আরোহী এখন বাড়ি ফিরেছে, ফিরেছে তার নিরাপদ আশ্রয়ে। মায়ের কোলে, বাবার স্নেহে। আর উর্দিতে ওঁরাই এখন আরোহীর কাছে সুপারম্যান।

শেষ আপডেট: 24 November 2025 23:42
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সোলাপুর (Solapur) থেকে মুম্বই (Mumbai) এসেছিলেন এক দম্পতি, সঙ্গে তাঁদের চার বছরের ছোট্ট মেয়ে আরোহী (girl child Arohi lost in Mumbai)। স্বামীর চিকিৎসার প্রয়োজনে দিনভর এদিক ওদিক ঘোরা, পরিশ্রান্ত, ক্লান্ত হয়ে চোখ বুজে এসেছিল মায়ের। কোলের আশ্রয়টাই মেয়ের জন্য নিরাপদ মনে হয়েছিলে মায়ের। কোলের সেই নিরাপদ আশ্রয় থেকেই কীভাবে যেন হঠাৎ উধাও হয়ে গিয়েছিল চার বছরের আরোহী (4 year old Arohi lost in Mumbai)। সেদিন তারিখটা ছিল মে মাসের ২০।
মুম্বইয়ের ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ টার্মিনাস (CSMT) থেকে হতভাগ্য বাবা-মায়ের সেই শুরু হয়েছিল এক অপেক্ষা। দীর্ঘ অপেক্ষা। এই থানা থেকে ওই থানা, ট্রেন, বস্তি, অনাথ আশ্রমের দোরে দোরে হন্যে হয়ে খুঁজে ফেরা। ঘুম নেই, খাওয়া নেই - শুধু দোমড়ানো-মোচড়ানো একটা ছবি সম্বল করে আশায় বুক বাঁধা যে আজ হয়তো মেয়ের কোনও খোঁজ মিলবে।
কিন্তু ওদিকে তখন মুম্বই থেকে বহু বহু কিলোমিটার দূরে বারাণসীর গলিতে বাবা-মাকে অবচেতনে খুঁজে বেড়াচ্ছে আরোহী। চার বছরের ছোট্ট আরোহীর ঠিক করে নিজের নামটাও মনে নেই, কারও ঠিক করে দেওয়া নাম, 'কাশী', নতুন পরিচয়ে দিন কাটছে তার।
জুনের কোনও এক দিন রেললাইনের ধারে আরোহীকে খুঁজে পান এক অনাথ আশ্রমের কিছু কর্মী। আরোহীকে নিয়ে গিয়ে তাঁদের কাছে আশ্রয় দেন, একটা নতুন নামও অবলম্বন হয় তার। কিন্তু ঘুমের মধ্যে অবচেতনে 'আই' (মারাঠি ভাষায় 'মা') বলে বিড়বিড় করে ওঠে সে। কিন্তু তার যে আর কোনও পরিচয় কারও কাছে নেই! রাতের আঁধারে নিঃশব্দেই মিলিয়ে যায় মা ডাকটুকু।
ততদিনে বেশ কিছু মাস কেটে গিয়েছে, যেন কোনও এক অগাধ ভরসা অবলম্বন করে মুম্বই পুলিশ খোঁজ চালিয়ে গিয়েছে আরোহীর। চারদিকে আরোহীর ছবি লাগিয়ে তন্নতন্ন করে খুঁজে চলেছে তারা। কিছু কিছু অফিসারের কাছে এতদিনে আরোহী যেন তাঁদের জীবনের এক অঙ্গ হয়ে উঠেছে। সকাল হবে খোঁজ শুরু হবে ছোট্ট শিশুটির, দিনের শেষে নিরাশাই আসবে হয়তো। কিন্তু হাল ছাড়া যাবে না। আরোহীর একটা ছোট্ট ছবিই যে তাঁদেরও সম্বল হয়ে উঠেছে ততদিনে। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে, দোরে দোরে ঘুরে বেড়ানো, কখনও সাংবাদিকদের কাছে সাহায্যের আবেদন।
On the night of May 20, 2025, a little girl in a faded pink frock fell asleep on her mother’s lap at Chhatrapati Shivaji Maharaj Terminus. Her parents, simple people from Solapur, had come to Mumbai for her father’s treatment. They were exhausted. Just for a moment, the mother… pic.twitter.com/Cc2u5gv1lU
— Mohini Maheshwari (@MohiniWealth) November 23, 2025
কিন্তু একদিন বোধ হয় এইভাবেই সত্যি শিকে ছিঁড়ল ভাগ্যের। ঠিক নভেম্বরের ১৩ তারিখ, বারাণসীর এক স্থানীয় রিপোর্টারের চোখে পড়ে আরোহীর 'নিখোঁজ' পোস্টার। তাঁর হঠাৎ মনে পড়ে এমন একটি বাচ্চাকে তো সে চেনে যে ঘুমের অবচেতনে তার আই-কে খুঁজে ফেরে। তারপর শুধু একটা ফোন কল। দূরত্ব কমে আসে মুম্বই থেকে বারাণসীর, আরোহীর সঙ্গে তার বাবা-মায়ের। আশা খুঁজে পান সেই পুলিশ কর্মীরাও, যাঁরা কোনও এক ক্ষীণ আশাকে সম্বল করে আরোহীর 'কেস ক্লোজ' করে দিতে পারেননি।
পরের সকাল। দূর শহরে বসে টেকনোলজি জুড়ে দেয় আরোহীর সঙ্গে তার হারিয়ে যাওয়া মা-বাবাকে। দীর্ঘ ছ'মাস বাদে মেয়েকে দেখে নিজেকে আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখা মুশকিল হয়ে ওঠে মায়ের পক্ষে। পরনে যে সেই গোলাপি ফ্রক, শেষবার মায়ের কোলে যখন শুয়েছিল আরোহী, এই জামাটাই তো পরেছিল। 'আরোহী... আমার মেয়ে...' গলা বুজে আসে বাবার।
নভেম্বরের ১৪ তারিখ, শিশু দিবসের দিন মুম্বই ফিরে আসে আরোহী, ছ'মাস বাদে! বিমানবন্দরে বেলুন নিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে পুলিশ কাকুরা, সঙ্গে তাঁরা নিয়ে এসেছেন এক নতুন ফ্রক, নীল রঙের। নেমেই সকলকে অবাক করে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে সামনে থাকা এক পুলিশ 'কাকুর' বুকে, সঙ্গে খিলখিলিয়ে হাসি। আরোহীর এই হাসিটাই শোনার জন্য অপেক্ষা করেছিল তার কত চেনা অচেনা 'পুলিশ কাকু', যাঁদের লোকে কঠিন, লৌহমানব বলে ভাবেন সাধারণ মানুষ।
এতদিন বাদে মেয়েকে কাছে পেয়ে বিশ্বাস হচ্ছে না তখনও বাবা-মায়ের, মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আশা এখন আর দূরের চিন্তাভাবনা নয়, সত্যিই মেয়েকে ছুঁয়ে দেখতে পাবেন তাঁরা।
আরোহী এখন বাড়ি ফিরেছে, ফিরেছে তার নিরাপদ আশ্রয়ে। মায়ের কোলে, বাবার স্নেহে। আর উর্দিতে ওঁরাই এখন আরোহীর কাছে সুপারম্যান।