেদ্রো দুটো গোল করে বুঝিয়ে দিয়েছেন, বড় মঞ্চে নজর কাড়তে তিনিও প্রস্তুত। মাঝমাঠে এনজো ফার্নান্দেজ ও কাইসেডোর তালমিলও বড় সম্পদ। ম্যাচ হবে নিউ জার্সির কাঠফাটা রোদে, প্রবল গরমে। ভরদুপুরে ফুটবলারদের দম ধরে রাখাই আসল চাবিকাঠি। কোলউইল সতর্ক করে দিয়েছেন, ‘এই অবস্থায় খেলাটা যদি বাস্কেটবলের মতো হয়—একবার এ দল, একবার ও দল আক্রমণ করছে—তাহলে কেউই শেষ পর্যন্ত টিকতে পারবে না!’
কিন্তু একটা না একটা ফয়সালা তো বেরিয়ে আসবেই। এনরিকে কাপ জিতলে জমকালো মুকুটে আরও একটা মাণিক্য জুড়বে। আর মারেস্কার শেষ হাসি হাসা মানে বিস্তর টাকা ঢেলে তরুণ ফুটবলারে দল সাজানোর প্রকল্পের আরও এক ধাপ এগনো। শেষবিচারে জিতটা তরুণের… সবুজের অভিযানের।