লেসের কাজ করা গোলাপি রঙের সালওয়ার স্যুট পরা সুদূর মুম্বই থেকে আসা মুসলিম কিশোরী ১৬ বছরের অনাম্তা আহমেদ রাখি পরিয়ে দিল গুজরাতের বালসাডের হিন্দু ভাই শিবম মিস্ত্রির হাতে।

অনাম্তা ও শিবম।
শেষ আপডেট: 9 August 2025 14:25
দ্য ওয়াল ব্যুরো: লেসের কাজ করা গোলাপি রঙের সালওয়ার স্যুট পরা সুদূর মুম্বই থেকে আসা মুসলিম কিশোরী ১৬ বছরের অনাম্তা আহমেদ রাখি পরিয়ে দিল গুজরাতের বালসাডের হিন্দু ভাই শিবম মিস্ত্রির হাতে। রাখিবন্ধন অনুষ্ঠানটিও হয়েছে বালসাডের তিঠাল বিচ রোডে শিবমের বাড়িতে। শিবমের বয়স ১৪। না এটা কোনও দেখনদারি সাধারণ হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির রাখি উৎসবের ছবি নয়। এই রাখির প্রতিটি সুতোয় জড়িয়ে রয়েছে চোখের জলের রেশম।
যে ঘটনার কথা শুনলে দেশের প্রতিটি ভাইবোনের চোখে জল চুঁইয়ে পড়বে। শিবমের হাতে অনাম্তা যে হাত দিয়ে রাখি পরিয়ে দিয়েছে, সেই দুই হাতের একটি শিবমেরই বোনের দান করা হাত। ৯ বছর বয়সে শিবমের নিজের বোন রিয়ার ব্রেন ডেথ হয়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের সেই অঙ্গ প্রতিস্থাপনে একটি হাত ফিরে পেয়েছিল অনাম্তা।
সুরাতের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এই বিশেষ রাখিবন্ধনের আয়োজন করেছিল। সেই কারণে মুম্বইয়ের ১৮০ কিমি দূরের গোরেগাঁও থেকে নিয়ে আসা হয় অনাম্তা ও তার পরিবারকে। নিজের ভাইয়ের চোখের সামনেই সে রাখি পরিয়ে দেয় শিবমের হাতে। শিবমের বাবা ববি মিস্ত্রি চোখের জল ধরে না রাখতে পেরে বলেন, আমরা অনাম্তার হাত স্পর্শ করেছি। মনে হয়েছে এ তো আমাদের মেয়ে রিয়ারই হাত। রিয়া ছিল আমাদের গোটা পরিবারের একমাত্র মেয়ে। অনাম্তাকে ছুঁয়ে মনে হয়েছে, আমাদের মেয়ে এখনও বেঁচে রয়েছে, আমাদের সঙ্গেই রয়েছে।
গতবছর সেপ্টেম্বরে রিয়ার ব্রেন ডেথের পর তার অঙ্গ প্রতিস্থাপন হয়। সেটাই ছিল বিশ্বের সবথেকে কম বয়সে কাঁধ থেকে হাত পর্যন্ত অঙ্গ প্রতিস্থাপন। অনাম্তা পেয়েছিল রিয়ার হাত। রিয়াও ছিল বিশ্বের সবথেকে কম বয়সি অঙ্গদাতা। এর বছর তিনেক আগে অনাম্তা তার ডান হাত হারায়। ১১ কিলো ভোল্টের তারে হাত লেগে যায় তার। আলিগড়ে বাবার পৈতৃক বাড়িতে ছাদে খেলার সময় এই দুর্ঘটনা ঘটে।
সেই থেকে দুই পরিবারের মধ্যে ভালবাসার ডোরে এক নতুন ভ্রাতৃত্বের জন্ম হয়। শিবম একদিন যে হাতে রিয়ার বেঁধে দেওয়া রাখি পরত, এদিন সেই হাতেই রিয়ারূপী মুসলিম বোন অনাম্তার বেঁধে দেওয়া রাখি পরে। রিয়ার মা তৃষ্ণাও বলেন, যখন ওর হাত ধরেছিলাম, মনে হয়েছিল রিয়া আবার ফিরে এসেছে। মেয়ে হারানোর দুঃখ এক পলকে আনন্দে বদলে গিয়েছিল। চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি। অনাম্তাও এখন আমারই মেয়ে।
শিবম বলে, ওর হাতও এরকম ছিল, এমনকী গায়ের রঙও। অনাম্তা যখন রাখি পরাচ্ছিল আমারও মনে হয়েছে রিয়া এসে গিয়েছে। এ বছর এত দূর পেরিয়ে ও এসেছে, পরের বছর আমি যাব রাখি পরতে। বাবা আকিল ও মা দারাশার সঙ্গে শিবমদের বাড়িতে এসে শুধু তাকেই নয়, তার তুতো ভাইদের হাতেও রাখি পরাতে হয়েছে অনাম্তাকে।
অনাম্তা বলে, আমি কোনওদিন রিয়াকে দেখিনি। ওর মা-বাবা-দাদু যখন আমার হাত ধরলেন তখন এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল। অনাত্মাও বলে, আমি আগে কোনওদিন কাউকে রাখি পরাইনি। কী করতে হয়, কী অনুষ্ঠান তাও জানতাম না। কিন্তু রাখি পরানোর পর আমার মনে হয়েছে, এতে কিছু একটা শক্তি আছে। উল্লেখ্য, শিবমের বোন রিয়ার ব্রেন ডেথের পর তার কিডনি, লিভার, ফুসফুস, কর্নিয়া এবং বাঁহাত দান করা হয়। যাতে ৮টি জীবন নতুন করে বাঁচার রসদ ফিরে পেয়েছে।