গুকেশ বনাম ম্যাগনাসের এই দ্বিতীয় দ্বৈরথ দেখে খুব সহজেই বোঝা যায়, গুকেশ তাঁর কেরিয়ারের যে পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছেন, তাতে প্রতিদ্বন্দ্বীর চোখে ধুলো দিতে খুব অবলীলায় তিনি ধারণ করতে পারেন এক নিরাকার রূপ!

গুকেশ ও কার্লসেন
শেষ আপডেট: 6 July 2025 10:50
নরওয়েতে হারের ক্ষত এখনও দগদগে। এরই মধ্যে জাগরেবে অনুষ্ঠিত হল গ্র্যান্ড চেস টুর্নামেন্ট; আরও একবার কপালে জুটল চপেটাঘাত। দাবার জগতে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে: ম্যাগনাসের এই ভরাডুবি কি এক নতুন দিগন্তের ইঙ্গিত দিচ্ছে?
অথচ ম্যাচের এই পরিণতি কি এতটাই অবশ্যম্ভাবী ছিল? টুর্নামেন্টের শুরুতে আত্মবিশ্বাসী ম্যাগনাস নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ঘোষণা করেছিলেন গুকেশ সমস্ত প্রতিযোগীর মধ্যে অন্যতম ‘দুর্বল’। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে: এহেন পরাজয়কে (নাকি বিপর্যয়?) তিনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? গুকেশকে তুড়ি মেরে নস্যাৎ করতে চাওয়া কি টুর্নামেন্ট শুরুর আগে চিরাচরিত মাইন্ড গেম? নাকি স্রেফ নিজের অহমিকার পালে হাওয়া দিতে চেয়েছিলেন দুনিয়ার পয়লা নম্বর দাবাড়ু?
এর উত্তর: হ্যাঁ বা না দুটোই। আসলে ম্যাগনাসের অঙ্ক ছিল খুব পরিষ্কার: যেহেতু জাগরেবের টুর্নামেন্টের ফর্ম্যাট মূলত র্যাপিড এবং ব্লিৎজ, তাই ‘পজিশনাল চেসে’র মোৎসার্ট ম্যাগনাস আশা করেছিলেন গুকেশের থেকে তিনি বেশ খানিকটা এগিয়েই শুরু করবেন… হয়তো ভেবেছিলেন ক্লাসিকাল ফরম্যাটে ক্যালকুলেশনের জোরে গুকেশ উতরে গেলেও সময়ের নিয়ন্ত্রণে ম্যাচ জিততে যে পজিশনাল ইন্টিউশন (অনুধাবন ক্ষমতা) প্রয়োজন, তাতে তিনি ভারতের তরুণ প্রতিদ্বন্দ্বীকে পর্যুদস্ত করে ছাড়বেন।
আপাতভাবে এই বিশ্লেষণে খুব একটা ভুল না থাকলেও ম্যাগনাস হয়তো ম্যাক্রো পার্সপেক্টিভ থেকে খানিকটা সরে গেছিলেন; অবহেলা করেছেন গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজির কিছু মৌলিক নীতিকে। যার জেরেই গুকেশ ম্যাগনাসকে দাবার চৌষট্টি ঘরে আরও একবার নাকানিচোবানি খাওয়ালেন।
সান জু তাঁর ‘দ্য আর্ট অফ ওয়ার’ বইতে যুদ্ধ জেতার কৌশল ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন অবয়বহীনতার কথা (formlessness)। যা একজন প্রতিদ্বন্দ্বী তাঁর ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে আরোহন করলে তবেই রপ্ত করতে পারেন।
ব্রুস লি একবার একটি সাক্ষাৎকারে এই দর্শনকেই খানিকটা সহজবোধ্য রূপে তুলে ধরতে উল্লেখ করেছিলেন ‘জলের ধর্মে’। তাঁর মতে, একজন আদর্শ যোদ্ধা তিনিই, যিনি জলের মতো নিরাকার। অর্থাৎ, যিনি কিনা এতটাই নমনীয় যে, পরিস্থিতির নিরিখে মুহুর্মুহু বদলে ফেলতে পারেন নিজের অবস্থান ও লড়াই করার শৈলী। প্রতিদ্বন্দ্বী এই অবয়বহীনতাকে অনুধাবন করতে না পেরে শুধু যে সংশয়ী হয়ে ওঠে তাই নয়, নির্দিষ্ট লক্ষ্যের অভাবে নিজের অজান্তেই নিজের পায়ে কুড়ুল মেরে বসেন।
হ্যানিবাল থেকে নেপোলিয়ন, রমেল থেকে মাও সে তুং— পৃথিবীর তাবড় তাবড় সেনানীদের সবাই এই দর্শনকে আত্মস্থ করেই প্রতিদ্বন্দ্বীদের ঘোল খাইয়েছেন!
গুকেশ বনাম ম্যাগনাসের এই দ্বিতীয় দ্বৈরথ দেখে খুব সহজেই বোঝা যায়, গুকেশ তাঁর কেরিয়ারের যে পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছেন, তাতে প্রতিদ্বন্দ্বীর চোখে ধুলো দিতে খুব অবলীলায় তিনি ধারণ করতে পারেন এক নিরাকার রূপ! আগেরবারের হারের গ্লানি মেটাতে মরিয়া ম্যাগনাস খুব আটঘাঁট বেঁধে রচনা করেছিলেন গুকেশ-নিধন-যজ্ঞের নিখুঁত চক্রব্যূহ—পজিশনাল চেসের চেনা ছকে বেধে ফেলতে চেয়েছিলেন তুলনামূলকভাবে কম অভিজ্ঞ ডি. গুকেশের বিজয়রথ!
দুর্ভাগ্যবশত এই জোরালো স্ট্রাটেজি ম্যাগনাসকে ‘প্রেডিক্টেবল’ করে তোলে। ক্লাসিক্যাল ফরম্যাটে গুকেশ আগের ম্যাচটি জিতলেও সেখানে তিনি লড়াই করেছিলেন তাঁর পরিমিত মাত্রাবোধ নিয়ে। প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রতি সেই সমীহ ও সম্ভ্রমের খোলস থেকে বেরিয়ে, সেই একই গুকেশ হয়ে উঠলেন বিষধর গোখড়ো! ম্যাগনাসের প্রত্যাশিত ডিফেন্সিভ প্লেয়ের ধারকাছ দিয়ে না গিয়ে গুকেশ আচমকাই নিয়ে ফেলেন এক হাইপার অ্যাগ্রেসিভ স্ট্রাটেজি, যা ম্যাগনাসের মতন পোড়খাওয়া খেলোয়াড়কেও ধাঁধার মুখে ফেলে। আর তারই জেরে নরওয়ের বিশ্বজয়ী দাবাড়ু ম্যাচ থেকে তাঁর নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করেন!
গুকেশ ম্যাগনাসকে চমক দেন ম্যাচের ওপেনিং পর্যায়েই: ভিনসেন্ট কেইমার প্রাগ মাস্টার্সে যে চেনা ছকে স্যাম সাঙ্কল্যান্ডকে হারিয়েছিলেন, গুকেশ সেই চেনা পথে না গিয়ে নাইট সি-ফাইভ (Knight C5) মুভের মাধ্যমে পাল্টে ফেলেন খেলার চেনা ছক। সময় যেখানে সীমিত, প্রতিদ্বন্দ্বী যেখানে ম্যাগনাস, সেখানে গুকেশের এই সাহসী পদক্ষেপই প্রমাণ করে ম্যাচের শুরু থেকে তিনি কতটা আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। সময়ের নিরিখে এগিয়ে থাকা ম্যাগনাস এরপর মনোযোগ দেন পজিশনাল সিম্ফনি রচনায়। ম্যাগনাসের গুটির অনবদ্য কোঅর্ডিনেশন খানিকক্ষণের জন্য হলেও ম্লান করে দেয় গুকেশের ডিফেন্স। কিন্তু খেলা মিডল গেমে প্রবেশ করতেই গুকেশ তাঁর হাইপার অ্যাগ্রেসিভ রণকৌশল নিয়ে আসেন, যার সামনে অচিরেই ম্যাগনাসের সিম্ফনি বেসুরো বাজতে শুরু করে!
গুকেশের এই স্ট্রাটেজি আপাতভাবে বিশ্লেষকদের কাছে খানিকটা দুর্বোধ্য ঠেকলেও বাস্তবিকভাবে খানিকটা কাউন্টার ইন্টুইসিভ। নিজের রাজার নিরাপত্তার কথা না ভেবে গুকেশ সমানে সামনে ঠেলেছেন বোড়ে-কে। নির্দ্বিধায় ম্যাগনাসকে দিয়ে ফেলেন বিশপ পেয়ার অ্যাডভান্টেজ। গুকেশের এই অপ্রত্যাশিত দুঃসাহসী খেলা ম্যাচের নির্ণায়ক মুহূর্তে ম্যাগনাসকে করে তোলে সংশয়ী। কিং সাইডে পন স্টর্মের (pawn storm) মাধ্যমে জয় যেখানে অনেকটাই সুনিশ্চিত, সেখানে সন্দিগ্ধ ম্যাগনাস সিদ্ধান্ত নেন খেলাকে বোর্ডের অন্য প্রান্তে শিফট করার। আর এখানেই ঘুরে যায় ভাগ্যের চাকা। খেলা এরপরে যত পরিণতির দিকে এগোতে থাকে, গুকেশের অনবদ্য আক্রমণ ম্যাগনাসকে চারিদিক থেকে দিশাহরা করে তোলে। গুটির শক্তিতে এগিয়ে থাকলেও অচিরেই বোঝা যায় ম্যাগনাসের রাজা অবধ্য হতে চলেছে মেটিং নেটের (Mating Net) মধ্যে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে এন্ডগেমের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মুভে ম্যাগনাস ব্লান্ডার না করলে জয় হয়তো তার নাগালের মধ্যেই ছিল। কিন্তু এখানেই প্রশ্ন ওঠে: একবিংশ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ দাবাড়ু কীভাবে এক তরুণ তুর্কির হাতে বারংবার নস্তানাবুদ হচ্ছেন? উত্তরটা দিয়েছেন ম্যাগনাস নিজেই। সাম্প্রতিক একটি সাক্ষাৎকারে ম্যাগনাস গুকেশের খেলা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে স্বীকার করেছেন, গুকেশ তাঁর কাছে ‘দুর্বোধ্য’ ও ‘রহস্যময়’। আপাতভাবে গুকেশের খেলায় অভিজ্ঞতার অভাব স্পষ্ট হলেও তাঁর মনোযোগ পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের জোরে তিনি এমন অনেক সম্ভাবনা নিমেষে বিশ্লেষণ করতে পারেন যা ম্যাগনাস খেলার মুহূর্তে ভাবতেও পারেন না।
প্রবাদপ্রতিম খেলোয়াড় কাসপারভ ম্যাচ শেষে তাই যখন ম্যাগনাস যুগের পরিসমাপ্তি ঘোষণা করেন, দাবার জগৎ নিঃসঙ্কোচে কুর্নিশ জানায় ভারতীয় এই তরুণ মহারথীকে। গুকেশের এই বিজয়রথ এখন কতদিন অপরাজেয় থাকে, সেটাই দেখার।