বিগ্রহের নাম ‘ত্রিশুন্ড গণপতি’। মন্দিরের নাম সেখান থেকেই। নামের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এর বৈশিষ্ট্য।

ত্রিশুণ্ড গণপতি
শেষ আপডেট: 27 August 2025 18:17
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পুণের সোমওয়ার পেঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে রয়েছে আড়াই শতাব্দী পুরনো এক গণেশ মন্দির। যা মহারাষ্ট্রের অন্যতম বিখ্যাত মন্দিরের একটি, বিশেষও বটে। স্থানীয়দের মধ্যে বহুল প্রচলিত নাম হলেও এই মন্দির অনেকেই চেনেন না। এর ইতিহাস, ঐতিহ্য এখনও তিরুপতি বা মহারাষ্ট্রেরই অন্যান্য বিখ্যাত মন্দিরের মতো জনমুখে ঘুরে বেড়ায় না। এর সঙ্গে রয়েছে বাংলার যোগও।
বিগ্রহের নাম ‘ত্রিশুন্ড গণপতি’। মন্দিরের নাম সেখান থেকেই। নামের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এর বৈশিষ্ট্য। এখানকার গণেশ প্রতিমার এক নয়, দু’টিও নয়, তিনটি শুঁড়। শুধু তাই নয়, এই বিরল প্রতিমা বসেন ইঁদুর ছেড়ে ময়ূরের পিঠে। এই মন্দিরে প্রচলিত রীতি ভেঙে প্রতিমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে। ছ’হাতবিশিষ্ট কালো ব্যাসল্ট পাথরে খোদাই করা মূর্তি রত্নখচিত অলঙ্কারে সজ্জিত।
বিরল রূপেই মন্দিরের নাম, ‘ত্রিশুন্ড’, অর্থাৎ তিন শুঁড়। এর ইতিহাসও কম সমৃদ্ধ নয়। ১৭৫৪ সালে শুরু হয় নির্মাণকাজ, শেষ হতে সময় লাগে ১৬ বছর। ১৭৭০ সালে পূর্ণ হয় এই মন্দির, প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন গিরি গোঁসাই সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসী ভীমগিরজি গোঁসাই। ধারণা করা হয়, প্রথমে এটি শিবমন্দির হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল। কারণ ছাদের উপর বহু শিবলিঙ্গের উপস্থিতি সেই সাক্ষ্যই দেয়। কিন্তু পরে গণপতির মন্দির হিসেবে নতুন রূপ পায়। আঠেরো শতকে মন্দিরটি শুধু পুজোর জায়গা ছিল না, একে ব্যবহার করা হত যোগীদের সাধনাকেন্দ্র হিসেবে। এখানেই হয়েছিল ভীমগিরজির সমাধিও। ফলে একে ধর্ম, শিক্ষা ও সাধনার মিলনক্ষেত্র বলা চলে।
স্থাপত্যে আছে দারুণ বৈচিত্র। পুরো মন্দির নির্মিত হয়েছে দাক্ষিণাত্যর কালো ব্যাসল্ট পাথরে। আকারে আয়তাকার হলেও মুখশ্রীতে মিল খুঁজে পাওয়া যায় প্রাচীন গুহামন্দিরের। একদিকে রাজস্থানী, মালওয়া ও দক্ষিণ ভারতীয় ছোঁয়া, অন্যদিকে মারাঠা প্রভাব, সব মিলিয়ে স্থাপত্য একেবারেই অনন্য।
ভাস্কর্যে ফুটে উঠেছে গণ্ডার, হাতি, পৌরাণিক জীবজন্তু, দ্বাররক্ষক দেবতা থেকে শুরু করে যুদ্ধের জীবন্ত দৃশ্য। সবচেয়ে চমকপ্রদ এক ফলক, যেখানে খোদাই করা আছে পলাশীর যুদ্ধ-পরবর্তী দৃশ্য; ব্রিটিশ সেনা ও শৃঙ্খলাবদ্ধ গণ্ডারের প্রতীকী ছবি। ভিতরে সংস্কৃত, দেবনাগরী ও ফারসি ভাষায় লিপি, এমনকি গীতা থেকে শ্লোকও খোদিত রয়েছে।
বর্তমানে এই মন্দির সংরক্ষণে উদ্যোগ নিয়েছে পুণে মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন। প্রাচীন ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রেখে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে চলছে পুনর্নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ। আধ্যাত্মিক ভক্তি, স্থাপত্যকলা ও ইতিহাস, সব মিলিয়ে আজ ‘ত্রিশুন্ড’ গণপতি মন্দির একইসঙ্গে ভক্ত ও শিল্পপ্রেমীদের আকর্ষণের কেন্দ্র।
কামলা নেহরু হাসপাতালের কাছে অবস্থিত এই মন্দিরে পৌঁছনোও সহজ। গাড়ি বা ট্যাক্সিতে যেমন যাওয়া যায়, তেমনই পুণে জংশন স্টেশন থেকে অটো বা বাসে যাওয়াও সম্ভব। তবে শেষ অংশটা হেঁটেই যেতে হয়।