সুশি-রামেনের শহর ফুকুওকার (Fukuoka) এক শান্ত গলি থেকে তার মাঝেই ভেসে আসে সরষে মাছ, শুক্তো আর গরম ভাতের ঘ্রাণ (Japanese couple bengali restaurant)।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 10 November 2025 13:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ম্যাপ বলছে, বাংলার মাটি থেকে হাজার হাজার মাইল দূরের দেশ জাপান। কিন্তু সেখানে বসত করে আরও এক বাংলা। সুশি-রামেনের শহর ফুকুওকার (Fukuoka) এক শান্ত গলি থেকে তার মাঝেই ভেসে আসে সরষে মাছ, শুক্তো আর গরম ভাতের ঘ্রাণ (Japanese couple bengali restaurant)।
সেখানে কলাপাতায় পাত পেড়ে পরিবেশন করা হয় একেবারে খাঁটি বাঙালি খাবার। চাইলে মোঘলাই থেকে দক্ষিণ ভারতীয়, ভারতের যে কোনও খাবারও পেতেই পারেন, তবে এখানের মতো বাঙালি খাবার কোথাও মিলবে না দূরদেশে। ভারতের বিশেষ সবজিও বাড়ির বাগান থেকেই রান্নাঘরে আসে। ‘ইন্ডিয়ান স্পাইস ফ্যাক্টরি’ (Indian Spice Factory) নামে এক রেস্তরাঁ চালান এক জাপানি দম্পতি কোজি ও সচিকো নাকায়ামা (Japanese couple Koji and Sachiko Nakayama)।

২০১৮ সালে শুরু হওয়া এই রেস্তরাঁ আসলে কলকাতার উদ্দেশে লেখা কোজি ও সচিকোর এক প্রেমপত্র। সেই শহরকে লেখা যা তাঁদের শুধু স্মৃতি দেয়নি, দিয়েছে বাংলার প্রতি এক গভীর টান। কলকাতার উষ্ণতা, এখানকার মানুষ আর রান্নার জাদুতে আজও তাঁরা বুঁদ। এখন তাঁরা দায়িত্ব নিয়ে জাপানিদের জন্য পুনর্নির্মাণ করছেন বাংলার রন্ধন ঐতিহ্য।
২০১৩ সালে, অভিজ্ঞ জাপানি শেফ কোজি কলকাতায় এক জাপানি রেস্তরাঁ তৈরিতে সাহায্য করতে এসেছিলেন। কিন্তু সেই কাজ ধীরে ধীরে পরিণত হয় অনুপ্রেরণায়। একদিন নিজের রেস্তরাঁ হবে জাপানে, আর স্বপ্নের পালে হাওয়া দেবে খাঁটি বাঙালিয়ানার স্বাদ।
কলকাতায় এসে সরষে মাছ একবার খেয়েই বুঝে গিয়েছিলেন এই জীবনের মতো বাঁধা পড়ে গিয়েছেন বাংলার প্রেমে, তার খাবারের স্বাদের মুগ্ধতা থেকে আর বেরনো হবে না কোনওদিন। বাংলার রান্নার যে কৌশল - মাছ, মাংস, সবজির ভারসাম্য, নানারকম সুগন্ধি মশলার ব্যবহার - সব মিলিয়ে তিনি জাপানি রান্নার সঙ্গে এক অদ্ভুত সাদৃশ্য খুঁজে পান। ভাত-মাছকে ঘিরে তৈরি এই আপন করে নেওয়ার সংস্কৃতি তাঁকে ছুঁয়ে যায় গভীরভাবে।
ব্যাস, ২০১৮ সালেই ফুকুওকায় জন্ম নিল বাংলার রান্নাঘর। কোজি ও তাঁর স্ত্রী সচিকো মিলে খুলে ফেললেন তাঁদের স্বপ্নের রেস্তরাঁ - ফুকুওকার ‘ইন্ডিয়ান স্পাইস ফ্যাক্টরি’। তাঁদের লক্ষ্য ছিল একটাই, জাপানিদের কাছে বাংলার আসল স্বাদ তুলে ধরা। সেই জন্য তাঁরা স্থানীয়ভাবে ফলাতে শুরু করেন ভারতের বিশেষ সবজিও।
একসময় স্প্যানিশ শেফ হিসেবে কাজ করা সচিকো এখন নিখুঁত বাঙালি রাঁধুনি। রোজ নিপুণ পটুতায় শাড়ি সামলে কাজ করেন রেস্তরাঁয়, খাবার পরিবেশন থেকে শুরু করে অতিথিদের দেখাশোনা, জাপানের আতিথেয়তার সঙ্গে মিশে যায় বাংলার স্বাদ।

সবচেয়ে কঠিন বাঙালি রান্না কী ছিল? সচিকোর কথায়, মোচার ঘণ্ট - জাপানে যা তৈরি করা বেশ দুষ্কর।
সোনামুগ ডাল, করলা ভাজা, পুঁই শাক, বিরিয়ানি, কষা মাংস - সবই পাওয়া যায় তাঁদের রেস্তরাঁয়। শুধু বাংলা নয়, দক্ষিণ ভারতের মুরুক্কু আর উত্তর ভারতের ফিরনিও তাঁদের মেনুতে সমান আদরে বিরাজমান।
রেস্তরাঁর সাজসজ্জাতেও একেবারে যেন বাংলার মিশেল - মাটির হাঁড়ি, রাধাকৃষ্ণের মূর্তি, আর নিঃশব্দে বেজে চলে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর।

রান্নার পাশাপাশি এই দম্পতি শিখে ফেলেছেন সেতার ও তবলা বাজানোও। তাঁদের ইনস্টাগ্রাম পেজে দেখা যায়, কীভাবে তাঁরা শুরু করেছিলেন শেখা, তারপর পরে অন্যদের শেখানোও শুরু আস্তে আস্তে। ওয়ার্কশপ চলে সেখানে বিশেষ।

জাপানিদের কাছে 'ভারতীয়' খাবার মানেই খুব ঝাল ঝাল ব্যাপার স্যাপার। কিন্তু বাংলার সূক্ষ্ম, ভারসাম্যপূর্ণ স্বাদ তুলে ধরে জাপানের মানুষের সেই ধারণা বদলে দিতে পেরেছেন কোজি ও তাঁর স্ত্রী সচিকো।
অন্যদিকে, কলকাতা ও বাংলাদেশ থেকে যাঁরা জাপানে আসেন, একবার হলেও ঢুঁ মেরে যান ‘ইন্ডিয়ান স্পাইস ফ্যাক্টরি’তে। দেশের গন্ধে, স্মৃতির টানে চোখে জল এসে যায় তাঁদের।