রাহুলের সফরসূচিতে রয়েছে কলম্বিয়া, ব্রাজিল, পেরু এবং চিলি। চারটি দেশই আজ সমাজতান্ত্রিক বা বামমনস্ক শাসনে চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাহুলের এই সফর নিছক কূটনৈতিক নয়; এর ভিতর লুকিয়ে থাকতে পারে আদর্শগত ‘সংযোগ’ও।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 7 October 2025 11:53
১৯৫২ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে আর্জেন্টিনার (Argentina) এক তরুণ চিকিৎসক পড়ুয়া পাড়ি দিয়েছিলেন মহাযাত্রায়। পুরনো নর্টন ৫০০ সিসি মোটরসাইকেল ‘লা পোদেরোসা ২’ তে চেপে দক্ষিণ আমেরিকার (South Africa) মরুভূমি, জঙ্গল আর পর্বত অতিক্রম করেছিলেন তিনি। যাত্রাপথে দেখেছিলেন দারিদ্র্য, শোষণ, আর বৈষম্যের নগ্ন রূপ। সেই অভিজ্ঞতাই এক তরুণ এরনেস্তো গেভারাকে রূপ দিয়েছিল বিশ্ববিপ্লবী ‘চে গেভারা’ (Che Guevara) হিসেবে।
প্রায় তিন-চতুর্থাংশ শতাব্দী পরে, ভারতীয় রাজনীতিতে (Indian Politics) যেন নতুন করে দেখা মিলল এক ‘চে’র ছায়ার। দক্ষিণ আমেরিকার চারটি দেশ সফরে বেরিয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী (Rahul Gandhi), যেখানে সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি আজও বেঁচে আছে বাস্তবে। তাঁর এই সফর যেন এক অন্যরকম ‘মোটরসাইকেল ডায়েরি’ (Motor Cycle Diary)। যদিও এবার রাহুল কোনও বাইক চেপে বেরোননি, আর সফরও কাকতালীয়ভাবে সেই মহাদেশেই।
সফরের শুরু কলম্বিয়ার বোগোতায় পৌঁছে রাহুলের প্রথম পোস্টেই ছিল এক ভারতীয় মোটরসাইকেলের উল্লেখ। স্থানীয় বাজারে বাজাজ পালসার দেখে তিনি প্রশংসা করেন ভারতের দুই-চাকার নির্মাতাদের। পরে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে আলোচনাতেও বাইকের প্রসঙ্গ তোলেন তিনি। তাও সেটা এমনভাবে, যে শ্রোতাদের অনেকেই খানিক হতবাক হয়ে যান।
এমনকি এর আগেও, চলতি বছরের অগস্টে বিহারে ‘ভোটার অধিকার যাত্রা’য় রাহুলকে দেখা গিয়েছিল তেজস্বী যাদবের সঙ্গে বাইকে চেপে ঘুরতে। দারভাঙায় নিরাপত্তা দলের ভুলে একটি বাইক হারিয়ে গেলে রাহুল নিজেই মালিককে নতুন পালসার ২২০ উপহার দেন। ঘটনাগুলো থেকে মনে হচ্ছে, রাহুল আর মোটরসাইকেল, দু'জনেই বারবারই পরস্পরের মুখোমুখি হয়ে পড়ছে!
