ক্রিকেট শুধুই পরিসংখ্যানের খেলা নয়। কোহলির ফর্ম দীর্ঘদিন ধরেই বেসুরো গাইছে। ২০২০ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ৩৯টি টেস্টে মাত্র ২০০০ রান, যা একেবারেই বিরাটসুলভ নয়। কিন্তু বিরাট কোহলিকে শুধু ব্যাটার হিসেবে মাপা ভুল।

বিরাট কোহলি
শেষ আপডেট: 21 May 2025 20:04
গৌতম গম্ভীরের জমানায় যে তারকা প্রথার অবসান ঘটতে চলেছে তা রবিচন্দ্রন অশ্বিনের আচমকা অবসরেই বোঝা গিয়েছিল। অশ্বিন তথাকথিত স্টার নন, দক্ষিণের এই শিক্ষিত ইঞ্জিনিয়ার ক্রিকেটারের পরিসংখ্যানই তাঁর হয়ে সারাজীবন কথা বলেছে। কিন্তু এ কথা ঠিক, নিউ জ়িল্যান্ড সিরিজ এবং অস্ট্রেলিয়া সফরের দলের চূড়ান্ত ব্যর্থতা গম্ভীরকে বাধ্য করেছে বেশ কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে। তারই অন্যতম দেশের সর্বকালের অন্যতম সেরা তারকা বিরাট কোহলির আচমকা অবসর ঘোষণা।
দুই সফরে ব্যর্থতার পর ক্রিকেটারদের বেশ কিছু নিয়মে বেঁধে ফেলেছিল বোর্ড। বিদেশ সফরে স্ত্রী, বান্ধবী বা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যাওয়ার নিয়ম বেঁধে দেওয়া, ব্যক্তিগত রাঁধুনি না রাখতে দেওয়ার মতো একগুচ্ছ নির্দেশিকা দিয়েছিল বোর্ড। শোনা যাচ্ছে সেইসব নিয়ম এবং ইংল্যান্ড সিরিজে অধিনায়ক হতে চাওয়া বিরাটকে শুধু ব্যাটার হিসেবে খেলতে বলায় বিরক্ত কোহলি আচমকা অবসর নিলেন। গম্ভীর প্রথম দিন থেকেই বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি অত্যন্ত কড়া হেড কোচ। পূর্বসূরি রাহুল দ্রাবিড় বা রবি শাস্ত্রীর মতো গ্ল্যামার এবং সর্বজনগ্রাহ্যতা তাঁর নেই। নিন্দুকেরা বলে, তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। চান দল তাঁর কথায় উঠবে বসবে। গম্ভীরের সেই পরিকল্পনায় দলের দুই সিনিয়র তারকা রোহিত শর্মা এবং বিরাট কোহলিই ছিলেন প্রধান অন্তরায়। অতএব তিনি এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করলেন যাতে সিনিয়ররা আস্তে আস্তে বিদায় নিতে বাধ্য হলেন। যেমন কোনও ফেয়ারওয়েল টেস্ট ছাড়াই কয়েকদিন আগে শেষ হয়েছে রোহিত শর্মারও টেস্ট কেরিয়ার। কোহলি এবং রোহিত অস্ট্রেলিয়ায় সফল হলে গম্ভীর এত সহজে তাঁদের তাড়াতে পারতেন কি না সে প্রশ্ন উঠছেই। কিন্তু এই বয়স্ক তারকারা ক্রমাগত ব্যর্থ হয়ে গম্ভীরের কাজ অনেকটাই সহজ করে দিয়েছিলেন। অজিত আগরকরের নির্বাচকমণ্ডলী ও বোর্ডও তাঁকে পিছন থেকে নীরব সমর্থন জুগিয়ে গেল।
তবে রোহিত ও কোহলিকে ছাড়া ইংল্যান্ডের কঠিন মাটিতে ভারত কী রকম ফল করবে তা নিয়ে সংশয় তৈরি হচ্ছেই। ২০১২-’১৩ সালে যখন লক্ষ্মণ, দ্রাবিড়, তেন্ডুলকর অল্প সময়ের ব্যবধানে অবসর নিলেন এবং তারপর সেহওয়াগ, যুবরাজ এবং গম্ভীরও বিদায় নিলেন, ভারতীয় ক্রিকেটের সেই অসীম শূন্যতাকে ভরাট করতে এগিয়ে এসেছিলেন চেতেশ্বর পূজারা, অজিঙ্কা রাহানে এবং সর্বোপরি কোহলি স্বয়ং। ২০২৪ মার্চে ইংল্যান্ড সিরিজে কোহলি পিতৃত্বকালীন ছুটি নিলেন পুরো সিরিজ না খেলে। সেই সিরিজে শেষবার রোহিত শতরান করলেন টেস্ট ব্যাটার হিসেবে। রোহিত এবং কোহলি দুজনেরই ৩৬ পেরিয়েছে। তাঁদের প্রতিভা নিয়ে সংশয় না থাকলেও বয়স তাঁদের রিফ্লেক্স এবং চোখ দুটোতেই থাবা বসিয়েছে।

লেখক রাহুল দাস
জাদেজা এবং অশ্বিন দেশের মাঠে এবং বুমরা, শামি এবং সিরাজ বিদেশের মাটিতে দুই তারকার ফর্মের অভাব বুঝতে দেননি। কিন্তু নিউ জ়িল্যান্ড সিরিজ ০-৩ এবং বর্ডার-গাভাস্কর ট্রফি ১-৩ হারে বোর্ড কর্তাদের ঘুম উড়ে যায়। গোদের উপর বিষফোঁড়া হয় ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে প্রথমবার উঠতে না পারা। সন্দেহ নেই, তিন প্রবীণকে ছাড়া খাতায় কলমে দল যাই হোক না কেন, তা বেশ দুর্বল। নির্বাচকরা এবং গম্ভীর যদি রাহানে ও পূজারাকে দলে না ফেরান তা হলে দল হিসেবে অন্তত ইংল্যান্ড অনেক শক্তিশালী হিসেবে সিরিজ শুরু করবে।
এর আগের ইংল্যান্ড সিরিজগুলোয় কোহলির বয়স ছিল কম। তিনি দক্ষতার শীর্ষে ছিলেন। ২০১৪ থেকে ২০২৩, এই নয় বছরে কোহলি ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ১৭ টেস্টে ৩৩ ইনিংসে ১০৯৬ রান করেছেন ৩৩.২১ গড়ে। যার মধে মাত্র দু’টি শতরান, সর্বোচ্চ ১৪৯। সেই সেঞ্চুরি এসেছিল ২০১৮ সালে বার্মিংহামে। যখন কোহলি তাঁর সেরা ফর্মে। পরিসংখ্যান বলছে ইংল্যান্ডে চোখ ধাঁধানো সাফল্য তাঁর কখনওই ছিল না। অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ভারতে তিনি অনেক বেশি সফল। তা হলে কি বিরাটের অভাব ভারত অনুভব করবে না? তা মোটেই নয় এবং সেখানেই ক্রিকেটের মজা।
ক্রিকেট শুধুই পরিসংখ্যানের খেলা নয়। কোহলির ফর্ম দীর্ঘদিন ধরেই বেসুরো গাইছে। ২০২০ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ৩৯টি টেস্টে মাত্র ২০০০ রান, যা একেবারেই বিরাটসুলভ নয়। কিন্তু বিরাট কোহলিকে শুধু ব্যাটার হিসেবে মাপা ভুল। টিমে যে আগ্রাসী মানসিকতার আমদানি করে তিনি ৬৮ টেস্টে ৪০টি জিতেছিলেন, সেই আগ্রাসী মনোভাব এই নতুন টিমে আমরা হয়তো দেখতে পাব না। তরুণ অধিনায়ক শুভমন গিলের নেতৃত্বে (ধরে নিচ্ছি গিলই অধিনায়ক হবেন) এই আগ্রাসন প্রয়োজন ছিল। কারণ ঘরের মাঠে ইংল্যান্ড অত্যন্ত কঠিন প্রতিপক্ষ। এ ধরনের ট্রানজিশনের সময় তারুণ্য এবং অভিজ্ঞতার সাযুজ্য দরকার। একসঙ্গে সব ‘বুড়ো’দের ঘাড়ধাক্কা দিয়ে তাড়ালে কী হতে পারে তা আমরা অতীতে দেখেছি। ইংল্যান্ডের মতো সবুজ পিচে বল সিম না করে সুইং করে। সেখানে বিরাটের অভিজ্ঞতা অবশ্যই কাজে লাগত। সম্ভাব্য দলের প্রথম ৬ জনের মধ্যে একমাত্র যশস্বী জয়সওয়াল ধারাবাহিক ভাবে ভালো খেলছেন। সাই সুদর্শন প্রতিভাবান কিন্তু টেস্টে খেলেননি। গিল ইংল্যান্ডে শোচনীয় ভাবে ব্যর্থ। শ্রেয়স আইয়ার, কে এল রাহুল ও ঋষভ পন্থ, টেস্টে সকলেরই ধারাবাহিকতার অভাব।
যদি প্রথম দু’টি টেস্টে যেখানে বল মারাত্মক সুইং করবে, সেখানে গোড়ায় উইকেট পড়ে গেলে দাঁড়াবে কে? এখানেই কোহলির অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত। তাই মনে হচ্ছে, তারুণ্যকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে বোর্ড, নির্বাচক এবং গম্ভীর আসলে দলটার ক্ষতি করলেন না তো? ইংল্যান্ডের মতো কঠিন সফরে মিডল অর্ডারে শ্রেয়স আর পন্থ কি পারবেন কোহলি বা রাহানে, পূজারার উত্তরসূরি হয়ে উঠতে?