পথকুকুররা তাঁর ভালবাসা, ঘর, প্রিয়জন, আত্মীয়-সব। তাদের খাওয়াবেন বলে প্রথমে নিজের অর্থ দিয়ে মাংস-ভাত বিলি শুরু করেন। এক এক করে বাড়তে বাড়তে কুকুরদের সংখ্যা ৬০০ ছাড়ায়। তারপর আর কী। রোলার কোস্টার রাইড শুরু।
.jpeg.webp)
নীলাঞ্জনা বিশ্বাস
শেষ আপডেট: 8 November 2025 15:26
এই পৃথিবী আমার তোমার, এখানে আমাদের অধিকার সমান। এই মাটি, আকাশ, বাতাস একজন মানুষের যতোটা, পশু-পাখি, কীটপতঙ্গ বা গাছপালারও ঠিক ততোটাই। এই বিশ্বাস একাংশের মনে থাকলেও, বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন, উৎকৃষ্ট জীব হিসেবে শাসন শুধু তারই, সবটাই তার অধীনে- নিয়ন্ত্রণে। গাছপালা কেটে, জঙ্গল সাফ করে, পশু-পাখি মেরে বা নদীর গতিপথ ঘুরিয়ে দিয়ে তা প্রমাণও করে দেয়।
সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয় 'স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল-জনবহুল যেকোনও এলাকা থেকে পথকুকুরদের সরিয়ে দিতে হবে। রাখতে হবে আশ্রয়স্থলে। যাতে মানুষজনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।' পশুপ্রেমীরা বলছেন, এই নির্দেশও উপরের বলা কথাগুলোর বাস্তব রূপ দেখায়। তাহলে যে ভূমিতে তাদের জন্ম, যে ভূমি আগলে মানুষের নিরাপত্তা তারা নিশ্চিত করছে দিনে-রাতে, তাদের সরিয়ে দেওয়া হোক! বন্দি করে দেওয়া হোক চার দেওয়ালে। আসলে ওরা তো কথা বলতে পারে না, প্রতিবাদ করবে কেমন করে?
কথা না বলতে পারা এই প্রাণীগুলোর জীবনে দূত হিসেবে আসেন বাংলার নীলাঞ্জনা বিশ্বাসের মতো মানুষজন। যাঁরা এদের হয়ে লড়াই করেন, কথা বলেন। এদের খেতে দেন, ভালবাসেন। ওরা এইটুকুই তো চায়। নিজে রান্না করে খাওয়া তো ওদের পক্ষে সম্ভব না ফলে ওরা নির্ভরশীল, আর শুধুমাত্র নির্ভরশীল বলেই হয়তো ছুড়ে ফেলে দেওয়া যায়, প্যাকেটে ভরে ছেড়ে আসা যায় বা প্রয়োজন মিটলে প্রাণের তোয়াক্কা না করে দূরে সরিয়েও দেওয়া যায়।
নীলাঞ্জনা বিশ্বাসরা সেটা করেন না। কথা শুনতে না পারলেও চাউনি দেখে বুঝে যান, ওদের কী চাই। কোন সময়ে তাঁকে বা তাঁদের মতো মানুষজনকে এই অবলাগুলোর চাই। তাই পথকুকুরদের মাংস-ভাত খাওয়ানোর জন্য নিজের সর্বস্ব দিয়েছেন। টাকা পয়সার তোয়াক্কা করেননি। সাহায্য না পেয়ে তিন লাখ টাকার গয়না বিক্রি করেছেন।
শুনবেন এই সাহসী মহিলার কথা? পথকুকুররা তাঁর ভালবাসা, ঘর, প্রিয়জন, আত্মীয়-সব। তাদের খাওয়াবেন বলে প্রথমে নিজের অর্থ দিয়ে মাংস-ভাত বিলি শুরু করেন। এক এক করে বাড়তে বাড়তে কুকুরদের সংখ্যা ৬০০ ছাড়ায়। নিজের উপার্জনের অর্থ দিয়ে সেই চাহিদা বেশ কিছুদিন চললেও পরে চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। তা বলে খাওয়া হবে না ওদের! এই ভেবে ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নেন।
৪.৫ লাখ টাকা আসে অ্যাকাউন্টে। ব্যাস একগাল হাসি নিয়ে কাজ চালিয়ে যান। কিন্তু টাকা তো ফুরোবে। আর শুধু যে ৬০০ কল্যাণীর কুকুরকে খাওয়াতেন রোজ তা নয়, শুশ্রূষাও করতেন। আজ এর পা কেটে গেলে, কাল ওর ভ্যাকসিন, পরশু আরেকটার কৃমির ওষুধ। নাভিশ্বাস উঠছিল তাঁর। বিক্রি করেন তিন লাখের গয়না। একটুও মায়া করেননি সেসবের, মায়া ছিল ওই চোখগুলোর প্রতি।
কুকুরের পাশাপাশি রাস্তাঘাটে পড়ে থাকা, খেতে না পাওয়া মানুষজনেরও সেবা করা শুরু হয়। কিন্তু একটা সময় সমস্ত পুঁজি শেষ হয়। সাহায্য চান, চেষ্টা করেন ফান্ড তোলার, হয়নি। ৬০০ থেকে কুকুরের সংখ্যা কমাতে শুরু করেন। মন কি মানে? কোনও উপায় না পেয়ে কয়েকটিকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। এনিয়ে নীলাঞ্জনার বক্তব্য, 'কল্যাণীর ৬০০ পথকুকুরকে রোজ মাংস ভাত খাওয়াতাম। ওদের জন্য আলাদা রান্নাঘর এমনকি বাসনপত্রও ছিল। শুধু খাওয়াতাম এমন না, টিকা দেওয়া, ট্রিটমেন্টেরও ব্যবস্থা করতাম নিজেই। কিন্তু প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা খরচ করা, একটা সময় আর পারছিলাম না। একার পক্ষে এটা জোগার করা খানিকটা দুঃসাধ্যের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।'
৬০০ কুকুরের খাবার ব্যবস্থা এতদিনে হয়ে গেছে নিশ্চয়ই, শুধু প্রলেপ পড়েনি নীলাঞ্জনার মনে। তাঁর আজও মনে হয়, 'আরও একবার ঝাঁপিয়ে পড়ি ওদের জন্য। ঠিক যেভাবে রুগ্ন মানুষজনের জন্য ঝাঁপাই, পারি না।'