হতোদ্যম এমবাপে। হতবীর্য ভিনিসিয়াস। আর টাচলাইনে দাঁড়িয়ে হতবিহ্বল জাবি আলনসো। নিউ জার্সির ইস্ট র্যাদারফোর্ডের রোদজ্বলা দুপুরে পিএসজির মুহুর্মুহু হানায় বুদ্ধিভ্রষ্ট রিয়াল মাদ্রিদ।

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 10 July 2025 08:42
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দেখতে গেলে, ২৪ মিনিটেই ম্যাচ শেষ। ততক্ষণে দেয়াললিখন স্পষ্ট: আজ আর যাই হোক, ক্লাব বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে অতীতের মতো মহাকাব্যিক কামব্যাক করতে পারবে না রিয়াল মাদ্রিদ। শুধু তিন গোলে পিছিয়ে থাকাই নয়, ‘মনোবল’ নামক বস্তুটাও কর্পূরের মতো উবে গিয়েছে। হতোদ্যম এমবাপে। হতবীর্য ভিনিসিয়াস। আর টাচলাইনে দাঁড়িয়ে হতবিহ্বল জাবি আলনসো। নিউ জার্সির ইস্ট র্যাদারফোর্ডের রোদজ্বলা দুপুরে পিএসজির মুহুর্মুহু হানায় বুদ্ধিভ্রষ্ট রিয়াল মাদ্রিদ। বাকি ৬৬ মিনিট ধরে যা চলল, তাকে এককথায় ট্রেনিং সেশন বলা যেতে পারে। কিংবা উত্তর-আধুনিক পাসিং ফুটবলের চিত্রময় প্রদর্শনী। যার ফাঁসে খাবি খেলেন জুড বেলিংহ্যাম, অ্যান্তনি রুডিগাররা!
সকালেই বোঝা গেছিল দিনটা কেমন হতে চলেছে। রেফারির হুইসেল বাজার সঙ্গে সঙ্গে প্যারিস সাঁ জারমাঁ (PSG) যেন ঝড় তোলে। রিয়ালের ছন্নছাড়া রক্ষণ আর নড়বড়ে মাঝমাঠের ফাঁকে গলে আক্রমণ শানাতে থাকেন ভিটিনহা, উসমান দেম্বেলেরা।
যার অবধারিত ফল ১৭ মিনিটে ফাবিয়ান রুইজের গোল। এর চার মিনিট পরেই দেম্বেলের নিখুঁত ফিনিশ। খানিকক্ষণ বাদে ফের রুইজ। মাত্র ২৪ মিনিটেই স্কোরলাইন ৩-০! রিয়ালের দুর্ভেদ্য ডিফেন্স পিএসজির ত্র্যহস্পর্শে মোমের মতো গলে যায়। এতকিছুর মধ্যে অন্তত দুটি নিশ্চিত গোল রুখে দেন থিবো কুর্তোয়া। না হলে প্রথমার্ধের স্কোরলাইন আরও লজ্জায় ফেলত। ম্যাচের অন্তিম লগ্নে (৮৭ মিনিট) গনসালো রামোস গোল করে কফিনের শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন।
ম্যাচের নায়ক নিঃসন্দেহে উসমান দেম্বেলে। গোল করলেন। করালেন। পালকের ছন্দে উড়ে বেড়ালেন গোটা ম্যাচ। অন্যদিকে পুরনো ক্লাবের বিরুদ্ধে প্রথমবার মাঠে নেমে এমবাপে খেলেছেন ঠিকই, কিন্তু ট্রেডমার্ক ঝাঁজ দেখাতে ব্যর্থ। অতর্কিত প্রতি-আক্রমণে ও দেম্বেলের গতির সঙ্গে টেক্কা দিতে না পেরে রিয়ালের রক্ষণ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।
এই ‘স্টেটমেন্ট জয়ে'র পর বিশেষজ্ঞরা পিএসজির সঙ্গে গোয়ার্দিওলার বার্সেলোনা টিমের তুলনা টানছেন। তখন যেমন ছিলেন জাভি, ইনিয়েস্তা, বুসকেতস—এখন পিএসজির মাঝমাঠ সামলাচ্ছেন ভিটিনিয়া, জোয়াও নেভেস আর ফাবিয়ান রুইজ। এই তিনজনের অনবদ্য—কখনও কখনও কাব্যিক বোঝাপড়ায় রিয়ালের চুয়ামেনি, বেলিংহ্যাম, গুলের—কার্যত উধাও! মাঝমাঠ আক্ষরিক অর্থে প্লেস্টেশনের মতো অপারেট করেছে পিএসজি। মাস্টামাইন্ড অবশ্যই লুই এনরিকে। স্পেনের সংবাদপত্র ‘মার্কা’ দাবি তুলেছে, এবারের ব্যালন ডি'অর দেম্বেলে কিংবা ভিনিসিয়াসকে নয়, দেওয়া হোক পিএসজির ম্যানেজারকে! তিনি চালক, তিনিই নায়ক৷ দলের, ম্যাচের আসল ভাগ্যবিধাতা এনরিকেই৷
