যাবতীয় বিষয় ছাপিয়ে যিনি এই মুহূর্তে চর্চায়, সবকিছু ঠিক থাকলে বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সামনের মরশুমে বড় কোনও ক্লাবে (হতেই পারে সেটা ম্যান সিটি!) চলে যাওয়া স্রেফ সময়ের অপেক্ষা, তিনি গোলদাতা এবেরেচি এজে।

এবেরেচি এজে
শেষ আপডেট: 19 May 2025 07:00
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিশ্বফুটবলের ঐতিহাসিক টুর্নামেন্ট। অন্যতম প্রাচীন তো বটেই, বনেদিও। এর পাশপাশি বিস্ময়কর। এফএ কাপের (FA Cup) বিশেষণ খুঁজতে বসলে জুতসই তকমা খুঁজে পাওয়া ভার। এখানে দুর্দান্ত গোলিয়াথ হার মানে আন্ডারডগ ডেভিডের কাছে। ওয়েম্বলির ময়দানে (Wembley Stadium) যার আরও একটি নজির ফুটে উঠল গতকাল। বিত্ত বা ক্ষমতার নিরিখে অনেকটাই ‘খাটো’ ক্লাব ক্রিস্টাল প্যালেস (Crystal Palace) হারাল ধনবান, শক্তিধর ম্যাঞ্চেস্টার সিটিকে (Manchester City)। পেপ গোয়ার্দিওলার (Pep Guardiola) মতো পোড়খাওয়া ম্যানেজারকে কিস্তিমাত দিলেন নিতান্তই আনকোরা অলিভার গ্ল্যাসনার (Oliver Glasner)।
ইংল্যান্ডে চালু প্রবাদ: ‘এফএ কাপে ম্যাজিক ঘটে!’ দুর্বলরা মাঝেসাঝেই অসাধ্য সাধন করে ফেলে। থার্ড ডিভিশনের ক্লাব পরাস্ত করে প্রিমিয়ার লিগের দৈত্যকে। নায়ক হয়ে ওঠেন নতুন কোনও মুখ। এর আগে রবার্তো ম্যানচিনির (Roberto Manchini) জমানায় প্রিমিয়ার লিগজয়ী ম্যান সিটি এই এফএ কাপের ফাইনালেই হেরেছিল উইগান অ্যাথলেটিকের (Wigan Athletic) কাছে। সেই মরশুমে অবনমন হয়েছিল উইগানের, নেমে গিয়েছিল সেকেন্ড ডিভিশনে। তবু ফাইনাল লড়াইয়ে সিটিকে এক গোলে, তাও ম্যাচের অন্তিম মুহূর্তে করে, ট্রফি হাতে তোলে রবার্তো মার্টিনেজের দল।
গতকালের এফএ কাপ ফাইনালে পচা শামুকেই দ্বিতীয়বার পা কাটল ম্যাঞ্চেস্টার সিটির। রক্ষণাত্মক ও কাউন্টার অ্যাটাকিং ফুটবলের টেক্সটবুক নমুনা পেশ করল ক্রিস্টাল প্যালেস। ১-০ গোলে জিতে ক্লাবের ১২০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের জন্য কোনও গুরুত্বপূর্ণ খেতাব জিতল প্যালেস। নাম লেখাল এফএ কাপ, ইংলিশ ফুটবলের লোককথায়!
কিন্তু যাবতীয় বিষয় ছাপিয়ে যিনি এই মুহূর্তে চর্চায়, সবকিছু ঠিক থাকলে বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সামনের মরশুমে বড় কোনও ক্লাবে (হতেই পারে সেটা ম্যান সিটি!) চলে যাওয়া স্রেফ সময়ের অপেক্ষা, তিনি গোলদাতা এবেরেচি এজে। ঠিক তাঁর ক্লাবের মতোই, এজের জীবনও উত্থান-পতনে ভরা। পদে পদে সইতে হয়েছে উপেক্ষা। দাঁড়িয়েছেন প্রশ্নের মুখে। তারপর দিয়েছেন জবাব। শুধু গতকাল নয়, চলতি মরশুম জুড়েই উত্তর দিয়ে চলেছেন কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলার!
