সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত লোকাল স্যাক আর বিচ স্যাকগুলি গিজগিজ করত। কর্মীরা অর্ডার সার্ভ করতে করতেই ক্লান্ত হয়ে পড়তেন। রাত নামলেই শুরু হত ডিজের তালে তালে নাচ। ভেসে আসত নানা ভিনদেশি গানের সুর।

ছবি - দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 7 January 2026 18:30
এক সময় গোয়ার (Goa) ক্যাভেলোসিম বিচ (Cavelossim Beach) মানেই ছিল এক টুকরো বিদেশ। বালির ওপর পা ফেললেই মনে হত, ভারত থেকে বহু দূরে কোথাও এসে পড়েছেন। চারপাশে রাশিয়ান (Russian), ইউক্রেনিয়ান (Ukrainian), ব্রিটিশ পর্যটকের ভিড় - তাঁদের হাসি, কথাবার্তা, গানের সুরে তৈরি হত এক আলাদা আবহ। কোনও ভারতীয় (Indian Tourist) হঠাৎ সেখানে গেলে খানিকটা অবাকই হতেন। নিজের দেশেই যেন পরদেশি হয়ে পড়ার অনুভূতি। ক্যাভেলোসিমের সেই ভাইব ছিল ঠিক এমনই।
সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত লোকাল স্যাক আর বিচ স্যাকগুলি (Goa Beach Shacks) গিজগিজ করত। কর্মীরা অর্ডার সার্ভ করতে করতেই ক্লান্ত হয়ে পড়তেন। রাত নামলেই শুরু হত ডিজের তালে তালে নাচ। ভেসে আসত নানা ভিনদেশি গানের সুর। আলো-আঁধারিতে মিশে যেত নানা ভাষার হাসি, গল্প, মদ আর আনন্দ। ব্যবসা চলত রমরমিয়ে। ক্যাভেলোসিম তখন শুধু একটা বিচ নয়, যেন এক আন্তর্জাতিক মিলনক্ষেত্র।
কিন্তু সময় বদলায়। বদলায় মানুষের আসা-যাওয়া, বদলায় সম্পর্কের মানচিত্রও। করোনা পরবর্তী (Covid-19) সময় থেকে ক্যাভেলোসিমের ছবিটা ধীরে ধীরে ফিকে হতে শুরু করে। আর তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে গোটা দৃশ্যপটটাই বদলে দেয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ (Russia-Ukraine War)।
এক সময় এই বিচে একই টেবিলে বসে উদযাপন করতেন রাশিয়া আর ইউক্রেনের নাগরিকরা। খানা-পিনা, নাচ-গান সবই হত একসঙ্গে। কে কোন দেশের, সেই পরিচয় তখন তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। সকলেই থাকতেন ছুটির আমেজে, দেদার পার্টি মুডে। কিন্তু দুই দেশের মধ্যে সংঘাত (Russia-Ukraine War) শুরু হওয়ার পর সেই ছবিটা আর টেকেনি। ধীরে ধীরে ক্যাভেলোসিম (Cavelossim) থেকে কমতে থাকে ইউক্রেনিয় পর্যটকের সংখ্যা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাস, ক্রিসমাসের সময়েও এই বিচে আর চোখে পড়েনি কোনও ইউক্রেনিয়ান।

একটু রাত হতেই ফাঁকা ক্যাভেলোসিম বিচ - নিজস্ব ছবি
যুদ্ধের কারণে বদলে গেছিল মানুষের মনোভাবও। বিচের এক স্যাকের কর্মীর কথায় - যুদ্ধ শুরুর পরেও দুই দেশের নাগরিকরা আসতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে রাশিয়ানদের আচরণ বদলাতে শুরু করে। এক টেবিলে বসা তো দূরের কথা, পাশের টেবিলে ইউক্রেনিয়দের দেখলেই একজোট হয়ে অন্য রাশিয়ানরা হুমকি দিতেন, শাসাতেন। কোনও কোনও সময়ে পরিস্থিতি হাতাহাতি পর্যন্ত গড়িয়েছে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ইউক্রেনিয়রা কথা না বাড়িয়ে নিজের কাজ সেরে চুপচাপ সরে যেতেন। তারপর এক সময় তাঁরা আসাই বন্ধ করে দেন। শুধু ক্যাভেলোসিম নয়, গোয়াকেই যেন তাঁরা ধীরে ধীরে ছেড়ে চলে গেছেন। এখন এই বিচে বিদেশি পর্যটক বলতে বেশিরভাগই রাশিয়ান।

রাতের গোয়ার বিচে হাতে গোনা লোক - নিজস্ব ছবি
গত ডিসেম্বর মাসে গোয়া গিয়েছিলাম। এক রাতে ক্যাভেলোসিম বিচে (Cavelossim Beach) বসে এই কথাগুলো শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল - এই দুনিয়া সত্যিই কত বিচিত্র। দূরের কোনও দেশের ক্ষমতা দখলের লালসা, যুদ্ধের আগুন এসে পড়ে কত দূরের এক শান্ত সমুদ্রতটে। শুধু দেশ ভাঙে না, ভেঙে যায় কত পরিচয়, কত সহাবস্থান। ক্যাভেলোসিমের বালিতে দাঁড়িয়ে তখন মনে হচ্ছিল, যুদ্ধের ছায়া কেবল মানচিত্রেই পড়ে না, তা এসে পড়ে মানুষের অবকাশের মুহূর্তে, আনন্দের ঠিকানাতেও।