ছোট ফরম্যাট, তারকা বনাম তারকা, বিতর্ক, সোশ্যাল মিডিয়ার হাইপ—সব মিলিয়ে টেনিসও বুঝে নিচ্ছে, শুধুই গ্র্যান্ড স্ল্যাম দিয়ে নতুন প্রজন্ম ধরা অসম্ভব।
.jpeg.webp)
গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 28 December 2025 17:06
দ্য ওয়াল ব্যুরো: নামটাতেই বিতর্ক। ‘ব্যাটল অফ দ্য সেক্সেস’। আধুনিক টেনিসে এই শব্দবন্ধ আবার ফিরছে! কেন্দ্রে, স্রেফ নারী-পুরুষ নয়… দুই সর্বার্থে বিপরীতমেরুর তারকা—মেয়েদের র্যাঙ্কিংয়ে আরিয়ানা সাবালেঙ্কা (Aryna Sabalenka) এবং অস্ট্রেলিয়ার বিতর্কপ্রবণ শো-ম্যান নিক কিরিয়স (Nick Kyrgios)। একদিনের এক্সিবিশন ম্যাচ। বদলানো নিয়ম। উদ্দেশ্যও স্পষ্ট—প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, আলোচনার জন্ম দেওয়া।
খেলা এক, সওয়াল অনেক: এই ম্যাচ নিছক বিনোদন? নাকি আড়ালে লুকিয়ে আধুনিক টেনিসের বাজার, লিঙ্গ রাজনীতি আর ‘স্পেকটাকলে’র জটিল সমীকরণ? পাঁচটি প্রশ্নে গোটা ছবিটা একটু খোলসা করা যাক।
কবে, কোথায়, কীভাবে?
সাবালেঙ্কা বনাম কিরিয়োস দ্বৈরথ আয়োজিত হবে ২৮ ডিসেম্বর, রবিবার। ভারতীয় সময় রাত ৯টা ১৫ মিনিটে (১৫:৪৫ GMT) খেলা শুরু। আয়োজন করা হচ্ছে দুবাইয়ের ১৭ হাজার আসনের কোকা-কোলা অ্যারেনায় (Coca-Cola Arena)। ভারতে লাইভ স্ট্রিমিং দেখা যাবে সোনি লিভে (SonyLIV)। কোনও ট্যুর ইভেন্ট নয়, এটিপি বা ডব্লিউটিএ র্যাঙ্কিংয়ের সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই। পুরো আয়োজনটাই একদিনের, স্ট্যান্ডঅ্যালোন স্পেকটাকল।
নিয়ম বদলে কেন এই ম্যাচ?
লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় ইউএসপি—নিয়ম। কারণ সাবালেঙ্কা নিজেই স্বীকার করেছেন, স্বাভাবিক নিয়মে কিরিয়সের মতো সার্ভ-নির্ভর খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে খেলা ‘অসম লড়াই’ হয়ে যেত। তাই আয়োজকরা ম্যাচটিকে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’-এ আনতে বেশ কয়েকটি পরিবর্তন এনেছেন। যেমন: দু’জনই পাবেন মাত্র একটি সার্ভ। দ্বিতীয় সার্ভ বলে কিছু নেই। সাবালেঙ্কার কোর্টের অংশ ৯ শতাংশ ছোট করা হয়েছে—পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গড়পড়তা পুরুষ খেলোয়াড়ের তুলনায় নারী খেলোয়াড়েরা প্রায় ৯ শতাংশ কম গতিতে কভার করেন কোর্ট। ম্যাচ হবে তিন সেটে। যদি দুই সেটের পরে ১-১ হয়, তবে ফয়সালা ১০ পয়েন্টের টাইব্রেকে।
সব মিলিয়ে ম্যাচটা এমনভাবে ডিজাইন করা, যাতে কিরিয়সের সবচেয়ে বড় অস্ত্র—ফার্স্ট সার্ভ—আংশিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয় আর বেসলাইন র্যালিতে সাবালেঙ্কার শক্তি কাজে লাগে।
সাবালেঙ্কার জেতার সম্ভাবনা কতটা?
