পৌরাণিক তাৎপর্য হল বিষ্ণুর অনন্তরূপের একটি প্রতীক। এ বছর আগামিকাল, ৬ সেপ্টেম্বর পড়েছে অনন্ত চতুর্দশী।

এটি ভাদ্রমাসের শুক্লপক্ষের চতুর্দশীতে পালন করা হয়।
শেষ আপডেট: 5 September 2025 14:42
দ্য ওয়াল ব্যুরো: অনন্ত চতুর্দশী হল দশ দিনের গণেশ উৎসবের অন্তিম দিন। যার পৌরাণিক তাৎপর্য হল বিষ্ণুর অনন্তরূপের একটি প্রতীক। এ বছর আগামিকাল, ৬ সেপ্টেম্বর পড়েছে অনন্ত চতুর্দশী। এটি ভাদ্রমাসের শুক্লপক্ষের চতুর্দশীতে পালন করা হয়। অগ্নি পুরাণ অনুসারে, পাপ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য এই উপলক্ষে বিষ্ণুর অনন্ত প্রকাশকে পুজো করা হয়। গণপতি ভক্তরা দেবতার বিগ্রহ জলে বিসর্জন দিয়ে তাঁকে বিদায় জানান, তাই দিনটিকে গণেশ চৌদসও বলা হয়।
অনন্ত চতুর্দশী সম্বন্ধে একটি পৌরাণিক কাহিনি রয়েছে। সুশীলা নামে এক নারীর গল্প বর্ণনা করা হয়েছে। যিনি একটি নদীর তীরে অনন্ত পূজারত একদল মহিলার মুখোমুখি হন। তাঁরা ব্যাখ্যা করেন, যাঁরা এই ব্রত পূরণ করেন তাঁরা অনন্ত পুণ্য অর্জন করবেন। অনন্তের রূপটি দর্ভ (পবিত্র ঘাস) থেকে তৈরি করা হয়েছিল এবং একটি ঝুড়িতে রাখা হয়েছিল যেখানে এটি সুগন্ধি ফুল, তেলের প্রদীপ, ধূপকাঠি ও তাঁদের তৈরি খাবার দিয়ে পুজো করা হয়েছিল। সুশীলা এই আচার-অনুষ্ঠানে মহিলাদের সঙ্গে যোগ দেন যার ফলে তাঁর কব্জিতে একটি ১৪টি গিঁটযুক্ত-সংস্কারমূলক সুতো বাঁধা হয়। তারপর তিনি তার স্বামী ঋষি কৌন্ডিন্যের কাছে ফিরে আসেন।
দম্পতি অমরাবতী নামক একটি নগরে এলে কৌণ্ডিন্য উন্নতি লাভ করতে লাগলেন এবং অত্যন্ত ধনী হয়ে উঠলেন। একদিন স্বামী সুশীলার কব্জিতে সুতোটি লক্ষ্য করেন। যখন তিনি তাঁর কাছ থেকে শুনলেন যে, তাঁর সম্পদ লাভের পিছনে ব্রত পালনের কারণ ছিল তখন তিনি অসন্তুষ্ট হন এবং বলেন, সম্পদপ্রাপ্তি অনন্ত ব্রতের কারণে নয়, তাঁর প্রচেষ্টার কারণে হয়েছে। এই বলে, কৌন্ডিন্য সুশীলার হাত থেকে সুতোটা নিয়ে স্ত্রীর উপেক্ষা সত্ত্বেও আগুনে নিক্ষেপ করেন।
এর পর, তাঁদের উপর দুর্ভাগ্য নেমে আসে। তাঁরা চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েন, প্রতিবেশীরা তাঁদের থেকে দূরে সরে যান এবং ঘরে আগুন লেগে যায়। অনুতপ্ত কৌণ্ডিন্য বুঝতে পারলেন, অনন্তকে অসম্মান করার জন্য এটি তাঁর শাস্তি। তিনি জায়গায় জায়গায় ঘুরে বেড়িয়ে বিভিন্ন প্রাণী ও হ্রদকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে তারা কি তাঁকে বলতে পারে যে, তিনি অনন্তকে কোথায় খুঁজে পেতে পারেন।
ভ্রমণকালে তিনি অনেক অস্বাভাবিক দৃশ্য দেখেন। অবশেষে, অনন্তদেব একজন বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশ ধারণ করে তাঁর সামনে উপস্থিত হন। পরে কৌন্ডিন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তিনি তাঁকে চোদ্দ বছর ধরে অনন্ত চতুর্দশী ব্রত পালন করতে বলেন এবং আশ্বাস দেন যে এর ফলে তিনি জীবদ্দশায় শ্রীবৃদ্ধিসম্পন্ন হবেন তথা মৃত্যুর পর নক্ষত্রলোক লাভ করবেন। এইভাবে, কৌন্ডিন্য ও সুশীলা ব্রত পালন করে সুখী জীবনযাপন করতে থাকেন।
১৪টি গিঁট দেওয়া তাগা গোছের এই সূত্রকে অনন্ত ডোর অথবা রক্ষাসূত্রও বলেন অনেকে। কথিত আছে, যাঁরা বিষ্ণুপুজো করে এই অনন্তসূত্র বাঁধেন, তাঁরা বিষ্ণুলোকে সৌভাগ্যধারিণী হন। মহাভারতে আছে, পাশাখেলায় পাণ্ডবরা যখন সব কিছু খুইয়ে নির্বাসিত হন, তখন কৃষ্ণ তাঁদের অনন্ত চতুর্দশীর উপবাস করার পরামর্শ দেন। যুধিষ্ঠির এই অনন্তসূত্র বাঁধেন এবং উপবাস শুরু করেন। যার ফলে বনবাসের পরে তাঁরা আবার রাজত্ব ফিরে পান। পুরুষরা এই ধাগা ডান হাতে এবং মেয়েরা বাম হাতে পরেন। চোদ্দ দিন টানা এই তাগা বেঁধে রাখতে হয়।
কথিত আছে, একদা বিষ্ণুর কাছে তাঁর বিরাট রূপ দেখতে চান দেবর্ষি নারদ দেবর্ষির এই ইচ্ছা পূরণ করে, তাঁকে বিরাট রূপে দর্শন দেন রক্ষাকর্তা বিষ্ণু। সেই দিনটি ছিল ভাদ্র মাসের শুক্ল চতুর্দশী। তার পর থেকে এই দিনটি অনন্ত চতুর্দশী হিসেবে পূজিত হতে শুরু করে। কথিত আছে, সৃষ্টির সূচনায় ১৪টি সৃষ্টি করেন বিষ্ণু।
তাহল, তল, অতল, বিতল, সুতল, তলাতল, রসাতল, পাতাল, ভূ, ভুবঃ, স্বঃ, জন, তপ, সত্য, মহ। এই সমস্ত লোকের রচনার পর এদের সংরক্ষণ ও পালনের জন্য ১৪টি রূপে প্রকট হন নারায়ণ। এ সময় অনন্ত প্রতীত হন তিনি। অনন্তকে এই ১৪ লোকের প্রতীক মনে করা হয়। এদিন বিষ্ণুর অনন্ত, ঋষিকেশ, পদ্মনাভ, মাধব, বৈকুণ্ঠ, শ্রীধর, ত্রিবিক্রম, মধুসূদন, বামন, কেশব, নারায়ণ, দামোদর ও গোবিন্দ স্বরূপের পুজো করা হয়।