মুম্বইয়ের শ্রীপাল গান্ধী এমন এক খবর ভাগ করে নিয়েছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়, যা বাস্তবের স্বার্থসর্বস্ব পৃথিবী থেকে যেন লক্ষ যোজন দূরের এক পৃথিবীর গল্প।

জীবনে যা যা হয়েছে, তা নিয়ে আক্ষেপ নেই তাঁর বিশেষ
শেষ আপডেট: 26 May 2025 13:37
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আমরা সবাই কোনও না কোনও টার্গেটের পেছনে ছুটে চলেছি প্রতিনিয়ত। কারও অফিসে ডেডলাইন মিট করার টার্গেট, কাউকে অমুক সংখ্যক জিনিস বেচতেই হবে- সেই টার্গেট। সবকিছুর নেপথ্যে রয়েছে ইনসেনটিভ বা মাসের শেষে কিছু বাড়তি টাকা। দিনের শেষে দায়ে পড়ে নিজের নীতিটুকুও মাঝে মাঝে খাদের কিনারায় এসে পৌঁছয়।
এইসবের মাঝেও হঠাৎ ব্যতিক্রমী কোনও খবর সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষের কাছে এসে ধরা দেয়। মনে করিয়ে দেয় সারাজীবন রয়েছে টাকা উপার্জনের জন্য, কিন্তু এই পৃথিবীর মাঝেও রয়েছে অন্য এক পৃথিবী। যেখানে এখনও ঘুরে বেড়ায় সারল্যের গন্ধ।
মুম্বইয়ের শ্রীপাল গান্ধী এমন এক খবর ভাগ করে নিয়েছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়, যা বাস্তবের স্বার্থসর্বস্ব পৃথিবী থেকে যেন লক্ষ যোজন দূরের এক পৃথিবীর গল্প।
জোম্যাটো (Zomato) ফুড ডেলিভারি অ্যাপের মাধ্যমে বিখ্যাত ফাস্টফুড রেস্তরাঁ সাবওয়ে (Subway) থেকে কম্বো খাবার (food combo) অর্ডার করেছিলেন শ্রীপাল। তাতে ছিল পনীর টিক্কা স্যান্ডউইচ, চিপস এবং ওট রেজিন কুকিজ। খাবার আসার পর তিনি বুঝতে পারেন তাতে শুধুমাত্র স্যান্ডউইচ-ই রয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে শ্রীপাল ডেলিভারি রাইডারকে (Delivery rider) জানান সেকথা। তিনি অপ্রস্তুত হয়ে উত্তর দেন, ‘স্যার, প্লিজ আপনি রেস্তরাঁ বা জোম্যাটোকে জানান বিষয়টা’। সাবওয়ে-কে ফোন করে জিজ্ঞাসা করতে তারা জানায় যে রেস্তরাঁর তরফ থেকেই এই ভুল হয়েছে। তারা এও বলেন রাইডার এসে বাকি খাবারটুকু নিয়ে গেলে তারা তাঁকে এই অসুবিধার জন্য ২০ টাকা দিতেও রাজি আছেন।
অথচ জোম্যাটোর পলিসি (Zomato Policy) বলে, যতক্ষণ না জোম্যাটোর তরফ থেকে নির্দেশ না আসছে রাইডার রেস্তরায় ফিরে যেতে বাধ্য নন। তার কারণ জোম্যাটো রাইডারের বেতন বা ইনসেনটিভ (Incentive) দেয়, কোনও রেস্তরাঁ নয়।
কিন্তু শ্রীপালকে অবাক করে দিয়ে গোটা ঘটনাটা জানার পর ডেলিভারি রাইডার জানান, ‘স্যার আপনাকে খাবার পৌঁছে দেওয়া আমার দায়িত্ব। কাস্টমারের খুশিই আমার ভাললাগা।’ তিনি ফিরে যান রেস্তরাঁয়, বাকি খাবার নিয়ে এসে হাসিমুখে তুলে দেন শ্রীপালের হাতে। আর বদলে সাবওয়ের অফার করা ওই ২০ টাকাও অবলীলায় ফিরিয়ে দেন তিনি।
এরপর তাঁর ডেলিভারি রাইডারের সঙ্গে আলাপ জমানোর লোভটুকু সংবরণ করতে পারেননি শ্রীপাল। কাস্টমার ও ডেলিভারি রাইডারের বিস্তারিত কথোপকথনে জানা যায়, একসময় তিনি কনস্ট্রাকশন সুপারভাইজর ছিলেন। তারপর নামকরা এক কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে ম্যানেজার পদে থাকাকালীন মাসে দেড় লাখ টাকার কাছাকাছি বেতন পেতেন। কিন্তু অদৃষ্টের খেলায় আচমকা এক গাড়ি দুর্ঘটনা বদলে দেয় এরপরের জীবনকাহিনি। প্রাণ বেঁচে গেলেও প্যারালিসিসে শরীরের বাঁদিক, হাত-পা অকেজো হয়ে পড়ে। চলার ক্ষমতা হারান, সঙ্গে চাকরিটাও।
হতাশার অন্ধকার টানেলের শেষ প্রান্তে আলোর মতো জীবনে আসে জোম্যাটোতে ডেলিভারি রাইডারের এই চাকরি। আর কেউ অক্ষম এই মানুষটিকে দায়িত্বের যোগ্য মনে না করলেও জোম্যাটোর এই পদক্ষেপ রাতারাতি বদলে দিয়েছিল তাঁর জীবন।
জোম্যাটো ফুড ডেলিভারি সংস্থা বরাবরই অন্যরকম পথে হেঁটেছে। তাদের নানারকম ক্রিয়েটিভ ফন্দিফিকিরের পাশাপাশি এই ধরনের মানবিক দিকেও এগিয়ে থেকেছে সবসময়।
তাঁর কথায়, ‘জোম্যাটো আমার পরিবারকে বাঁচিয়ে রেখেছে স্যার। আমি প্রতিবন্ধী হতে পারি, তাও তাঁরা আমাকে এই সুযোগ দিয়েছেন। আমি জোম্যাটোর বদনাম হতে দিতে পারি না কোনওভাবেই। ভগবান তো আমাকে এতকিছু দিয়েছেন। অন্য কারও একটা সামান্য ভুলের সুযোগ নিয়ে আমি টাকা নিতে পারব না স্যার।’
মেয়ে এখন ডেন্টিস্ট্রি (দাঁতের ডাক্তার হওয়ার পড়াশোনা) পড়ছে। তার পড়াশোনা নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাওয়া এখন বাবার একমাত্র লক্ষ্য। এই চাকরিটা তাঁর কাছে শুধু চাকরি নয়, স্বপ্ন বোনার এক কারখানা।
জীবনে যা যা হয়েছে, তা নিয়ে আক্ষেপ নেই তাঁর বিশেষ। অজুহাতেরও বিশেষ কিছু খুঁজে পান না তিনি। সারামাস কাজ করে বেতন তো সব মানুষই পায়, ইনসেনটিভের পেছনে দৌড়নোর এই যুগে ভালবেসে নিজের কাজটুকু কতজনই বা করেন!