আধুনিক সাহিত্য ও মিডিয়ায় গণেশ এখন আরও বহুমাত্রিক। বিজ্ঞাপনে যিনি ‘পরীক্ষার দেবতা’, কার্টুনে তিনিই ‘ট্রাফিক সেফটির ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর’। ‘বিঘ্ননাশক’ গজাননকে বাঙালি পথে-প্রবাসে কাজে লাগাতে ভোলেনি।

ছবি: এআই নির্মিত
শেষ আপডেট: 27 August 2025 19:02
লোকায়ত পুরাণে তিনি শিব-পার্বতীর পুত্র। যুদ্ধ করেছেন অসুরদলনে। ‘বিঘ্নেশ্বর’ হিসেবে পূজিত। শক্তির প্রতীক, মঙ্গলদেবতা, জ্ঞানের অধিপতি। অথচ বাঙালির কল্পনায়, বিশেষত সাহিত্যে, সেই গণেশের উপস্থাপনা একেবারেই আলাদা। শৌর্যবীর্য নয়, বরং আদুরে, নাদুসনুদুস এক কিশোর। যেন পাশের বাড়ির ছেলেটি। বাড়ির লোক নাম রাখে ‘গণেশ’, ডাকে ‘গনশা’ বলে। দৈবী অভিসম্পাতের ভয় স্পর্শ করে না। অকুণ্ঠ অধিকারবোধে গণেশের মাহাত্ম্য বিগলিত হয় গনশার বাৎসল্যে!
তিনি শালপ্রাংশু মহাভুজ নন। নন প্রশস্ত বক্ষ, পেশিবহুল শরীরের অধিকারী। বরং, ঠিক উলটো। স্নেহচর্চিত, গোলগাল। সাবেকি বাঙালি মধ্যবিত্ত বাড়ির সবচেয়ে অলস ছেলেটির অবিকল প্রতিলিপি। তাঁকে দেবতা ‘জ্ঞান’ করে আরাধনাটুকু করা যায়, ‘অজ্ঞানত’ সে কোলের ছেলে।
আর এই চিন্তারই বাস্তব প্রতিফলন বাংলা সাহিত্যে। যেখানে গণেশ কোনও দিন মূল নায়ক নন, বরং পার্শ্বচরিত্র। ভাইয়ের আস্থাভাজন, বোনের রক্ষাকর্তা, একান্তভাবে মা-ন্যাওটা। তাই বলে একমেটে? সাদামাটা? মোটেও না। বাঙালির ‘গণেশ’, সাহিত্যের ‘গনশা’ আপন মহিমায় উজ্জ্বল!
লোকসাহিত্যে গণেশকে দেখা যায় মজার মেজাজে। চণ্ডীমঙ্গল কিংবা ধনপতির মঙ্গলকাব্যে গণেশের উপস্থিতি সামান্য হলেও নজরকাড়া। সেখানে তিনি মহাশক্তিধর, দুর্দমনীয় দেবতা নন। বরং, একান্ত খাদ্যরসিক চরিত্র। কেতকাদাস ক্ষেমানন্দের চণ্ডীমঙ্গলে দেখা যায়, শিব-পার্বতীর সন্তান গণেশের রসিকতা। তাঁর হাতির মাথা, নাদুসনুদুস দেহ, লাড্ডুর জন্য হাঁকপাঁক পাঠকের মুখে অলক্ষে হাসি আনে। ক্ষেমানন্দ লিখেছেন: ‘গজানন ভোজনরসে, দিবস যাপন করে হাসে।’ এই প্রবণতা মঙ্গলকাব্যের মূল রীতির সঙ্গে মানানসই। কারণ, সেখানে ঈশ্বর মানবজীবনের অঙ্গ হয়ে ওঠেন, বর্ণনায় থাকে লোকরস। এখানে গণেশ শৌর্যবান নয়, বরং একেবারে গৃহস্থালি দেবতা। কার্তিক যেখানে যুদ্ধের প্রতীক, গণেশ সেখানে গৃহশান্তি ও রসের দ্যোতক।
আধুনিক সাহিত্যে উনিশ শতকে গণেশ সেভাবে চর্চিত নন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর রচনায় সরাসরি গণেশকে অবতীর্ণ করেননি, কিন্তু ‘কমলাকান্তের দপ্তরে’ দেব-দেবীদের মানবীয় রূপ দেওয়ার যে-ধারা তিনি শুরু করেছিলেন, তাতে গণেশকে গার্হস্থ্য চরিত্র হিসেবে দেখার চোখ তৈরি হয়।
