রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে ‘অসম্মান’ বিতর্কে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতর। ঘটনায় রাজ্যের মুখ্যসচিবের কাছে রিপোর্ট তলব করেছে কেন্দ্র।

দ্রৌপদী মুর্মু ও নন্দিনী চক্রবর্তী
শেষ আপডেট: 8 March 2026 10:39
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে (Droupadi Murmu) কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ‘অপমানজনক’ ঘটনার জেরে নজিরবিহীন প্রশাসনিক তৎপরতা শুরু হল জাতীয় স্তরে। এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সরাসরি রাজ্যের মুখ্যসচিবের কাছে জবাব চাইল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন চিঠি লিখে কড়া বার্তা পাঠিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তীকে।
সূত্রের খবর, চিঠিতে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে কেন্দ্র। আজ, রবিবার বিকেল ৫টার মধ্যে ওই ঘটনার বিস্তারিত তথ্য এবং রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট দিল্লির নর্থ ব্লকে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (PM Narendra Modi) সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। বাংলায় পোস্ট করে মোদী লিখেছেন, 'এটি লজ্জাজনক এবং অভুতপূর্ব। গণতন্ত্র এবং জনজাতি সম্প্রদায়ের ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী মানুষজন সকলেই মর্মাহত। জনজাতি সম্প্রদায় থেকেই উঠে আসা রাষ্ট্রপতি মহোদয়ার প্রকাশিত বেদনা ও উদ্বেগ ভারতের মানুষের মনে গভীর দুঃখের সঞ্চার করেছে।'
রাজ্যে এসে 'অসম্মানিত' হয়েছেন রাষ্ট্রপতি! এই অভিযোগ তুলে প্রধানমন্ত্রী লেখেন, 'পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) সরকার সত্যিই সমস্ত সীমা লঙ্ঘন করেছে। রাষ্ট্রপতির প্রতি এই অসম্মানের জন্য তাদের প্রশাসনই দায়ী। এটিও অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে সাঁওতাল সংস্কৃতির মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়কে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এতো হালকাভাবে দেখছে।'
তিনি আরও উল্লেখ করেন, 'রাষ্ট্রপতির পদ রাজনীতির ঊর্ধ্বে এবং এই পদের গরিমা সর্বদা রক্ষা করা উচিত। আশা করা যায় পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও তৃণমূল কংগ্রেসের শুভবুদ্ধির উদয় হবে।'
রাষ্ট্রপতি-বিতর্কে পোস্ট করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তাঁর অভিযোগ, 'রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আচরণে প্রোটোকল মানা হয়নি এবং এতে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদটির মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়েছে।'
এক্স হ্যান্ডেলে অমিত শাহ লেখেন, 'পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকার আজ এমন আচরণ করেছে যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। অভিযোগ করা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির প্রতি যথাযথ সম্মান দেখানো হয়নি এবং সরকারি নিয়মকানুনও মানা হয়নি।'
শনিবার উত্তরবঙ্গ সফরে এসে রাজ্য প্রশাসন তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) ভূমিকা নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু (Draupadi Murmu)। শিলিগুড়িতে আন্তর্জাতিক সাঁওতাল কনফারেন্সে যোগ দিয়ে দেশের প্রথম আদিবাসী রাষ্ট্রপতি আক্ষেপের সুরে বলেন, “আমিও বাংলার মেয়ে, অথচ আমাকে বাংলায় আসতেই দেওয়া হয় না। জানি না মমতাদির আমার উপর কেন এত রাগ!”
এদিন বাগডোগরা এয়ারপোর্ট অথরিটির মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভিড় ছিল অত্যন্ত কম। অধিকাংশ চেয়ার খালি পড়ে থাকতে দেখে দৃশ্যতই ক্ষুব্ধ হন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, “এটা যে একটা ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স, দেখে তো মনেই হচ্ছে না! প্রশাসনের মনে কী চলছিল জানি না।" এই অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যাওয়ার পরই রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু কাছেই আরেকটি জায়গায় যান যেখানে অনুষ্ঠানটি হওয়ার কথা ছিল। সেখানে তিনি বলেন, "ওরা বলেছিল পর্যাপ্ত জায়গা নেই, কিন্তু এখানে তো ৫ লক্ষ লোক অনায়াসেই ধরে যেত।” এরপরই সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীকে ‘ছোট বোন’ সম্বোধন করে তিনি প্রশ্ন তোলেন তাঁর ‘রাগ’ নিয়ে। যদিও রাষ্ট্রপতি যোগ করেন, তাঁর কোনও ব্যক্তিগত অভিযোগ নেই।
বাগডোগরা এয়ারপোর্টের অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে এ রাজ্যের আদিবাসী ও সাঁওতাল সমাজের অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন দ্রৌপদী মুর্মু। তিনি বলেন, “আমার দেখে মনে হচ্ছে না যে আদিবাসী সমাজের মানুষ সরকারি কোনও সুযোগ-সুবিধা ঠিকমতো পান। আদৌ তাঁরা সব সুবিধা পাচ্ছেন কি না, তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।”
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ধর্মতলার ধর্নামঞ্চ থেকে তার উত্তর দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। একইসঙ্গে রাষ্ট্রপতিকে রাজনৈতিক এজেন্ডা প্রচারের জন্য বিজেপি ব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ তোলেন।
মেট্রো চ্যানেলের ধর্নামঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী (West Bengal CM) এনিয়ে কথা বলেন। তাঁর অভিযোগ, তিনি রাষ্ট্রপতিকে যথেষ্ট সম্মান করেন, কিন্তু বিজেপির রাজনৈতিক এজেন্ডা প্রচারের জন্য তাঁকে ব্যবহার করা হচ্ছে। মমতার দাবি, রাজ্যে কেউ এলে তাঁকে স্বাগত জানানো হয়, তবে বারবার কেউ আসলে প্রতিবার উপস্থিত থাকা সম্ভব নয়, কারণ সরকারের আরও কাজ থাকে। সব মিলিয়ে, রাষ্ট্রপতির এই সফরকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতর।