স্বপ্ন দেখতে লাগে না পা, চাই অদম্য মন! হুইলচেয়ারে বসে সাফল্যের নয়া নজির আথিরার।

ফাইল চিত্র
শেষ আপডেট: 8 March 2026 11:49
দ্য ওয়াল ব্যুরো: স্বপ্নপূরণের পথে শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে কখনও বাধা হতে দেননি কেরলের মেয়ে আথিরা সুগাথান (Athira Sugathan)। অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও ধৈর্যের জোরে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, কঠিন পরিস্থিতিও মানুষকে দমিয়ে রাখতে পারে না। ২০২৫ সালের UPSC Civil Services Examination-এ তিনি সারা দেশে ৪৮৩তম স্থান অর্জন (UPSC Success Story,) করেছেন। এর আগে তিনবার পরীক্ষায় বসেও সফলতা পাননি আথিরা। তবে চতুর্থ প্রচেষ্টায় তিনি স্বপ্নপূরণে সফল হয়েছেন। হুইলচেয়ারে বসেই যে জীবনের বড় লক্ষ্য জয় করা সম্ভব, তার উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠেছেন তিনি।
প্রতিবছর হাজার হাজার তরুণ-তরুণী Union Public Service Commission-এর এই পরীক্ষায় বসে প্রশাসনিক পদে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন। দেশের অন্যতম কঠিন এই পরীক্ষায় সফল হতে প্রয়োজন দীর্ঘ প্রস্তুতি, কঠোর পরিশ্রম এবং প্রবল আত্মবিশ্বাস। সেই সব গুণের জোরেই শেষ পর্যন্ত সাফল্য পেয়েছেন আথিরা।
শুক্রবার প্রকাশিত হয়েছে ২০২৫ সালের ইউপিএসসি পরীক্ষার ফলাফল। সেখানে ৪৮৩তম স্থান অধিকার করেছেন কেরলের এই তরুণী। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও প্রায় দশ বছর ধরে তিনি লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন নিজের স্বপ্নের জন্য। সেই দীর্ঘ সংগ্রামের পর অবশেষে ২০২৬ সালে এসে তিনি পেলেন সাফল্যের খবর।
২০১৬ সালে কেরালার কোঝিকোড়ের বাসিন্দা আথিরা পড়াশোনার জন্য গিয়েছিলেন Bengaluru-তে। সেখানে তিনি Bachelor of Dental Surgery (BDS) কোর্স করছিলেন। সেই সময়েই একটি ভয়াবহ পথ দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন তিনি। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং দীর্ঘদিন চিকিৎসা চলে।
পরে চিকিৎসকেরা জানান, দুর্ঘটনার ফলে তাঁর শরীরের নীচের অংশে আর সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। অর্থাৎ জীবনের বাকি সময় তাঁকে হুইলচেয়ারে বসেই কাটাতে হবে। এর পাশাপাশি তাঁর স্মৃতিভ্রংশের সমস্যাও দেখা দেয়। প্রায় দু’বছর ধরে তিনি নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগেছেন। পরে দীর্ঘ চিকিৎসার পর তাঁকে কোঝিকোড়ে নিজের বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়।
আথিরা জানিয়েছেন, বেঙ্গালুরুতে গিয়ে BDS পড়ার কথাও তখন তাঁর মনে ছিল না। তবে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার ফলে ধীরে ধীরে পুরোনো স্মৃতি ফিরে আসতে শুরু করে। দুর্ঘটনার কারণে পড়াশোনা মাঝপথে থেমে গিয়েছিল। তাই সুস্থতার কিছুটা উন্নতি হতেই তিনি আবার নতুন করে BDS কোর্স শুরু করেন।
পরিবারের সমর্থন এবং সাহস জোগানোর ফলে তিনি আবার বেঙ্গালুরুতে ফিরে গিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন একজন কেয়ারটেকারও। প্রথম তিন বছর তিনি আগের পড়াশোনার অনেক কিছুই মনে করতে পারতেন না। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব মনে পড়তে শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত তিনি BDS কোর্স সম্পূর্ণ করেন।
২০২০ সালে তিনি একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় যোগ দেন। তখন দেশজুড়ে চলছিল করোনা মহামারি ও লকডাউন। সেই এনজিওতে কাজ করতে গিয়ে তিনি সমাজের বহু শারীরিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের সঙ্গে পরিচিত হন। তাঁদের জীবনসংগ্রাম দেখেই নতুন করে কিছু করার ইচ্ছা জাগে তাঁর মনে। সেখান থেকেই তিনি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় বসার সিদ্ধান্ত নেন।
তিরুবনন্তপুরমের Absolute IAS Academy-তে তিনি ইউপিএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করেন। এই প্রতিষ্ঠানে বিশেষভাবে সক্ষম পরীক্ষার্থীদের জন্য ‘বাটারফ্লাই’ নামে একটি বিশেষ কর্মসূচি চালু ছিল। তবে বেশিরভাগ ক্লাসই তিনি অনলাইনে করতেন।
আথিরার এই দীর্ঘ যাত্রাপথে তাঁর বাবা সুগাথান ও মা মিনি সবসময় পাশে থেকেছেন। পাশাপাশি তাঁর ছোট বোন অনাঘাও বড় ভূমিকা নিয়েছেন। দিদির যত্ন নেওয়ার জন্য তিনি পড়াশোনার ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন BSc Nursing কোর্স। আথিরার মতে, হুইলচেয়ারে বসা মানেই জীবনের স্বপ্ন শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বরং দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি থাকলে শারীরিক সীমাবদ্ধতাও একসময় মাথা নত করতে বাধ্য। তাঁর জীবনসংগ্রামই সেই সত্যকে আবারও প্রমাণ করে দিল।