বিশেষত ২০২৫ সালে ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা মারিয়া করিনা মাচাদোকে পুরস্কার দেওয়া নিয়ে যে রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি হয়েছে, তা আবার প্রশ্ন তুলেছে, নোবেল শান্তি পুরস্কার কি সত্যিই নিরপেক্ষ?

গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 11 October 2025 19:38
দ্য ওয়াল ব্যুরো: নোবেল শান্তি (Nobel Peace Prize 2025) পুরস্কার মানেই শান্তি, মানবতা আর ন্যায়ের প্রতীক। অন্তত সেটাই ভাবা হয়। কিন্তু প্রতি কয়েক বছর অন্তর এই পুরস্কার ঘিরে শুরু হয় নতুন বিতর্ক। বিশেষত ২০২৫ সালে ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা মারিয়া করিনা মাচাদোকে (Maria Corina Machado) পুরস্কার দেওয়া নিয়ে যে রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি হয়েছে, তা আবার প্রশ্ন তুলেছে, নোবেল শান্তি পুরস্কার (Nobel Prize) কি সত্যিই নিরপেক্ষ?
এই বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খোলাখুলিভাবে পুরস্কারের দাবি তুলেছিলেন। কিন্তু পুরস্কার পেয়েছেন মাচাদো, যিনি তাঁর দেশে একনায়ক নিকোলাস মাদুরোর বিরোধিতার জন্য পরিচিত। ফলে আবারও সামনে এসেছে পুরনো প্রশ্ন, নোবেল কমিটি কি আদৌ রাজনীতি থেকে মুক্ত?
১. মারিয়া করিনা মাচাদো (২০২৫)
ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী, গণতন্ত্রের পক্ষে লড়াইয়ের প্রতীক। তবে সমালোচকেরা বলছেন তিনি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সমর্থক, বেসরকারিকরণের পক্ষে, এবং দক্ষিণ আমেরিকার ডানপন্থী রাজনীতিবিদদের প্রশংসা করেছেন। ফলে অনেকের চোখে তাঁর পুরস্কারটি রাজনৈতিক অবস্থানেরই প্রতিফলন।
২. হেনরি কিসিঞ্জার ও লে ডাক থো (১৯৭৩)
ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় শান্তিচুক্তির জন্য পুরস্কার পেলেও, থো তা ফিরিয়ে দেন। কারণ যুদ্ধ তখনও থামেনি। কিসিঞ্জারের কূটনৈতিক কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে কম্বোডিয়া ও চিলিতে গোপন অভিযান, পুরস্কারটিকে করে তোলে ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত সিদ্ধান্ত।
৩. আনোয়ার সাদাত ও মেনাচেম বেগিন (১৯৭৮)
ইজিপ্ট–ইজরায়েল শান্তিচুক্তির স্থপতি। যুদ্ধ থেমেছিল বটে, কিন্তু প্যালেস্তাইনের ইস্যু নিরসন হয়নি বলে সমালোচকরা বলেন, এই পুরস্কার শান্তির চেয়ে রাজনৈতিক স্বার্থের বেশি প্রতিফলন।
৪. ইয়াসের আরাফাত, শিমন পেরেস ও ইৎজাক রবিন (১৯৯৪)
ওসলো শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর তাঁদের সম্মানিত করা হয়। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই ইজরায়েল–প্যালেস্তাইন সংঘর্ষ ফের জ্বলে ওঠে। ফলে প্রশ্ন ওঠে অপূর্ণ শান্তির জন্য পুরস্কার দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত?
৫. বারাক ওবামা (২০০৯)
দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই "আন্তর্জাতিক কূটনীতি জোরদার করার জন্য" নোবেল পান ওবামা। সমালোচকদের মতে, তাঁর শাসন আমলে ড্রোন হামলা ও আরব দুনিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি বুঝিয়ে দিয়েছে পুরস্কারটি তখন শুধু আশা নয়, আগেভাগে দেওয়ার সিদ্ধান্তও ছিল।
৬. অং সান সু চি (১৯৯১)
গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে পুরস্কার পান মায়ানমারের এই নেত্রী। কিন্তু পরে রোহিঙ্গা নিপীড়নে তাঁর নীরবতা ও সরকারী ভূমিকা তাঁকে করে তোলে ‘বিতর্কের নোবেলজয়ী’।
৭. হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোস (২০১৬)
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট, যিনি ফার্ক বিদ্রোহীদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করেন। তবে দেশজুড়ে সেই চুক্তি গণভোটে খারিজ হয়। তাই সমালোচকেরা বলেন, পুরস্কারটি ছিল তাড়াহুড়ো করে দেওয়া।
৮. ইউরোপীয় ইউনিয়ন (২০১২)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী শান্তি রক্ষার প্রচেষ্টার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নকে পুরস্কার দেওয়া হয়। কিন্তু অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, একটি রাজনৈতিক সংগঠন কীভাবে শান্তির প্রতীক হতে পারে?
গান্ধীর নোবেলবঞ্চনা (১৯৪৮)
এদিকে যিনি ছিলেন শান্তির প্রতীক, সেই মহাত্মা গান্ধী কখনও নোবেল পুরস্কার পাননি। তাঁর হত্যার বছরেই কমিটি জানায়, “যোগ্য প্রার্থী নেই”, যা আজও ইতিহাসের অন্যতম বড় নৈতিক প্রশ্ন।
এই সব ঘটনাই নোবেল শান্তি পুরস্কারকে আদর্শ আর বাস্তব রাজনীতির সংযোগস্থলে এনে দাঁড় করিয়েছে বারবার। কখনও এটি মানবতার কণ্ঠকে জোরদার করে, কখনও আবার বিভাজন করে। মাচাদোকে পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্তও সেই পুরনো বিতর্ককেই ফের জাগিয়ে তুলেছে, তাহলে শান্তির নোবেল কি সত্যিই শান্তির জন্য, নাকি কূটনীতির এক সূক্ষ্ম অস্ত্র!