সীমান্ত পাহারা দেওয়ার পাশাপাশি তিনি লড়ছেন আরও এক কঠিন যুদ্ধে - দারিদ্র্য আর অশিক্ষার বিরুদ্ধে।

নিজের লক্ষ্যে অটল শক্তি
শেষ আপডেট: 27 October 2025 19:55
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দেশের সেবার জন্য যে হাতে বন্দুক ওঠে, আবার সেই হাতই তুলে নেয় কলম, মুখে তুলে দেয় খাবার। পরনের সেনা পোশাক মনে করিয়ে দেয় দেশরক্ষার শপথ। আর নিজের শিকড় ভুলতে দেয় না যে, এখানেই থেমে থাকলে হবে না, যাদের কাছে শিক্ষার আলো চুঁইয়ে এসে পড়ে, তাদের স্বার্থে বন্দুকের ওই হাতেই তুলে ধরতে হবে বই। শুধু তো তাই নয়, তাদের জন্য করতে হবে দু'বেলা দু'মুঠো অন্নের জোগাড়ও (social service)।
অসম রাইফেলসের (Assam Rifles) 'রাইফেলম্যান' শক্তি পালের (Sakti Paul) কাছে সেই দেশসেবা, দায়িত্বের সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত। সীমান্ত পাহারা দেওয়ার পাশাপাশি তিনি লড়ছেন আরও এক কঠিন যুদ্ধে - দারিদ্র্য আর অশিক্ষার বিরুদ্ধে।
১৯৯১ সালে শিলিগুড়িতে জন্ম শক্তি পালের। ছোটবেলাটা কেটেছে অন্ধকার আর অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করেই। খুব অল্প বয়সে বাবাকে হারিয়ে দেখেছেন মায়ের নিরন্তর সংগ্রাম, কেরোসিন তেল আর ডিম বিক্রি করে সংসার চলত তাঁদের। ছোট্ট শক্তির অনেক রাত কেটেছে হারিকেনের ম্লান আলোয় পড়াশোনা করে। কিন্তু সেই টিমটিমে কিন্তু দৃঢ় আলোই ভেতরে জাগিয়ে দিয়েছিল বড় এক স্বপ্ন। দীর্ঘ অধ্যবসায়ের পর ২০০৯ সালের নভেম্বরে সফলভাবে ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন শক্তি, যোগ দেন দেশের সেবায়।
সেনাজীবনে শক্তি পাল প্রমাণ করেছেন অসাধারণ সাহসিকতা। মায়ানমার সীমান্ত (২০১০–২০১৩), অসম, মণিপুর - দেশের সবচেয়ে কঠিন এলাকাগুলিতে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এমনকী ২০২২ সালের প্রজাতন্ত্র দিবস প্যারেডে দিল্লির রাজপথে সৈন্যদলের নেতৃত্ব দেওয়ার সম্মানও পেয়েছেন। তবু এত বছরের সামরিক দায়িত্বের মাঝেও নিজের শেকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রেখেছেন এই সেনা।
‘বিদ্যাছায়া পাঠশালা’ - এক সৈনিকের আলোকযাত্রা
নিজের মতো আর কোনও শিশুকে যেন অভাবের তাড়নায় জীবনের সঙ্গে যুঝতে না হয়, পড়াশোনার জীবন থেকে দলছুট যেন না হয়ে পড়ে কেউ - আরও একরকম কঠিন দেশসেবার স্বপ্ন নিয়েই শক্তি পাল গড়ে তোলেন ‘বিদ্যাছায়া পাঠশালা’।
শিলিগুড়ির কাওয়াখালিতে তাঁর এই ছোট্ট স্কুল আজ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আশার আলো হয়ে উঠেছে। এখানে প্রায় ৮০ জন অনাথ ও দরিদ্র শিশু বিনা খরচায় শিক্ষা পাচ্ছে।
এখানেই থেমে থাকেননি শক্তি। কলকাতার দমদম ক্যান্টনমেন্ট এলাকার ঝুপড়ি-বস্তিতে, স্থানীয় এনজিও ‘আশার আলো – দ্য হোপ’-এর সঙ্গে যৌথভাবে নিয়মিত বিনামূল্যে ক্লাসের আয়োজন করেন শক্তি। পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের চা-বাগান এলাকার দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারগুলির মধ্যে পোশাক ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করেন নিজেই।
শক্তি পালের কাছে পড়ানোও একধরনের দেশরক্ষা। তাঁর কথায়, “আমি জানি, শূন্য হাতে বড় হওয়া কতটা কঠিন। যদি আমার উদ্যোগে একজন শিশুও স্কুল ছেড়ে না যায়, তাহলেই মনে করি আমার ইউনিফর্মের মর্যাদা রাখতে পেরেছি।”
এই সেনার যাত্রা মনে করিয়ে দেয়, দেশরক্ষা শুধু সীমান্ত পাহারা নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করাও এক মহৎ দায়িত্ব। রাইফেলম্যান শক্তি পালের জীবন সত্যিকারের এক অনুপ্রেরণা, যেখানে বীরত্ব মানে সাহস, সহানুভূতি ও অটল দায়বদ্ধতা। তার সঙ্গেই মিশেছে এই 'পোড়া দেশে'র মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ, তাদের প্রতি নিটোল ভালবাসা।