জন্মতারিখের (Numerology) উপর ভিত্তি করে কুনজর দূর করার (Evil Eye Remedy) পদ্ধতির খুঁটিনাটি (Spiritual Solution), জনমতের প্রতিক্রিয়া ও বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা তুলে ধরা হল এই প্রতিবেদনে।

'কুনজর' কাটানোর উপায়! ছবি: এআই নির্মিত।
শেষ আপডেট: 30 July 2025 15:16
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বহু মানুষ বছরের পর বছর ধরে দুর্ভাগ্য, অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতা বা একের পর এক দুঃখজনক ঘটনার শিকার হয়ে বিশ্বাস করেন, তাঁদের জীবনে ‘কুনজর’ (evil eye, bad luck) লেগেছে। তাঁদের কাছে জীবন এক দীর্ঘ অন্ধকার টানেলের মতো, যেখানে আলোর দেখা নেই (Horoscope)। তবে সাম্প্রতিক সময়ে একটি নতুন আলোচনা সাড়া ফেলেছে সামাজিক মাধ্যমে। জন্মতারিখের উপর ভিত্তি করে তৈরি একটি সহজ ‘জন্মসংখ্যা’ (numerology) ভিত্তিক পদ্ধতি দাবি করছে, এটি অনুসরণ করলেই কুনজরের প্রভাব (Astrology) থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব (Spiritual Solution), দুর্ভাগ্যের দিনগুলোও হারিয়ে যেতে পারে অতীতে!
এই পদ্ধতির প্রবক্তাদের মতে, এটি কোনও জটিল গণনা বা ব্যয়বহুল আচার নয়। বরং জন্মতারিখ থেকে নির্ধারিত সংখ্যার উপর ভিত্তি করে এমন কিছু ‘সহজ সমাধান’ দেওয়া হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষ ঘরে বসেই প্রয়োগ করতে পারেন। তাঁরা আরও বলছেন, এর মাধ্যমে বহু মানুষ ইতোমধ্যেই জীবনের নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে সুখ ও মানসিক শান্তি ফিরে পাচ্ছেন। যদিও এটি ‘বৈজ্ঞানিক’ নয়, তবুও দাবি করা হচ্ছে যে এর কার্যকারিতা বহু অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত। এমন এক বিতর্কিত দাবি ঘিরে এখন জনমনে আগ্রহ, কৌতূহল ও সমালোচনার ঝড়।
বাংলা সমাজে কুনজর, বদনজর বা ‘evil eye’–এর ধারণা নতুন নয়। এটি গ্রামীণ থেকে শহুরে সব স্তরের মানুষের বিশ্বাসে জায়গা করে নিয়েছে। কারও জীবনে হঠাৎ সমস্যা দেখা দিলে, রোগ-অসুস্থতা বা ব্যবসায় ক্ষতি হলে অনেকে ধরে নেন, অন্য কারও ঈর্ষাপূর্ণ বা নেতিবাচক নজর তার কারণ। শিশুর সুন্দর চেহারা, ঘরে নতুন কেনাকাটা, সাফল্য বা হঠাৎ উন্নতি— এসব কিছুতেই এই নজরের ভয় প্রবল।
ফলে বহু মানুষ তাবিজ-কবচ, ঝাড়ফুঁক, লেবু-লঙ্কা বাঁধা, নানা লোকজ আচার বা মন্ত্র পাঠের মতো প্রচলিত ‘প্রতিকার’ গ্রহণ করেন। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই ধরনের বিশ্বাস মূলত অনিশ্চয়তা, মানসিক দুর্বলতা এবং অপ্রত্যাশিত ঘটনার কারণ খুঁজে পাওয়ার প্রবণতা থেকেই জন্ম নিয়েছে।
সাম্প্রতিক কালে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ধারার মূল কথা হল—প্রতিটি মানুষের জন্মতারিখ থেকেই নির্ধারিত হয় একটি ‘জন্মসংখ্যা’। এই সংখ্যা অনুযায়ী নির্দিষ্ট রঙ, ধাতু, শব্দ বা আচরণ মেনে চললে কুনজরের প্রভাব নাকি অনেকটাই দূর হয় (spiritual numerology remedy)। উদাহরণস্বরূপ, যাঁদের জন্ম ১, ১০, ১৯ বা ২৮ তারিখে, তাঁদের জন্মসংখ্যা ধরা হয় ১। তাঁদের জন্য রয়েছে আলাদা কিছু রঙ বা ধাতুর নির্দেশ।
দাবি করা হচ্ছে, প্রতিটি সংখ্যা (১–৯) অনুযায়ী, নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট রঙের পোশাক পরা, শুভ সংখ্যা ব্যবহার করা, নির্দিষ্ট ধাতু বা পাথর পরা, নির্দিষ্ট মন্ত্র বা শব্দ বারবার উচ্চারণ করা, কিছু নির্দিষ্ট খাবার বা বস্তু দান করা-- এসব মেনে চলার অনেক উপকার।
এই পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে মূলত অনলাইন ভিডিও, পোস্ট এবং অভিজ্ঞতাভিত্তিক শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে। প্রচারকারীরা বলছেন, এটি সহজ, বিশ্বাসযোগ্য এবং সাধারণ মানুষের জন্য উপযোগী। তবে এখনও পর্যন্ত এর কার্যকারিতার কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মেলেনি।
