পাটাগোনিয়ার প্রতিষ্ঠাতা (Patagonia) ইয়ভন শুইনার্ড (Yvon Chouinard) একসময় ক্যানের বিড়ালের খাবার খেয়ে টাকা বাঁচাতেন। পরে বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি দান করলেন পরিবেশ রক্ষায়।

ইয়ভন শুইনার্ড।
শেষ আপডেট: 24 September 2025 14:11
দ্য ওয়াল ব্যুরো: একসময় বিড়ালের খাবার খেয়ে কাটিয়েছিলেন দিন। পয়সা বাঁচাতে পাথুরে পাহাড়ে, জঙ্গলে থেকেছেন, খারাপ জল খেয়ে অসুস্থ হয়েছেন, কাঠকয়লা আর নুন মিশিয়ে সেই টোটকায় অসুখ সারিয়েছেন। অথচ তিনিই একদিন হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যবসায়ী। আবার, আর আজ সেই ধনকুবেরই (billionaire) স্বেচ্ছায় নিজের কোম্পানি দান করে দিয়েছেন পৃথিবীকে বাঁচাতে।
তিনি ইয়ভন শুইনার্ড (Yvon Chouinard)। আউটডোর পোশাক সংস্থা পাটাগোনিয়ার (Patagonia) প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর বয়স এখন ৮৬। প্রবল লড়াই করে অর্জিত সম্পত্তির ফলশ্রুতি হিসেবে তিনি হয়ে উঠেছেন কোটিপতি। তবে ধনকুবেরদের তালিকায় নাম ওঠা নিয়েই তাঁর অস্বস্তি। তাই ২০১৭ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন তাঁকে বিলিয়নেয়ারদের তালিকায় রাখতেই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন। কারণ তাঁর কাছে ‘বিলিয়নেয়ার’ শব্দটা মানে সাফল্য নয়, বরং নীতি ব্যর্থতা।

এই মনোভাব থেকে, ২০২২ সালে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন তিনি। নিজে এবং পরিবারের সঙ্গে মিলে পুরো পাটাগোনিয়া কোম্পানিটিই তুলে দেন ট্রাস্ট ও অলাভজনক সংস্থার হাতে। যাতে করে কোম্পানির প্রতি বছরের কোটি কোটি ডলার মুনাফা ব্যয় হয় জলবায়ু পরিবর্তন রোধে, পরিবেশ রক্ষায়।
আসলে শুইনার্ড সারাজীবন ছিলেন এক ভবঘুরে রক ক্লাইম্বার। পাহাড়ে-জঙ্গলেই ছিল তাঁর ঘর। পাঁচের দশকে মেক্সিকোয় কুঁড়েঘরে থেকে বন্ধুদের সঙ্গে ফল-মাছ খেয়ে বেঁচে থাকতেন। টাকার অভাবে গির্জা থেকে নিয়ে আসতেন জ্বলে যাওয়া মোমবাতির অংশ।
এসব কথা নিজের আত্মজীবনী Let My People Go Surfing-এ তিনি খোলাখুলিই লিখেছেন। এমনকি কখনও নষ্ট হয়ে যাওয়া ক্যানের বিড়ালের খাবারও কিনে খেয়েছেন মাত্র পাঁচ সেন্টে। কখনও সপ্তাহের পর সপ্তাহ এক ডলার খরচেই জীবন চালিয়েছেন। অসুস্থ হলে ওষুধ কেনার টাকাও জুটত না। তখন আগুনে পোড়ানো কাঠকয়লা আর আধ কাপ নুন মেশানোজল খেয়ে বমি করে সারাতেন অসুখ। এভাবেই কেটে যেত দিন।
১৯৭৩ সালে জন্ম নেয় পাটাগোনিয়া। শুরুর দিনগুলোয় গাড়ি থেকে ক্লাইম্বিং সরঞ্জাম বিক্রি করতেন শুইনার্ড। ধীরে ধীরে কোম্পানি হয়ে ওঠে আউটডোর পোশাক ও সরঞ্জামের এক বৈশ্বিক ব্র্যান্ড। বর্তমানে এর মূল্য প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার।

কিন্তু ব্যবসার প্রসার যতই হোক, তাঁর কাছে অর্থ কখনওই প্রথম সারির লক্ষ্য ছিল না। বরং শুরু থেকেই পাটাগোনিয়াকে তিনি গড়ে তুলেছিলেন পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের প্রতীক হিসেবে। তাঁদের মূলমন্ত্রই ছিল—“We’re in business to save our home planet.”
পাটাগোনিয়া সবসময়ই আলাদা পথে হেঁটেছে। প্রথম থেকেই কোম্পানির মুনাফার অন্তত ১% বরাদ্দ হয়েছে পরিবেশ রক্ষায়। পুরনো পোশাক মেরামত করে আবার ব্যবহার করার জন্য চালু করেছে Worn Wear Program। নতুন পোশাকের অধিকাংশই তৈরি হয়েছে পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বোতল বা অর্গানিক কটন দিয়ে। এমনকি পরিবেশ নীতি নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে দাঁড়াতেও কুণ্ঠাবোধ করে না এই ব্র্যান্ড।
তবে আজ শুইনার্ড ধনকুবেরদের তালিকায় নেই। আর সেটাই যেন তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন। পৃথিবীকে বাঁচানোর এই লড়াইয়ে তিনি রেখে গেছেন এক অদ্ভুত উত্তরাধিকার—যেখানে ব্যবসা মানে শুধু মুনাফা নয়, বরং প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা।

বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি গড়ে তা দান করে দেওয়া সহজ কাজ নয়। কিন্তু শুইনার্ড দেখিয়ে দিয়েছেন, সত্যিকারের সাফল্য মানে টাকা জমা নয়, বরং পৃথিবীকে কিছু ফিরিয়ে দেওয়া।