রাহুলের সফরসূচিতে রয়েছে কলম্বিয়া, ব্রাজিল, পেরু এবং চিলি। চারটি দেশই আজ সমাজতান্ত্রিক বা বামমনস্ক শাসনে চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাহুলের এই সফর নিছক কূটনৈতিক নয়; এর ভিতর লুকিয়ে থাকতে পারে আদর্শগত ‘সংযোগ’ও।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি যেমন জাতিগত জনগণনা, সম্পদের পুনর্বণ্টন, এবং পুঁজিপতিদের প্রভাবের বিরোধিতা নিয়ে সরব হয়েছেন, তেমনই এই সফরে তিনি পৌঁছেছেন সেই দেশগুলিতেই, যেখানে সমাজতন্ত্র কেবল রাজনৈতিক বুলি নয়, শাসনের বাস্তব রূপও।
রাহুলের প্রথম গন্তব্য কলম্বিয়া। ২০২২ সালে এই দেশটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসেন এক বামপন্থী প্রেসিডেন্ট, গুস্তাভো পেত্রো। প্রাক্তন এম-১৯ গেরিলা যোদ্ধা পেত্রো এখন শান্তি, সামাজিক ন্যায় ও পরিবেশ রক্ষার বার্তা দিচ্ছেন। তাঁর সরকার কর ব্যবস্থায় সংস্কার এনে ধনীদের ওপর কর বাড়িয়েছে, ভূমি বণ্টনে জোর দিচ্ছে এবং দরিদ্রদের জন্য সামাজিক প্রকল্প বিস্তৃত করছে।
রাহুলের দ্বিতীয় গন্তব্য ব্রাজিল, যেখানে ফের ক্ষমতায় ফিরেছেন প্রবীণ নেতা লুইজ ইনাসিও ‘লুলা’ দা সিলভা। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষায় লুলার ভূমিকা কিংবদন্তি। তাঁর ‘বোলসা ফ্যামিলিয়া’ প্রকল্প লক্ষ লক্ষ পরিবারকে দারিদ্র্য থেকে তুলেছিল। পরিবেশ রক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন— দুই দিকেই নজর রেখে নীতিনির্ধারণে তিনি আজও বিশ্বজোড়া প্রভাবশালী।
পেরুর প্রেসিডেন্ট দিনা বলুয়ার্তে একসময় মার্ক্সবাদী দল ফ্রি পেরু-র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে ২০২২-এ ক্ষমতায় আসার পর থেকে তাঁর শাসন অনেকটাই বাস্তববাদী। গ্রামীণ উন্নয়ন, সামাজিক কল্যাণ কর্মসূচির মতো বিষয় এখনও তাঁর নীতির কেন্দ্রে, যদিও তাঁকে রোজই টানতে হচ্ছে ডান ও বাম দুই দিকের ভারসাম্য।
আবার সব শেষে, চিলির প্রেসিডেন্ট গ্যাব্রিয়েল বরিক, মাত্র ৩৯ বছর বয়সে এক নতুন প্রজন্মের সমাজতান্ত্রিক নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে ওঠেন। ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে এসে বরিক এখন লিঙ্গসমতা, জলবায়ু নীতি এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ‘টাইম’ ম্যাগাজিন ২০২২ সালে তাঁকে বলেছিল “চিলির মিলেনিয়াল প্রেসিডেন্ট, এক নতুন ধরনের বাম নেতা।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাহুল গান্ধীর এই সফরের পেছনে রয়েছে বহুস্তরীয় ব্যাখ্যা। কেউ দেখছেন দক্ষিণ গোলার্ধে ভারতের ঐতিহাসিক ‘গ্লোবাল সাউথ’ সংযোগকে আরও গভীর করার কূটনৈতিক প্রয়াস হিসেবে। আবার কেউ মনে করছেন, এটি রাহুলের নিজের রাজনৈতিক দর্শনের আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান। সমাজতন্ত্রকে কাছ থেকে দেখার এক প্রচেষ্টা।
যেভাবেই দেখা হোক, মোটরসাইকেল আর সমাজতন্ত্রের মিলন যেন তাঁর সফরে নতুন এক প্রতীক তৈরি করেছে।
একসময় চে গেভারা যেমন যাত্রাপথে আবিষ্কার করেছিলেন বিপ্লবের আদর্শ, রাহুল গান্ধীর এই দক্ষিণ আমেরিকা সফরও হয়তো হয়ে উঠতে পারে এক আত্ম-অন্বেষণের অধ্যায়।
যাত্রা শুরু হয়েছিল এক আর্জেন্টাইন তরুণের মোটরসাইকেলে। সাত দশক পর, আরেক ভারতীয় নেতা নতুন এক দিকের সন্ধানে সেই মহাদেশেই যাচ্ছেন। অনেকেই বলাবলি করছেন, ইতিহাস বুঝি আবারও রাজনীতিতে এক নতুন বৃত্ত আঁকছে।