পশ্চিমবঙ্গও এই পরিযায়ী অতিথিদের অন্যতম প্রিয় গন্তব্য। জেলায় জেলায় খাল-বিল, পুকুর, নদীর ধারে শীতের সকালগুলিতে দেখা মেলে নানান প্রজাতির রঙিন পাখির।

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 8 November 2025 15:46
শীত এলেই বদলে যায় প্রকৃতির রূপ। কুয়াশায় ঢেকে যায় ভোর, আর দিন ছোট হতে থাকে একটু একটু করে। এই কয়েকমাসে শুধু মানুষ নয়, বদলে যায় পাখিদের জীবনও। উত্তরের হিমশীতল দেশ ছেড়ে হাজার হাজার কিলোমিটার পেরিয়ে তারা আসে আমাদের দেশে (Migratory species adaptation)- রোদে গা এলিয়ে, শীতে আশ্রয় নিতে। শীতের এই পরিযায়ী পাখিরা (Migratory birds) যেন দূর দেশের দূত, নিয়ে আসে এক অন্যরকম প্রাণের ছোঁয়া।
পৃথিবীর উত্তর দিকের বরফঢাকা অঞ্চলে গ্রীষ্মে পাখিদের জন্য খাবার আর জলের জোগান সহজলভ্য হয়। কিন্তু শীত নামতেই বদলে যায় দৃশ্য- জল জমে বরফ হয়ে যায়, খাবারও ফুরিয়ে আসে। তখন বেঁচে থাকার তাগিদেই হাজার হাজার পাখি পাড়ি দেয় দক্ষিণের উষ্ণ দেশে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে ভারতের জলাভূমি হয়ে ওঠে তাদের শীতের ঠিকানা।
আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গও এই পরিযায়ী অতিথিদের অন্যতম প্রিয় গন্তব্য। জেলায় জেলায় খাল-বিল, পুকুর, নদীর ধারে শীতের সকালগুলিতে দেখা মেলে নানান প্রজাতির রঙিন পাখির। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা বলছে, দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গের জলাভূমিতে শীতকালে সবচেয়ে বেশি পরিযায়ী পাখি দেখা যায়, আর ডিসেম্বরের শেষে তাদের সংখ্যা পৌঁছয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে।
গত বছর উত্তরবঙ্গে শীত একটু আগেই শুরু হয়েছিল, আর তার ফলেই জলাভূমিগুলিতে দেখা মিলেছিল বহু পরিযায়ী পাখির। আকাশে উড়ে, জলের ধারে ভিড় জমিয়ে তারা যেন এনে দিয়েছিল শীতের আলাদা ছোঁয়া। তবে এই আগমন শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ায় না, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব পাখি জলাভূমির আশেপাশেই বিশ্রাম নেয়, খাবার সংগ্রহ করে, আর সময় এলে ফিরে যায় তাদের উত্তর দিকের জন্মভূমিতে- প্রজননের নতুন যাত্রায়।
এখনও ঠিক মতো শীত পড়েনি, অথচ দূরদেশের পাখিরা আসতে শুরু করেছে আমাদের জলাভূমিতে। কিন্তু গরমে হাঁসফাঁস এই আবহাওয়ায় তারা কি টিকতে পারবে (climate change effects)? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঋতুর এই গরম-ঠান্ডার গন্ডগোল প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করছে। সময়ের আগে পাখি আসা আর শীতের দেরি- দুটোই ইঙ্গিত দিচ্ছে, প্রকৃতি যেন কোথাও তাল হারাচ্ছে।
অন্যদিকে, প্রতি বছর আমাদের রাজ্যে অসংখ্য পরিযায়ী পাখি আসে, তবে এখন আর তাদের থাকার জায়গা আগের মতো নিরাপদ নেই। জলাভূমিগুলিতে মানুষের অবাধ চলাচল, বর্জ্য ফেলা আর অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণের ফলে তাদের আবাসস্থল ক্রমেই হুমকির মুখে। উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় একটি বিলের কথা, শীতকালে যেখানে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার পর্যন্ত পরিযায়ী পাখি জড়ো হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত সুরক্ষা না থাকায় সেই আশ্রয়স্থলও এখন বিপদের মুখে পড়ছে।
পরিযায়ী পাখিদের সুরক্ষায় আমরা প্রত্যেকে কিছু ছোট পদক্ষেপ নিতে পারি-
আবর্জনা ফেলা বন্ধ করুন: স্থানীয় জলাভূমি, বিল বা পাখির আশ্রয়স্থলে কখনও আবর্জনা বা প্লাস্টিক ফেলবেন না। এগুলি জলে দূষণের মাত্রা বাড়ায় এবং পরিযায়ী পাখিদের ক্ষতি করে।
ভ্রমণের সময় সচেতন থাকুন: পাখি দেখতে গেলে তাদের বিশ্রাম বা খাবারের জায়গায় অযথা হইচই করবেন না। দূর থেকে দেখুন, আওয়াজ বা ভিড় করবেন না।
শিশুদের আগ্রহ বাড়ান: বাচ্চাদের সঙ্গে পাখি দেখতে গেলে ছবি তুলুন, পাখিদের সম্পর্কে জানুন এবং তাদের পাখিদের 'বন্ধু’ হতে উৎসাহ দিন।
খবর রাখুন: সংবাদ বা প্রতিবেদন দেখে জেনে রাখুন কোন প্রজাতির পাখি কখন আসে, কোথায় বেশি দেখা যায়। এতে প্রকৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়বে এবং সংরক্ষণে সাহায্য হবে। প্রকৃতি আমাদের যতটা দেয়, ততটাই তার যত্ন নেওয়াও আমাদের দায়িত্ব।
শীত মানেই শুধু ঠান্ডা-হিমেল হাওয়া নয়, এই সময় পাখিদের দূরদেশ থেকে আসার যাত্রা শুরু হয়। তারা আসে, জলাভূমি ভরে ওঠে তাঁদের কোলাহল আর রঙে। আমরা যদি একটু সচেতন হই, এই সুন্দর দৃশ্য আর প্রকৃতির এই ভারসাম্য অনেক বছর ধরে রক্ষা করা যাবে।