লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই সময় পূর্বপুরুষগণ পিতৃলোক পরিত্যাগ করে তাদের উত্তরপুরুষদের গৃহে অবস্থান করেন। এর পর সূর্য বৃশ্চিক রাশিতে প্রবেশ করলে, তাঁরা পুনরায় পিতৃলোকে ফিরে যান।

ভাদ্র মাসের পূর্ণিমা তিথি থেকে আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের অমাবস্যা তিথি পর্যন্ত পালিত হয় পিতৃপক্ষ।
শেষ আপডেট: 5 September 2025 16:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, জীবিত ব্যক্তির পূর্বের তিন পুরুষ পর্যন্ত পিতৃলোকে বাস করেন। এই লোক স্বর্গ ও মর্ত্যের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত। পিতৃলোকের শাসক মৃত্যুদেবতা যম। তিনিই সদ্যমৃত ব্যক্তির আত্মাকে মর্ত্য থেকে পিতৃলোকে নিয়ে যান। পরবর্তী প্রজন্মের একজনের মৃত্যু হলে পূর্ববর্তী প্রজন্মের একজন পিতৃলোক ছেড়ে স্বর্গে গমন করেন এবং পরমাত্মায় (ঈশ্বর) লীন হন এবং এই প্রক্রিয়ায় তিনি শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের ঊর্ধ্বে উঠে যান। এই কারণে, কেবলমাত্র জীবিত ব্যক্তির পূর্ববর্তী তিন প্রজন্মেরই শ্রাদ্ধানুষ্ঠান হয়ে থাকে এবং এই শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে যম একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
হিন্দু মহাকাব্য অনুযায়ী, সূর্য কন্যারাশিতে প্রবেশ করলে পিতৃপক্ষ সূচিত হয়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই সময় পূর্বপুরুষগণ পিতৃলোক পরিত্যাগ করে তাদের উত্তরপুরুষদের গৃহে অবস্থান করেন। এর পর সূর্য বৃশ্চিক রাশিতে প্রবেশ করলে, তাঁরা পুনরায় পিতৃলোকে ফিরে যান। পিতৃগণের অবস্থানের প্রথম পক্ষে পিতৃপুরুষগণের উদ্দেশ্যে তর্পণাদি করতে হয়।
ভাদ্র মাসের পূর্ণিমা তিথি থেকে আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের অমাবস্যা তিথি পর্যন্ত পালিত হয় পিতৃপক্ষ। শুরু হয় দেবীপক্ষ। এই পিতৃপক্ষের সময় পূর্বপুরুষদের স্মরণ করার রীতি-রেওয়াজ অনেক প্রাচীন কাল থেকে চলে আসছে। পূর্ব পুরুষদের আত্মার শান্তি কামনায় তর্পণ করা হয়। পিন্ড দান থেকে শ্রাদ্ধ কর্মও করা হয়ে থাকে। শাস্ত্র ও পণ্ডিতদের মতে, পূর্বপুরুষরা এই সময় বা ক্ষণে মর্ত্যে নেমে আসে। পূর্ব পুরুষরা বংশধরদের জল গ্রহণ করে থাকেন।
মহাবীর কর্ণের আত্মা স্বর্গে গেলে সেখানে তাঁকে খেতে দেওয়া হল শুধুই সোনা আর ধনরত্ন। 'ব্যাপার কী?' কর্ণ জিজ্ঞাসা করলেন ইন্দ্রকে। ইন্দ্র বললেন, 'তুমি সারাজীবন সোনাদানাই দান করেছ, পিতৃপুরুষকে জল দাওনি। তাই তোমার জন্যে এই ব্যবস্থা।' কর্ণ বললেন, 'আমার কী দোষ? আমার পিতৃপুরুষের কথা তো আমি জানতে পারলাম যুদ্ধ শুরুর আগের রাতে। মা কুন্তী আমাকে এসে বললেন, আমি নাকি তাঁর ছেলে। তারপর যুদ্ধে ভাইয়ের হাতেই মৃত্যু হল। পিতৃতর্পণের সময়ই তো পেলাম না।' ইন্দ্র বুঝলেন, কর্ণের দোষ নেই। তাই তিনি কর্ণকে ১৫ দিনের জন্য মর্ত্যে ফিরে গিয়ে পিতৃপুরুষকে জল ও অন্ন দিতে অনুমতি দিলেন। ইন্দ্রের কথা মতো এক পক্ষকাল ধরে কর্ণ মর্ত্যে অবস্থান করে পিতৃপুরুষকে অন্নজল দিলেন। তাঁর পাপ স্খালন হলো এবং যে পক্ষকাল কর্ণ মর্ত্যে এসে পিতৃপুরুষকে জল দিলেন সেই পক্ষটি পরিচিত হল পিতৃপক্ষ নামে।
মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে দশদিন ভীষণ লড়াই করে প্রিয় নাতি অর্জুনের কাছে পরাস্ত হলেন পিতামহ ভীষ্ম। সেই সময় দক্ষিণায়ণ চলছে। বলা হয় দক্ষিণায়নের সময় যমলোকের দ্বার খোলা থাকে এবং বিষ্ণুলোকের দ্বার বন্ধ থাকে। তাই ভীষ্ম তাঁর ইচ্ছা মৃত্যুর বর প্রয়োগ করলেন। প্রথমেই অর্জুনকে বললেন তাঁকে শরবিদ্ধ করে শরশয্যা দিতে। যাতে তাঁর দেহ ভূমি স্পর্শ না করে। অর্জুন তাই করলেন। দক্ষিণায়ন শেষ হয়ে উত্তরায়ণ শুরু হলে বিষ্ণুলোকের দ্বার উন্মুক্ত হয়। ভীষ্ম বিষ্ণুলোক যাবার আকাঙ্ক্ষায় উত্তরায়ণের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। উত্তরায়ণ শুরু হলে ভীষ্ম ইচ্ছামৃত্যু বরণ করলেন। উত্তরায়ণের শেষ কৃষ্ণপক্ষটি হল পিতৃপক্ষ। এই সময়ে পূর্বপুরুষদের তর্পণ করতে হয়। পিতৃপক্ষের শেষ দিন অর্থাৎ অমাবস্যা হলো তর্পণের শ্রেষ্ঠ তিথি।
পুরাণে রয়েছে, ব্রহ্মার পুত্র ছিলেন মহর্ষি অত্রি। তাঁরই বংশধর আর এক সাধক নিমি। নিমি তাঁর সুখের সংসার স্ত্রী-পুত্র নিয়ে ধর্মাচরণে সুখে দিন কাটাচ্ছেন। এমন সময় একদিন নিমির পুত্র শ্রীমান-এর মৃত্যু হল। পুত্রের মৃত্যুতে শোকবিহ্বল হয়ে উঠলেন নিমি। কিন্তু তিনি অনুভব করলেন তিনি পুত্র শোকে কাতর কিন্তু আত্মার মৃত্যু নেই। তাই তাঁর পুত্রের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় তিনি শাস্ত্রমতে নাম গোত্র এবং মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে শ্রাদ্ধকর্ম সম্পন্ন করলেন। শান্তি কামনায় মুক্তির উদ্দেশ্যে উত্তর পুরুষরা শ্রাদ্ধ তর্পণ করে আসছে এই পরম্পরায়।
পিতৃপক্ষের সময়, ব্রাহ্মণদের খাওয়ানো এবং দান করা হয়। এ সময় মানুষ পূর্বপুরুষের নামে কাকদের খাওয়ায়। হিন্দু ধর্মে কাককে পূর্বপুরুষের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। পিতৃপক্ষ হোক বা কোনো শুভ অনুষ্ঠান, লোকেরা তাদের পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে কাককে খাওয়ায়। কিন্তু আপনি কি কখনও ভেবে দেখেছেন কেন শুধুমাত্র পিতৃপক্ষের সময় কাকদের খাওয়ানো হয় এবং এর তাৎপর্য কী?
কেন কাকদের পূর্বপুরুষ হিসাবে বিবেচনা করা হয়? ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, পিতৃপক্ষের সময় পূর্বপুরুষরা কাকের আকারে পৃথিবীতে আসেন। ধর্মগ্রন্থে বর্ণনা করা হয়েছে যে, দেবতাদের পাশাপাশি কাকও অমৃতের স্বাদ গ্রহণ করেছিল। এর পরে বিশ্বাস করা হয় যে কাক কখনও প্রাকৃতিকভাবে মারা যায় না। কাক ক্লান্ত না হয়ে দীর্ঘ দূরত্ব ভ্রমণ করতে পারে। এমন অবস্থায় যে কোনো ধরনের আত্মা কাকের শরীরে বাস করতে পারে এবং এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে পারে। এসব কারণে পিতৃপক্ষের সময় কাকদের খাওয়ানো হয়। একই সময়ে, ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, যখন কোনও ব্যক্তি মারা যায়, তখন সে কাকের গর্ভে জন্মগ্রহণ করে। এই কারণে, কাকের মাধ্যমে পূর্বপুরুষদের খাবার দেওয়া হয়।
কাক ছাড়াও পিতৃপক্ষের সময় তাদের খাওয়ানো হয়।কাক ছাড়াও পিতৃপক্ষের সময় গরু, কুকুর ও পাখিদেরও খাওয়ানো হয়। এটা বিশ্বাস করা হয় যে যদি তাদের দ্বারা খাদ্য গ্রহণ না হয় তবে এটি পূর্বপুরুষদের অসন্তুষ্টির লক্ষণ হিসাবে বিবেচিত হয়।
পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, ইন্দ্রদেবের পুত্র জয়ন্ত কাকের রূপ ধারণ করেছিলেন। একদিন সেই কাক মা সীতার পায়ে খোঁচা দিয়েছিল, রামজি এই পুরো ঘটনাটি দেখছিলেন। সে যখন একটি খড় সরাতে থাকে, তখন তা কাকের একটি চোখে আঘাত করে। এতে কাকের একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়। কাক তার ভুলের জন্য শ্রীরামের কাছে ক্ষমা চায়। ভগবান রাম কাকের ক্ষমাপ্রার্থনায় সন্তুষ্ট হন এবং তাকে আশীর্বাদ করেন যে পিতৃপক্ষে কাককে দেওয়া খাবার পিতৃ লোকে বসবাসকারী পিতৃদেবতারা পাবেন।