একইভাবে রবীন্দ্রনাথের কথাসাহিত্যেও গণেশ সরাসরি আলোচিত হননি। কিন্তু প্রবন্ধে, বিশেষত ভারতীয় উৎসব প্রসঙ্গে, গণেশপুজোর উল্লেখ আছে। তাঁর কাছে গণেশ লোক-ঐক্যের দেবতা। যে ‘উৎসবের মধ্য দিয়ে মানুষ একে অপরকে খুঁজে নেয়’, সেখানে গণেশচতুর্থী, রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে মিলনের উপলক্ষ, সামাজিক মিলনের সেতু। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসে দেবতা-কেন্দ্রিক আলোচনা কম। তবে গ্রামীণ উৎসব ও পুজোপ্রসঙ্গে গণেশপুজোর উল্লেখ পাওয়া যায়। শরৎচন্দ্রের দৃষ্টিতে গণেশ সমাজ-সংস্কৃতির অঙ্গ। ‘পল্লীসমাজ’ উপন্যাসে গ্রামীণ গণেশপূজার দৃশ্য আসে সাবলীল মেজাজে।
রসসাহিত্যে গণেশকে আঙিনায় প্রথম আনেন দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার। ‘ঠাকুমার ঝুলি’ আমবাঙালির শৈশবের প্রথম পাঠ। এখানে দেবতাদের বর্ণনায় ভয় নয়, বরং ভরপুর মায়া। গণেশও এর ব্যতিক্রম নন। গোলগাল শরীর, মিষ্টির প্রতি দুর্বলতা—সব মিলিয়ে শিশুদের বিশ্বস্ত সঙ্গী। উপেন্দ্রকিশোরের আঁকায় গণেশ স্নেহশীল, শান্ত, ঘরকুনো। বর্ণনা স্টিরিওটাইপ ভাঙতে পারেনি—‘গণেশ খাচ্ছে লাড্ডু, লাফাচ্ছে আনন্দে, হাতে কেবল মোদক!’—পরিচিত মূর্তির আদল স্পষ্ট।
মূর্তি ভাঙেন তাঁর সুপুত্র সুকুমার রায়। বাগধারায় ‘গোবরগণেশ’ মানে নিতান্তই অকর্মণ্য ব্যক্তি। কিন্তু ‘ভূতুড়ে খেলা’ ছড়ায় এই ধারণাকে বদলে সুকুমার আদরের সম্ভাষণে পরিণত করেন। জোছনা রাতে পান্তভূতের জ্যান্ত ছানা মায়ের কোলে আদর খাচ্ছে যখন, তখন জননীর আহ্লাদ আটখানা সুর হয়ে বেরিয়ে আসে: ‘ওরে আমার গোবরাগণেশ ময়দাঠাসা নাদুস রে,/ ছিঁচকাঁদুনে ফোকলা মানিক ফের যদি তুই কাঁদিস রে—’। আমাদের স্মরণে আসবে ছোটগল্প ‘আজব সাজা’র কথাও। গণেশচন্দ্র নামের স্কুলছাত্রটি ক্লাসে সবচেয়ে বোকারাম! যার কাণ্ডকারখানা বোঝাতে সুকুমার লেখেন: ‘গণেশের বুদ্ধি কিছু মোটা…’ হাবাগোবা গণেশ কীভাবে বিপদে পড়ে এবং বাকিদেরও বিপদে ফেলে, সেটা জানতে গল্পটা ঝটপট পড়ে ফেলা জরুরি!
লীলা মজুমদারের আখ্যানেও দেবতাদের নির্ভেজাল উপস্থাপনা। তাঁর লেখায় পৌরাণিক দেবতারা বাঙালি গৃহস্থজীবনের অঙ্গ। গণেশ খাবারপ্রিয়, নাদুসনুদুস, বোকাসোকা। কিন্তু সেই বোকামিই তাঁকে আপন করে তুলেছে। সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতায় গণেশ সরাসরি আসেনি, কিন্তু হাতি নিয়ে তাঁর কাব্যে যে-শিশুসুলভ মায়া, তা অবধারিতভাবে গণেশকে মনে করিয়ে দেয়। আধুনিক শিশুকবিতাতেও হাস্যরসের ‘টার্গেট পয়েন্ট’ গণেশের ভুঁড়ি, ভোজনরসিকতা, সরলতা (‘গণেশ দাদা, পেটটি নাদা, ক্ষীর খেয়েছে গাদাগাদা!’)। ‘পাগলা গণেশ’ নামে দুর্দান্ত ছোটগল্পেও এই বেখেয়ালি সত্তায় আলো ফেলেছেন লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। আধুনিক সাহিত্য ও মিডিয়ায় গণেশ এখন আরও বহুমাত্রিক। বিজ্ঞাপনে যিনি ‘পরীক্ষার দেবতা’, কার্টুনে তিনিই ‘ট্রাফিক সেফটির ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর’। ‘বিঘ্ননাশক’ গজাননকে বাঙালি পথে-প্রবাসে কাজে লাগাতে ভোলেনি।