তাত্ত্বিকভাবে, এই ম্যাচের জন্য সাবালেঙ্কার চেয়ে ভালো প্রতিযোগী আর কেউ হতে পারেন না। চলতি মরশুমে চারটি ট্রফি, ইউএস ওপেন জেতা, ৭১ ম্যাচে ৫৯ জয়—জমকালো পরিসংখ্যানে বর্তমান জমানার সবচেয়ে শক্তিশালী মহিলা টেনিস খেলোয়াড়দের একজন। সার্ভ গেম জেতার হারেও বিশ্বের সেরা পাঁচে।
তবে সাবালেঙ্কার খেলায় ঝুঁকি বিস্তর। বেসলাইন থেকে মারতে গিয়ে মাঝেমধ্যে অতিরিক্ত আগ্রাসী হয়ে পড়েন। যদিও গত এক বছরে ড্রপ শটের মতো বৈচিত্র্য খেলায় এসেছে। তিন সেটের ফরম্যাট এবং এক সার্ভের নিয়ম ম্যাচে টিকে থাকার বাস্তব সুযোগ এনে দেয়। সাবালাঙ্কার নিজের কথায়, ‘আমি ওর চেয়ে বেশি প্রস্তুত!’ আত্মবিশ্বাস স্পষ্ট। কিন্তু এই ম্যাচে জেতা-হারা আদৌ শেষ কথা নয়।
হারলে কি কিছু প্রমাণ হয়ে যাবে?
এই প্রশ্নটাই আসলে বিতর্কের কেন্দ্রে। সমালোচকদের একাংশের ভয়—যদি সাবালেঙ্কা পরাস্ত হন, তাহলে মেয়েদের টেনিসকে খাটো করার নতুন সুযোগ তৈরি হবে। সাবালেঙ্কা নিজে এই যুক্তি মানতে নারাজ। বক্তব্য, ‘এটা মজা করার জন্য। জেতা-হারা আসল কথা নয়।’
কিরিয়সও বিষয়টিকে হালকা রাখতে আগ্রহী। অতীতে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, বিতর্কিত মন্তব্য, এমনকি ২০২১ সালের এক স্বীকারোক্তিও ম্যাচের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। যুক্তি সোজা—এটা এক্সিবিশন। চাপমুক্ত তিনি। হারলেও ক্ষতি নেই। যা বলে দেয়—এই ম্যাচ কোনও সামাজিক বিপ্লবের দাবি করছে না!
১৯৭৩-এর সঙ্গে তুলনা কেন ভুল?
দ্বৈরথের নাম শুনে অনেকেই ফিরে যাচ্ছেন ১৯৭৩ সালে, যখন বিলি জিন কিং (Billie Jean King) হারিয়েছিলেন ববি রিগসকে। কিন্তু সেই ম্যাচ ছিল সামাজিক আন্দোলনের অংশ—সমান পারিশ্রমিক, নারীর মর্যাদা, লিঙ্গ বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। বিলি নিজেই বলেন, ‘এটা সেই ম্যাচ নয়।’ আজকের সাবালেঙ্কা বনাম কিরিয়স মূলত বিনোদন, সেলিব্রিটি কালচার আর নতুন দর্শক টানার প্রচেষ্টা। সামাজিক প্রেক্ষাপট বদলে গেছে। পাল্টেছে লড়াইয়ের মানও।
শেষ কথা: কেন এই ম্যাচ জরুরি?
এই লড়াই প্রয়োজনীয়। কারণ এর ফলে টেনিসের ভবিষ্যৎ বাজারকে দেখার সুযোগ তৈরি হবে। ছোট ফরম্যাট, তারকা বনাম তারকা, বিতর্ক, সোশ্যাল মিডিয়ার হাইপ—সব মিলিয়ে টেনিসও বুঝে নিচ্ছে, শুধুই গ্র্যান্ড স্ল্যাম দিয়ে নতুন প্রজন্ম ধরা অসম্ভব। সাবালেঙ্কা-কিরিয়োস দ্বৈরথ তাই শক্তির লড়াই নয়, মনোযোগের সংঘাত… কে আলো কাড়বে, কে গল্প তৈরি করবে। ফলাফল যাই হোক, ম্যাচ নিয়ে কথা হবেই। আধুনিক খেলাধুলোর দুনিয়ায়, সেটাই অনেক সময় সবচেয়ে বড় জয়।