এই ‘নিউমারোলজি বেসড ইভিল আই রেমিডি’ (numerology-based evil eye remedy) ঘিরে জনমনে রয়েছে বিভাজন। একদিকে যেমন অনেকে একে নিছক কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের সমস্যায় জর্জরিত বহু মানুষ এই সহজ সমাধানের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে ব্যর্থতা, বারবার সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া বা অজানা শারীরিক সমস্যায় ভোগা মানুষদের মধ্যে এই পদ্ধতির জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে।
ফেসবুক, ইউটিউব এবং ইনস্টাগ্রামে অনেকেই নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলছেন, এই পদ্ধতি অনুসরণ করে তাঁরা কুনজরের প্রভাব থেকে মুক্তি পেয়েছেন। এইসব গল্প আরও বহু মানুষকে এই ধারার প্রতি আগ্রহী করে তুলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, “মানুষ যখন দীর্ঘদিন কোনও সমস্যার সমাধান খুঁজে পায় না, তখন সহজ বা অলৌকিক উপায়ে সমাধানের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এটাই মানবমনের একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। তবে এসব সমাধান বাস্তব সমস্যার কোনও দীর্ঘমেয়াদি পথ দেখায় না।”
মনোবিজ্ঞানী ডা. ফারজানা রহমান, যিনি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে কর্মরত, তিনি বলেন, “কুনজরের ভয় মূলত একধরনের মানসিক চাপ বা ‘অ্যাংজাইটি’-র বহিঃপ্রকাশ। কোনো সংখ্যা বা রঙ তার সমাধান হতে পারে না। বরং এমন সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।”
যুক্তিবাদী সংগঠনগুলিও আশঙ্কা প্রকাশ করছে, এই ধরনের অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সমাজে অন্ধবিশ্বাসকে উস্কে দিচ্ছে। মানুষ বাস্তব সমস্যা বা চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড়ানোর বদলে অলৌকিক সমাধানের দিকে ঝুঁকছে, যা তাদের আরও দুর্বল করে তুলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের প্রবণতা সমাজে কিছু নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন:
আর্থিক শোষণ: অনেক সময় এমন প্রতিকারের নামে মানুষকে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করানো হয়।
বাস্তব সমস্যার এড়িয়ে যাওয়া: মানুষ চিকিৎসা, পরামর্শ বা বাস্তব সমাধান না খুঁজে এসব প্রতিকারে নির্ভর করে।
মানসিক চাপ: পদ্ধতি কাজ না করলে আরও হতাশা বা অবসাদ তৈরি হতে পারে।
কুসংস্কার ছড়ানো: সামাজিকভাবে যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানচর্চা বাধাপ্রাপ্ত হয়।
এই ধরণের ‘কুনজর রেমিডি’ বা জন্মসংখ্যাভিত্তিক প্রতিকার জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকলেও, বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গড়তে হলে প্রয়োজন, যুক্তিনিষ্ঠ চিন্তা, বিজ্ঞানশিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা এবং অবৈজ্ঞানিক পন্থা সম্পর্কে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি।
জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরের এক মুখপাত্র বলেন, “আমরা মানুষকে অনুরোধ করি, তারা যেন কিছু বিশ্বাস করার আগে তার বিজ্ঞানভিত্তিক সত্যতা যাচাই করে নেন। কুসংস্কার নয়, বিজ্ঞানই পারে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে।”
সুতরাং, কুনজরের ভয় বা দুর্ভাগ্য থেকে মুক্তির ইচ্ছা স্বাভাবিক হলেও, তার সমাধান যেন থাকে যুক্তিনিষ্ঠ এবং বাস্তবসম্মত পথেই। কারণ, সত্যিকারের সমাধান আসে আত্মবিশ্বাস, পরিশ্রম ও বাস্তব পদক্ষেপ থেকে, কোনও ম্যাজিক নম্বর দিয়ে নয়।
('দ্য ওয়াল' এই বিষয়বস্তুর প্রচারক নয়; এটি কেবল তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে।)