তথ্য বলছে, বল হারিয়ে ফেরত পেতে পিএসজির সময় লেগেছে গড়ে মাত্র ২৩ সেকেন্ড। রিয়ালের? ৪৫ সেকেন্ড। আর এখানেই প্রশ্নে নতুন কোচ জাবি আলোনসোর পরিকল্পনা৷ নয়া নিরীক্ষাই যেন আত্মঘাতী হয়ে উঠল। ভিনিসিয়াস ও এমবাপেকে একসঙ্গে আপফ্রন্টে খেলানোর সিদ্ধান্ত ভেঙে দিল আক্রমণের কাঠামো। দু’জনেই একই দিকে হানা দিচ্ছেন, জায়গা দখল নিয়ে সমস্যায় পড়ছেন।
মাঝমাঠে বেলিংহাম ও আরদা গুলেরকে খেলানো হল আট নম্বর হিসেবে। কিন্তু সেটা দুজনের কারও আসল পজিশনই নয়! গোটা ম্যাচ দুজনই আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগলেন।
তৃতীয়ত, গনসালো গার্সিয়াকে সেন্টার ফরোয়ার্ডে নামানোও ব্যুমেরাং। তিনি এতকিছুর তালেগোলে সাপোর্ট পেলেন না। রিয়ালের আগামী দিনের পোস্টার বয় দেয়ালে সাঁটা পোস্টারের মতোই চুপচাপ দাঁড়িয়ে দলের আত্মসমর্পণ দেখলেন।
আসলে রিয়ালের ভাঁড়ারে গোলাবারুদ অফুরান। লড়াইয়ের উপকরণের কমতি নেই। কিন্তু তাকে কখন, কীভাবে, কোন কায়দায় কাজে লাগাতে হবে—এই ধাঁধার উত্তর খুজতে হবে জাবিকে। এবং সেটা চটপট। রিয়াল মাদ্রিদ কোনও প্রজেক্টকেই সময় দিতে জানে না!
আক্রমণের পাশাপাশি রিয়ালের রক্ষণের হালও করুণ। হুইজেনের সাসপেনশন। মিলিতাও পুরো ফিট নন। ট্রেন্ট আলেক্সান্ডার-আর্নল্ডও দলে ছিলেন না। ফলে সব মিলিয়ে পিএসজির আক্রমণকে ঠেকানো কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তবে এই রক্ষণই যে আগামী মরশুমে রিয়ালের মুখ হবে না, তা নিশ্চিত। বুঝিয়ে দিয়েছেন জাবিও। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অল্প কথায় উত্তর, ‘এটা সবে শুরু। আমরা পরিবর্তন করব!’
যদিও তার সাক্ষী থাকতে পারবেন না লুকা মদ্রিচ। এই লজ্জার পরাজয় দিয়েই শেষ হল ক্রোয়েশিয়ান তারকার রিয়াল অভিযাত্রা। ১৩ বছর, ৫৯৭ ম্যাচ, ৪৩ গোল, ৬টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ট্রফি—এক বর্ণময় কেরিয়ারের অভিশপ্ত পরিসমাপ্তি। মাঠে নামেন ৬৪ মিনিটে। খেলেন ২৬ মিনিট। মাঠ ছাড়েন নতমুখে। দু'ফোঁটা চোখের জলও ঝরে পড়ে। জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেন জাবি।
রোববার নিউ জার্সিতেই ফাইনাল। সামনে চেলসি। ধারেভারে এগিয়ে পিএসজি। কিন্তু ইউরোপীয় ফাইনালে আন্ডারডগ হয়ে শুরু করলেই চেলসির ভোল বদলে যায়৷ ইতিহাস সাক্ষী। রবিবার অবশ্য তার উলটপুরাণই দেখতে চাইবেন এনরিক।