রাজস্থানের যোধপুর শহরের বুকে, যেন মরুভূমির বুক ফুঁড়ে সোনালি আভায় জেগে উঠেছিল এক বিস্ময়— উমেদ ভবন প্রাসাদ (Umaid Bhawan Palace)।

যোধপুর শহরের বুকে, যেন মরুভূমির বুক ফুঁড়ে সোনালি আভায় জেগে উঠেছিল এক বিস্ময়।
শেষ আপডেট: 14 October 2025 08:50
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাজস্থানের যোধপুর শহরের বুকে, যেন মরুভূমির বুক ফুঁড়ে সোনালি আভায় জেগে উঠেছিল এক বিস্ময়— উমেদ ভবন প্রাসাদ (Umaid Bhawan Palace)। ভারতে রাজতন্ত্রের শেষ দিকের রাজকীয় প্রাসাদগুলির মধ্যে এ ভবন অন্যতম। আজও রূপকথার মতোই রাজবংশের গৌরবগাথা শুনিয়ে যায় এই প্রাসাদ। কিন্তু এর ইতিহাস শুধু রাজকীয় মহিমা নয়, এক অসমাপ্ত যুদ্ধ জয়ের গল্পও বটে। এই প্রাসাদের মালিক, মারওয়ারের যুবরাজ শিবরাজ সিংয়ের (Shivraj Singh of Jodhpur) লড়াইটাও কোনও জমজমাট চিত্রনাট্যের কম নয়। আর তাঁর ফিরে আসাটাও ফিনিক্স পাখির মতই।
তবে শিবরাজ সিংয়ের গল্প জানার আগে, জেনে নেওয়া দরকার উমেদ ভবনের ইতিহাস। ১৯২৯ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরের শ্রমে গড়ে উঠেছিল এই প্রাসাদ। স্থপতি ছিলেন ব্রিটিশ আর্কিটেক্ট হেনরি ভন ল্যাঙ্কেস্টার। চিতোর পাহাড়ের উপরে গড়া এই সোনালি বেলেপাথরের প্রাসাদে ৩৪৭টি ঘর, দৃষ্টিনন্দন গম্বুজ, অন্দরমহল ও ২৬ একরের বাগান রয়েছে। সে সময়ে প্রবল খরা হয়েছিল। তাতে কৃষিকাজ পণ্ড হয়। খরার সময়ে মারওয়ার অঞ্চলের কয়েক হাজার কৃষককে রোজগারের সুযোগ দিতে এই প্রকল্প শুরু করেছিলেন যোধপুরের মহারাজা উমেদ সিং (Umaid Singh of Jodhpur)। বর্তমান হিসেবে এই প্রাসাদের বাজারমূল্য প্রায় ২২,৪০০ কোটি টাকা!
এখন এই প্রাসাদ তিন ভাগে বিভক্ত— একাংশে রাজপরিবার বাস করে, একাংশে একটি জাদুঘর রয়েছে এবং বাকি অংশ পরিচালনা করে তাজ হোটেলস (Taj Hotels)। তারা একটি বিলাসবহুল হোটেল হিসেবে উমেদ ভবন চালায়। প্রাসাদের ভেতরে ঢুকলেই মনে হয় সময় যেন স্থির হয়ে গেছে।
১৯৭৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর যোধপুর জন্ম হয় শিবরাজ সিংহের। তিনি মারওয়ার রাজবংশের উত্তরাধিকারী, রাজা গজ ও রানি হেমলতার একমাত্র ছেলে। শিবরাজের ধমনীতে রয়েছে রাঠৌর বংশের রক্ত, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শাসন করেছে এই মরুভূমির রাজ্য।
শিবরাজ পড়াশোনা করেছেন এল্টন কলেজ ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ছোটবেলা থেকেই ছিল রাজকীয় আভিজাত্য, কিন্তু তার থেকেও বেশি ছিল তাঁর আবেগ— পোলো খেলা। বাবার মতো তিনিও ছিলেন আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড়। ‘ফেস অফ ইন্ডিয়ান পোলো’ নামে তাঁকে চিনত সারা দুনিয়া।

