বিসিসিআই ফুটবলের আর্থিক পৃষ্ঠপোষক না হোক, অন্তত অনুপ্রেরণা দিক। কারণ ভারতীয় ফুটবলকে বাঁচাতে অর্থের চেয়ে বেশি দরকার স্বপ্ন, দিকনির্দেশ আর পেশাদার দৃষ্টিভঙ্গি! ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড পথ দেখাতে পারে, কিন্তু হাঁটতে হবে এআইএফএফকেই।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 10 November 2025 14:30
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ফুটবল-ক্রিকেটের জল-অচল ভেদরেখা মুছে গিয়েছে। আমি ঊন, তুমি ন্যূন—বলার দিন শেষ৷ আমার ভিত্তি জনপ্রিয়তা, তোমার অর্থবল। আমার দীপ্তি দুনিয়াজোড়া, তোমার ব্যাপ্তি তো স্রেফ গুটিকয় দেশে ছড়িয়ে—বলার জেদ ফুরিয়েছে! এক অদ্ভুত আঁধার ভারতীয় ফুটবলে। আই লিগের সমাধিতে গড়ে ওঠা প্রিমিয়াম ফুটবল টুর্নামেন্ট আইএসএল আপাতত বিশ বাঁও জলে। কিংবা এতটাই অতলে যে বিপত্তারণের দিশাটুকু মিলছে না! কোনও ক্লাব খেলোয়াড় তাড়াচ্ছে, শতাব্দীপ্রাচীন দল বন্ধ রেখেছে অনুশীলন৷ সামনে এগনোর রাস্তা বন্ধ৷ পেছন থেকেও আশ্বাস জোগাচ্ছে না কেউ।
এই পরিস্থিতিতে এক অদ্ভুত বিকল্প প্রস্তাব রেখেছেন ইস্টবেঙ্গলের শীর্ষ কর্তা দেবব্রত (নীতু) সরকার। তাঁর দাবি, এই ঘনঘোর অচলাবস্থা কাটাতে, লিগ চালু করে ভারতীয় ফুটবলে রক্তের জোগানে এগিয়ে আসুক ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড! বিসিসিআই বিশ্বের ধনীতম ক্রিকেট সংস্থা। তাদের কাছে আর্থিক বিনিয়োগ, যতটুকু প্রয়োজন, করাটা খুব একটা কঠিন কিছু না!
এই আবদার বা আর্জি—যাই বলি না কেন, শুনতে গালভরা। কিন্তু ফাঁক ভরাটে কতটা কার্যকর?
আসলে ভারতীয় ফুটবলের (Indian Football) এখনকার সংকটটা শুধু আর্থিক নয়, সাংগঠনিক। আইএসএল (ISL) তৈরি হয়েছিল বিপণনের মডেলে, খেলাধুলার মডেলে নয়। ২০১৪ সালে শুরু হওয়ার সময়েই প্রতিশ্রুতি ছিল—এটাই হবে ভারতের ‘ফুটবলের আইপিএল’। গ্ল্যামার, আতসবাজি, বলিউড, বিদেশি তারকা, কর্পোরেট ব্যানার—সব ছিল।
কিন্তু মাঠে বল গড়ানোর পর দেখা গেল, ভিত্তি দুর্বল। ক্লাবগুলো লাভের মুখ দেখল না। স্টেডিয়ামে দর্শক এলেও সিজনের শেষে হিসেব মেলেনি কারও। স্পনসররা হাল ছাড়ল, সম্প্রচারকারীরা আগ্রহ হারাল। যুব অ্যাকাডেমি, ইনফ্রাস্ট্রাকচার, প্রতিভা-গড়ার কাঠামো—সবই থেকেছে নামমাত্র। আইএসএল-এর মধ্যে ‘লং টার্ম প্ল্যানিং’ বলে কিছু ছিল না।
তাই আজ যখন এআইএফএফ (AIFF) ঘোষণা করছে, নতুন কমার্শিয়াল পার্টনার খুঁজতে তারা কোনও বিডই পায়নি, তাতে অবাক হওয়ার কিছু আছে কি? এর মানে তো স্পষ্ট, বাজারের আস্থা হারিয়েছে ভারতীয় ফুটবল। এবং সেটা একদিনের গল্প নয়!
এমন অবস্থায় নীতু সরকারের প্রস্তাব, আবেগতাড়িত হলেও, একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (BCCI) আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে, সেখানে পৌঁছাতে ওরা একটা স্পষ্ট রোডম্যাপ বানিয়েছিল। ১৯৮৩-র বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে প্রতিটি ধাপে পেশাদার মডেল তৈরি করেছে বিসিসিআই। রাজস্বের ভাগিদারি, সম্প্রচার অধিকারের ন্যায্য বণ্টন, ঘরোয়া ক্রিকেটে অর্থ বিনিয়োগ—এই সব মিলিয়ে নিট ফলাফল: আত্মনির্ভরতা।
তাহলে কি এই মডেল ভারতীয় ফুটবলে ব্যবহার করা যায়?
সমস্যা এখানেই। ক্রিকেটের বোর্ড এবং ফুটবলের ফেডারেশন—দু’টি সম্পূর্ণ আলাদা কাঠামো। বিসিসিআই কোনও সরকারি সংস্থা নয়। তারা একটি স্বাধীন, আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী প্রতিষ্ঠান। ফুটবল ফেডারেশন অবশ্যই অলিম্পিক কাঠামোর অংশ, সরকারের নীতির আওতায়। ফলে বিসিসিআই চাইলে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু দায়বদ্ধতা নেই।
তারপরও প্রশ্ন উঠবে—‘সাহায্য’ বলতে ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন নীতু? বিসিসিআই কি সরাসরি অর্থ দিতে পারে? নাকি পরামর্শ বা প্রশাসনিক সহযোগিতা?
বাস্তব বলছে, টাকার চেয়ে বেশি প্রয়োজন নীতির বদল। কারণ ফুটবলের রোগ শুধু তহবিলের ঘাটতি নয়—পরিকল্পনার অনুপস্থিতি। আইএসএল এখনও ফ্র্যাঞ্চাইজির হাতের খেলনা, ক্লাব কালচার বা কমিউনিটি স্পিরিট সেখানে উপেক্ষিত। কোনও লিগ দীর্ঘস্থায়ী হতে গেলে স্থানীয় ক্লাব, স্থানীয় দর্শক আর স্থানীয় প্রতিভাকে কেন্দ্র করে তৈরি হতে হয়।
বিসিসিআই তার ঠিক উল্টোটা করেছে—উপর থেকে নীচে নয়, নীচ থেকে উপরে গড়েছে স্ট্রাকচার। রঞ্জি, দলীপ, সৈয়দ মুস্তাক—প্রতিটি স্তর থেকে ক্রিকেটার উঠে এসেছে। আইপিএল এসেছে অনেক পরে, ভিত শক্ত হওয়ার পর। আইএসএল বিপরীত পথে হাঁটল—প্রথমে আতসবাজির ধামাকা, পরে বাস্তবের ধাক্কা।
তবে বিসিসিআই মডেল থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ:
১. ফুটবলে রাজস্ব ভাগাভাগির (revenue-sharing) একটা নির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে।
২. ক্লাবগুলিকে ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা বা ‘সেফটি নেট’দিতে পারে ফেডারেশন, যাতে বিনিয়োগকারীরা নির্ভয়ে ঢোকে।
৩. সম্প্রচার অধিকারের জন্য আলাদা টেন্ডার না ডেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে নিশ্চয়তা দেওয়া!
৪. আর সব থেকে বড় কথা, যুব ফুটবলে বিনিয়োগকে বাধ্যতামূলক করতে হবে—যেমন, ক্রিকেটে ঘরোয়া লিগে আওজন করা। এগুলো সফল হলে হয়তো বিসিসিআইয়ের ‘চেক’ লাগবে না—ওদের ‘বুদ্ধি’-ই যথেষ্ট!
তবে আরেক দিকও ভাবতে হবে। বিসিসিআই ক্রিকেটকে অর্থের দিক থেকে এত শক্তিশালী করেছে যে, অন্যান্য খেলার তুলনায় ব্যবধান বেড়ে গেছে ভয়ানকভাবে। কোনও বড় টুর্নামেন্ট, স্পনসর বা বিজ্ঞাপনদাতা স্বেচ্ছায় ফুটবলে বিনিয়োগ করতে চায় না। সেই জায়গা থেকে দেখলে, বিসিসিআইয়ের হাতে সাময়িক সহায়তা ফুটবলকে অন্তত অক্সিজেন দিতে পারে—প্রচার বাড়াতে পারে, কাঠামোগত সংস্কারে প্রাথমিক সাহায্য করতে পারে। যদিও দীর্ঘমেয়াদে সেটাই বিপদ। একবার ক্রিকেটের ছায়ায় ঢুকে পড়লে ফুটবল আর স্বাধীন হয়ে ওঠা অসম্ভব!
অতএব শেষমেশ দাঁড়াল এই: নীতু সরকারের প্রস্তাব হয়তো বাস্তবসম্মত নয়, কিন্তু প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যে প্রশ্নটা তুলেছেন, সেটাই আসল—ভারতীয় ফুটবলের এখন নিজেকে পুনর্গঠনের সময়। আইএসএল নামের বেলুন ফেটে গিয়েছে, এখন দরকার ভিত্তি মজবুত করা।
বিসিসিআই ফুটবলের আর্থিক পৃষ্ঠপোষক না হোক, অন্তত অনুপ্রেরণা দিক। কারণ ভারতীয় ফুটবলকে বাঁচাতে অর্থের চেয়ে বেশি দরকার স্বপ্ন, দিকনির্দেশ আর পেশাদার দৃষ্টিভঙ্গি! ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড পথ দেখাতে পারে, কিন্তু হাঁটতে হবে এআইএফএফকেই।