জন্ম দক্ষিণ লন্ডনের গ্রিনিচে। ছেলেবেলা থেকেই স্বপ্ন ফুটবলার হওয়ার। কিন্তু পা জমাতে বিস্তর কাঠখড় পোড়াতে হয় এজেকে। আর্সেনাল থেকে ডাক এসেছিল ঠিকই। কিন্তু সেভাবে মন টানেনি, অ্যাকাডেমিতে সমস্যাও দেখা দেয়। বাধ্য হয়ে অন্য ঠিকানার খোঁজে বেরিয়ে পড়েন এজে। কিন্তু ডাক আসে না। ফুলহ্যাম, রিডিং, মিলওয়েলের মতো ক্লাবের দরবারে প্রস্তাব রাখেন। কিন্তু সর্বত্র জবাব আসে—‘না’!
২০১৬ সালে অবশেষে কুইন্স পার্ক রেঞ্জার্স (কিউপিআর) আমন্ত্রণ জানায়। সেখান থেকে ওয়েকম্ব ওয়ান্ডেরার্সে। কিউপিআর দশ নম্বর জার্সি তুলে দেয় এজের হাতে। লিগ ওয়ানে ফুটবলের প্রতিযোগিতামূলক পাঠে নিজেকে সড়গড় করেন তরুণ উইংগার।
চার বছর বাদে, ২০২০-তে, ক্রিস্টাল প্যালেসের নজরে পড়েন এজে। প্রায় ২০ মিলিয়ন ডলারে তাঁকে সই করায় লন্ডনের ক্লাব। লিগ ওয়ান থেকে সটান প্রিমিয়ার লিগ। প্রতিযোগিতার ধার, তীব্রতাই আলাদা! ধাতস্থ হতে সময় নেন এজে। কিন্তু ছাপ রাখেন। চলতি মরশুম অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের জীবনের সবচেয়ে ফলবান সময়। এখনও পর্যন্ত সমস্ত টুর্নামেন্ট মিলিয়ে ১২ গোল, ১২ অ্যাসিস্টের রেকর্ড লিখে ফেলেছেন এবেরেচি এজে।
কোথায় আলাদা ক্রিস্টাল প্যালেসের নতুন তারকা? প্রিমিয়ার লিগে আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডারের কমতি নেই। সম্ভাবনাময় ফুটবলারদের সংখ্যাও নজরকাড়া। তবু তাঁদের ভিড়ে কেন ঝিলিক তুলেছেন এজে? ফাঁস করেছেন তাঁরই সতীর্থ ক্রিস রিচার্ডস। ক্রিস্টাল প্যালেসের আরেক তরুণ ডিফেন্ডার। জানিয়েছেন, এজে মাঝমাঠ থেকে এমন কিছু দেখতে পান, যেটা নাকি দেখার কথাই না! প্রভূত সৃজনীশক্তি, বুদ্ধিদীপ্তি। হাফ চান্সকে সহজেই গোলে পরিণত করেন, গোলের দরজা খুলে দেন সহজে। গতকাল ওয়েম্বলিতে যার হাতেনাতে ফল পেল সিটি। রাইট উইং থেকে বাড়ানো ক্রস এজে জালে জড়ালেন অনায়াস দক্ষতায়।
Eberechi Eze fired @CPFC to their first major trophy, sealing a win over @ManCity in the #EmiratesFACup Final 🏆 pic.twitter.com/9ERlRtr4fb
— Emirates FA Cup (@EmiratesFACup) May 18, 2025
ইতিমধ্যে জাতীয় দলে নাম তুলেছেন। ক্লাবকে জিতিয়েছেন প্রথম মেজর ট্রফি। পরের মরশুমে ইউরোপীয় ফুটবলে নামার রাস্তাও পাকা। কিন্তু সেখানে কি ক্রিস্টাল প্যালেসের জার্সিতে দেখা যাবে এজেকে? প্রশ্নের জবাব হয়তো চেকবুকের অঙ্কই ঠিক করবে।
আপাতত উৎসবে মেতে থাকতে চান এজে। জয়সূচক গোলের পর হাঁটু মুড়ে উচ্ছ্বাস দেখানোর সময় কী ভাবছিলেন? সাংবাদিকদের প্রশ্ন শুনে বিন্দুমাত্র সময় না নিয়েই এজের জবাব, ‘শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। দম পাচ্ছিলাম না। এটা বিশেষ অনুভূতি। বলার মতো ভাষা নেই!’