বাটুমিতে, দু’জন ভারতীয়ের ফাইনালে, অভিজ্ঞ ও অদম্য কোনেরু হাম্পিকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হলেন দিব্যা। যে হাম্পি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় মহিলা দাবার মুখ, দু-দুবার বিশ্ব র্যাপিড চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছেন, এশিয়ান গেমসে দু’টি সোনা যার ঝুলিতে, অলিম্পিয়াডেও সোনাজয়ী দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন যিনি, তাঁকে রুদ্ধশ্বাস টাইব্রেকারে হারানো নিঃসন্দেহে বড় মাপের সাফল্য।

দিব্যা ও ধোনি
শেষ আপডেট: 29 July 2025 11:00
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে যখন, সবাই ভাবছে ফিরে আসা অসম্ভব, ঠিক তখনই কামব্যাকের মন্ত্র বাতলে দিয়েছেন তিনি। কখনও ব্যাট হাতে, কখনও দস্তানা পরে উইকেটের পেছনে দাঁড়িয়ে।
আস্কিং রেট নাগালে এসেছে, তারপর সুবিশাল ছক্কায় ম্যাচ খতম করেছেন কিংবা অনিয়মিত বোলারের হাতে বল তুলে দিয়ে ভেঙেছেন বিপক্ষ শিবিরের জমে যাওয়া ব্যাটিং পার্টনারশিপ। সবটাই ঠান্ডা মাথায়, ধীরিস্থির মেজাজে সেরেছেন তিনি… মহেন্দ্র সিং ধোনি (MS Dhoni)।
ক্রিকেটের ময়দানে যে কায়দায় নিজস্ব ঘরানা তৈরি করেছেন মাহি, জুটেছে অনুরাগীদের দেওয়া ‘ক্যাপ্টেন কুলে’র তকমা, তার সঙ্গে দাবার বোর্ডে ভারতের উদীয়মান তারকা দিব্যা দেশমুখের (Divya Deshmukh) মিল পাচ্ছেন অনেকে। তাঁদেরই একজন শ্রীনাথ নারায়ণন (Srinath Narayanan)। দিব্যার ছেলেবেলার কোচ।
খেলার ধরন, মঞ্চ সব আলাদা। কিন্তু মিল একটাই—ধোনি ও দিব্যা দুজনেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। একজন বাইশ গজে, অন্যজন চৌষট্টি খোপে। গতকাল জর্জিয়ায় মহিলা দাবা বিশ্বকাপে (FIDE Women’s Chess World Cup) ভারতেরই পোড়খাওয়া দাবাড়ু, অভিজ্ঞ গ্র্যান্ডমাস্টার কোনেরু হাম্পিকে (Koneru Humpy) টানটান টাইব্রেকারে হারিয়ে পদক জিতেছেন নাগপুরের মেয়ে।
প্রাথমিক আবেগ ও উচ্ছ্বাসের পারদ নামতেই শুরু হয়েছে দিব্যার রণকৌশল ও সদ্যসমাপ্ত টুর্নামেন্টে তাঁর জার্নি নিয়ে কাটাছেঁড়া। যা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, নামকরা দাবাড়ুদের সামনে পড়েও কীভাবে সুকৌশলে তাঁদের কিস্তিমাত দিয়েছেন দিব্যা! অধিকাংশ সময়ই কড়া চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। কিন্তু মাথা ঠান্ডা রেখে নিজের ঘুঁটি সাজিয়েছেন, পালটা চাল চেলেছেন।
যদিও এই পরিণতি ও স্থৈর্য দেখে বিস্মিত নন শ্রীনাথ। বাটুমিতে, দু’জন ভারতীয়ের ফাইনালে, অভিজ্ঞ ও অদম্য কোনেরু হাম্পিকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হলেন দিব্যা। যে হাম্পি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় মহিলা দাবার মুখ, দু-দুবার বিশ্ব র্যাপিড চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছেন, এশিয়ান গেমসে দু’টি সোনা যার ঝুলিতে, অলিম্পিয়াডেও সোনাজয়ী দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন যিনি, তাঁকে রুদ্ধশ্বাস টাইব্রেকারে হারানো নিঃসন্দেহে বড় মাপের সাফল্য।
যদিও দিব্যার প্রাক্তন কোচ চেন্নাই থেকে ফোনে পিটিআই-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিরাসক্ত গলায় বলেছেন, ‘আগ্রাসী খেলোয়াড়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দিব্যা আরও পরিণত হয়েছে, আরও ভারসাম্য পেয়েছে। ক্লাসিক্যাল, র্যাপিড বা ব্লিট্জ—সব ফর্ম্যাটেই ও দুর্দান্ত!’
আর এরপরেই ধোনির প্রসঙ্গ টেনে তাঁর মন্তব্য, ‘ওর আসল শক্তি বড় ম্যাচে বোঝা যায়। যেমন ধোনি শেষ ওভারে ম্যাচ জেতাত, দিব্যাও তেমনই শেষ রাউন্ডে বা চাপের ম্যাচে নিজের সেরা খেলাটা বের করে আনে। ও দারুণভাবে চ্যালেঞ্জ সামলাতে জানে!’
দিব্যার সাফল্যের নজির অবশ্য নতুন নয়। অলিম্পিয়াডে তিন-তিনবার সোনা জিতেছেন। এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, বিশ্ব জুনিয়র ও বিশ্ব ইয়ুথ—সব জায়গায় পয়লা নম্বর। কিন্তু হাম্পি, কাতেরিনা লাগনো, তান ঝংগির মতো দাবা তারকাদের হারিয়ে বিশ্বজয় করাটা শুধু প্রতিভা দিয়ে হয় না, এর জন্য প্রয়োজন মনের জোরও।
ভারতের ৮৮তম গ্র্যান্ডমাস্টারকে যিনি হাতের তালুর মতো চেনেন, সেই শ্রীনাথ নারায়ণ বলেন, ‘ওর প্রতিভা আমি ২০১৮ সালেই বুঝেছিলাম। তবে আমাদের প্রথমবার দেখা হয়েছিল ২০১৬-তে। টিম যাচ্ছিল তুরস্ক, বিশ্ব অনূর্ধ্ব-১৬ অলিম্পিয়াড খেলতে। আমি কোচ ছিলাম। প্রথম সাক্ষাতেই বুঝে যাই, ও প্রতিভাবান!’ এরপর যোগ করেন, ‘ওই প্রতিযোগিতাতেই ইরানের বিরুদ্ধে শেষ রাউন্ডে দিব্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ জেতে। যার জন্য আমরা সিলভার মেডেল পেয়েছিলাম। বুঝে যাই, বড় মঞ্চে বাজিমাত সময়ের অপেক্ষা!’
২০২০ সাল পর্যন্ত শ্রীনাথের তত্ত্বাবধানে ছিলেন দিব্যা। কোভিডের সময় সেই যোগাযোগে ছেদ পড়ে। কিন্তু তাতে পারফরম্যান্সে পলি জমেনি। ‘২০২০ সালের অনলাইন অলিম্পিয়াডে চীনের বিরুদ্ধে আমাদের জয়ে ওর অনেকখানি অবদান। রাশিয়ার বিরুদ্ধে ফাইনালে ইন্টারনেট বিভ্রাটে ম্যাচ বন্ধ হলেও, দিব্যাই তখনও পর্যন্ত সবার চাইতে এগিয়ে ছিল!’ স্মৃতি ঘেঁটে বলেছেন শ্রীনাথ।
যদিও ২০২০ থেকে ২০২২—এই দু’বছরে ফর্ম কিছুটা থিতিয়ে যায়। সেই সময় থমকে যাওয়া পড়াশোনা ও কেরিয়ারে মন দেন দিব্যা। তেমন বড় মাপের কোনও টুর্নামেন্ট খেলেনি। দু’দিক সামলে এগনো কিছুটা কষ্টকর। তাই লেখাপড়ায় গতি এনে ফের পুরোদমে চৌষট্টি খোপের মঞ্চে নেমে পড়েন।
এই দানবীয় সাফল্যের পর আগামী লক্ষ্য নিয়ে কী ভাবছেন শ্রীনাথ? ‘আমি মনে করি, ওর মধ্যে মহিলা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। ও এখন ক্যান্ডিডেটস-এ খেলবে। আত্মবিশ্বাস ওর মধ্যে বরাবরই ছিল!’ ছাত্রী আর তাঁর গুরুকুলে না এলেও টার্গেট বেঁধে দিতে দু’বার ভাবছেন না দিব্যা দেশমুখের ‘ছেলেবেলার কোচ’!