কিন্তু এক মুহূর্তে যেন পাল্টে যায় সবকিছু। ২০০৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। জয়পুরের রামবাগ পোলো গ্রাউন্ডে বিড়লা কাপের ম্যাচে খেলছিলেন শিবরাজ। বলের পেছনে ছুটতে ছুটতে এক প্রতিপক্ষের ঘোড়া ধাক্কা মারে তাঁর ঘোড়াকে। মুহূর্তের মধ্যে পড়ে যান মাটিতে— প্রচণ্ড আঘাত লাগে মাথায়। হাসপাতালে নেওয়ার পর জানা যায়, মস্তিষ্কে ভয়াবহ রক্তক্ষরণ হয়েছে। দীর্ঘ দুই মাস তিনি ছিলেন কোমায়। সেই মুহূর্তে যেন থমকে গিয়েছিল মারওয়ারের রাজবাড়ি। আন্তর্জাতিক পোলো দুনিয়া তাকিয়ে ছিল— রাজপুত্র কি আর ফিরবেন?
কথায় বলে রাখে হরি মারে কে! শিবরাজও যেন তেমনই। অবিশ্বাস্য ধৈর্য আর দীর্ঘ রিহ্যাবিলিটেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে ফিরে আসেন রাজপুত্র। তিনি ভাষা হারিয়েছিলেন, হাঁটতে পারতেন না ঠিকমতো। কিন্তু ভেতরের ইচ্ছাশক্তি ছিল অদম্য। বিদেশি ফিজিওথেরাপিস্টের সাহায্যে তিনি ধীরে ধীরে আবার নিজের জীবনে ফিরে আসতে থাকেন।
এই কঠিন সময়টা সামলান তাঁর দিদি শিবরঞ্জনী রাজে। কেমব্রিজ শিক্ষিত এই রাজকন্যাই দেখভাল করেন রাজপরিবারের সম্পত্তি, প্রাসাদের রক্ষণাবেক্ষণ, জাদুঘর আর হোটেল ব্যবসা। উমেদ ভবন তাঁর হাতে নতুন করে জেগে ওঠে।
দীর্ঘ চিকিৎসা আর লড়াইয়ের পর ২০১০ সালের নভেম্বরে বিয়ে করেন শিবরাজ সিংহ। কনে গায়ত্রী কুমারী পাল। গায়ত্রী ছিলেন উত্তরাখণ্ডের এক রাজপরিবারের মেয়ে। তাঁদের বিয়ে ছিল ঠিক যেন রাজকাহিনির দৃশ্য। জোধপুর ও জয়পুর যেন ফিরে গিয়েছিল রাজকীয় যুগে। সে বছরের শুরুতে তথা মার্চ মাসে উমেদ ভবন প্রাসাদের অন্দরমহলে হয়েছিল বাগদান। পরিবারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রা শুধু উপস্থিত ছিলেন সেখানে। রাজস্থানি লোকসংগীত, মৃদু আলোকসজ্জা আর রাজকীয় আতিথেয়তা— সব মিলিয়ে যেন ইতিহাসের পাতা খোলা হয়েছিল সেই অনুষ্ঠানে।

তার পর বিয়ের ছাদনাতলা সাজানো হয়েছিল জয়পুরের রামবাগ প্রাসাদে। অতিথিদের জন্য ভাড়া করা হয়েছিল একটি বিশেষ চার্টার্ড ট্রেন, যাতে করে রাজকীয় শোভাযাত্রার মতো করেই সবাইকে নিয়ে যাওয়া হয় রামবাগ প্রাসাদে। এই ট্রেনেই ছিলেন দেশের নানা প্রান্তের প্রাক্তন রাজপরিবারের সদস্য, রাজনীতিক, শিল্পপতি, বলিউড তারকা ও বিদেশি অভিজাত অতিথিরা।
শোভাযাত্রার সামনে ছিল একটি নীলচে রঙের ১৯৩৫ সালের রোলস রয়েস ফ্যানটম (Rolls-Royce Phantom)— রাজবাড়ির ঐতিহ্যের প্রতীক। তার পেছনে ঘোড়সওয়ার, রাজপুত সৈন্যবাহিনীর ঐতিহ্যবাহী সাজে সজ্জিত বাহিনী, আর রাজস্থানি ঢোল-নগাড়ার বাজনা।
রামবাগ প্যালেসে তৈরি করা হয়েছিল বিশেষ রাজকীয় মঞ্চ। সোনালি আলোয় ভাসছিল পুরো প্রাসাদ। আকাশে আতসবাজি, প্রাসাদের প্রাঙ্গণে রাজস্থানি লোকশিল্পীদের পরিবেশনা আর চারিদিকে অতিথিদের পরনে ঐতিহ্যবাহী পোষাক— যেন কোনো রাজকীয় উৎসবের দৃশ্য।

বরযাত্রী দলকে স্বাগত জানানো হয় প্রাচীন মারওয়ারি ঐতিহ্য মেনে। গায়ত্রীর পরনে ছিল রাজবাড়ির গহনা ও লাল-সোনালি রঙের বেনারসি পোশাক, যা বিশেষভাবে বোনা হয়েছিল কাশীতে। শিবরাজ পরেছিলেন রাজকীয় শেরওয়ানি, পাগড়িতে ছিল মারওয়ার রাজপরিবারের প্রতীক।
এই আয়োজনের পর উমেদ ভবনের নাম আরও একবার আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে ছড়িয়ে পড়ে, আর রাজকুমার শিবরাজ ও গায়ত্রীর এই বিয়ে রাজস্থানের ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকে। ক্রমশ ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে উমেদ ভবন।
উমেদ ভবন এখন ভারতের রাজকীয় ঐতিহ্যের এক প্রতীক। প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক আসেন এই প্রাসাদে। ২০১৮ সালে এখানেই বিয়ে করেছিলেন প্রিয়ঙ্কা চোপড়া (Priyanka Chopra) এবং নিক জোনাস (Nick Jonas)। সেই বিয়ে যা আন্তর্জাতিক স্তরে এই প্রাসাদের বিলাস ও বৈভবের কথা সোনার অক্ষরে লিখে দেয়। তার আগে এলিজাভেথ হার্লে ও অরুণ নায়ারের বিয়েও হয়েছিল এখানেই।
এই প্রাসাদের একাংশে আজও রাজপরিবার বাস করে। অন্য অংশ পর্যটন ও হোটেল ব্যবসা থেকে আনে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব। এই প্রাসাদ শুধু রাজকীয় ঐতিহ্যের সাক্ষ্য নয়— এটি যোধপুরের অর্থনীতিরও একটি বড় চালিকাশক্তি।