আমরা সবাই দিনের শেষে ফিরি নিজের বিছানায়। একটা চেনা নরম আরাম, পরিচিত উষ্ণতায়। কিন্তু কেউ যদি সেই আরাম ছেড়ে, গাছের ডালে বাসা বাঁধে, তাও আবার নিজের ইচ্ছেতে, প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে?

জুলিয়া বাটারফ্লাই হিল
শেষ আপডেট: 23 October 2025 17:09
তিনি যদি কখনও রূপালি পর্দায় আসতেন, তাহলে হয়তো অনেক হলিউড (Hollywood) অভিনেত্রীই তাঁর কাছে হার মানতেন। কিন্তু জুলিয়া বাটারফ্লাই হিলের (Julia Butterfly Hill) জীবনের আলো ঝলমল জগৎ থেকে দূরে, বহু দূরে। তবু তার কাছেই হার মানতে হয়েছে সমাজকে, গোটা পৃথিবীকে। কারণ, জুলিয়া দেখিয়ে দিয়েছেন - ইচ্ছে যদি অটুট থাকে, তবে সবচেয়ে উঁচু বাধাও পেরোনো যায়।
আমরা সবাই দিনের শেষে ফিরি নিজের বিছানায়। একটা চেনা নরম আরাম, পরিচিত উষ্ণতায়। কিন্তু কেউ যদি সেই আরাম ছেড়ে, গাছের ডালে বাসা বাঁধে, তাও আবার নিজের ইচ্ছেতে, প্রতিবাদের (Protest) ভাষা হিসেবে? গল্পটা অবিশ্বাস্য শোনালেও, তা একেবারেই বাস্তব। সেই বাস্তবের নায়িকা, জুলিয়া বাটারফ্লাই হিল।

ক্যালিফর্নিয়ার (California) রেডউড বন (Redwood Forest) যেন এক বিশাল জাদুঘর - যেখানে হাজার বছরের পুরনো লালচে-বাদামি গাছগুলো আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। সূর্যের আলো গায়ে মেখে তারা যেন সময়ের ইতিহাস বয়ে বেড়ায়। এই বন হয়তো আজ আর টিকে থাকত না, যদি না থাকতেন জুলিয়া নামের এক তরুণী, যিনি গাছের সঙ্গে নিজের প্রাণ জুড়ে দিয়েছিলেন।
মাত্র ২৩ বছর বয়সে জুলিয়া এক রেডউড গাছে উঠে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তিনি আর নামবেন না। সেই গাছটির নাম ছিল 'লুনা' (Luna)। তাঁর এই সিদ্ধান্ত ছিল বনভূমি রক্ষার এক দুঃসাহসী পদক্ষেপ, কাঠ ব্যবসায়ীদের হাত থেকে প্রাচীন গাছগুলোকে বাঁচানোর জন্য।

‘প্যাসিফিক লাম্বার’ নামে এক কোম্পানি ঘোষণা করেছিল, তারা এই বনাঞ্চলের বিশাল অংশ কেটে ফেলবে। প্রতিটি গাছের দাম ধরা হয়েছিল প্রায় দেড় লক্ষ ডলার, আজকের হিসেবে তিন লক্ষেরও বেশি। কিন্তু জুলিয়ার চোখে গাছ মানে টাকা নয়, প্রাণ। আর সেই প্রাণের জন্যই শুরু হয়েছিল তাঁর সংগ্রাম।
ছোটবেলায় জুলিয়া ছিলেন যাযাবর (Hippies) পরিবারের মেয়ে। বাবার কাজের সূত্রে সারা আমেরিকা ঘুরে বেড়িয়েছেন। প্রকৃতিকে তাই তিনি চিনেছিলেন কাছ থেকে, কিন্তু ভালবেসেছিলেন এক দুর্ঘটনার পর।
তিনি যে প্রকৃতির নিজের মেয়ে সেটার ইঙ্গিত ৭ বছর বয়সেই পেয়েছিলেন জুলিয়া। তাঁর পোশাকি নাম জুলিয়া লোরেন হিল। কিন্তু ‘লোরেন’কে সরিয়ে তিনি ‘বাটারফ্লাই’ বসিয়েছেন নিজেই। কারণ - প্রজাপতির সঙ্গে তাঁর অদ্ভুত সম্পর্ক।
সাত বছর বয়সে মা-বাবার সঙ্গে এক দিনের একটি হাইকিং সফরে (Hiking) গিয়েছিলেন জুলিয়া। সে সময় তাঁর হাতের আঙুলে একটি প্রজাপতি (Butterfly) বসেছিল। গোটা সফরে নাকি সেটি জায়গা থেকেই নড়েনি। এই অবাক করা ঘটনার পরই জুলিয়া নিজের নামের মধ্যে পতঙ্গটিকে পুরোপুরি জায়গা দিয়ে দেন।
১৯৯৬ সালের এক রাতে মত্ত বন্ধুর হয়ে গাড়ি চালাতে গিয়ে ভয়ানক দুর্ঘটনায় (Car Accident) পড়েন তিনি। স্টিয়ারিং হুইল ঢুকে গিয়েছিল মাথায়। টানা দশ মাস কথা বলতে বা হাঁটতে পারেননি। সেই সময়েই জীবনের অর্থ নিয়ে ভাবতে শুরু করেন তিনি। বুঝেছিলেন, বাঁচা মানেই কেবল নিজের জন্য নয় - পৃথিবীর জন্যও কিছু করা।
পরের বছর বন্ধুর সঙ্গে এক সফরে গিয়ে জুলিয়া প্রথম দেখেন রেডউড বন (Redwood Forest)। সেই বিশাল গাছগুলির সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর চোখ ভরে গিয়েছিল জল। কিছুদিন পর ‘আর্থ ফার্স্ট!’ নামে একটি পরিবেশ আন্দোলনে যোগ দেন তিনি। তারপরই শুরু হয় এক অবিশ্বাস্য অধ্যায়— 'লুনা'।
গাছটির সেই অর্থে কোনও নাম না থাকলেও জুলিয়া গাছে চড়ার সময় রাতের আকাশে চাঁদ উঠছিল। নিজের প্রতিবাদকে স্মরণীয় করে রাখতেই তার নাম দেন 'লুনা' অর্থাৎ লাতিন ভাষায় চাঁদ।

১৮০ ফুট উঁচু এই গাছে একটি ছোট কাঠের পাটাতনে বাসা বাঁধেন জুলিয়া। ছ’ফুট বাই চার ফুট জায়গা, মাথার ওপর ত্রিপল। না জল, না বিদ্যুৎ - কেবল অসীম আকাশ, বাতাস, আর কিছু কাঠবিড়ালির সঙ্গ। বৃষ্টির দিনে ঝড় বইত ঘণ্টায় সত্তর মাইল বেগে। আশ্রয়ের ত্রিপল উড়ে যেত, কিন্তু তিনি নড়তেন না। খাবার আর চিঠি আসত সপ্তাহে দু’বার, সহকর্মীদের হাত ধরে।
এদিকে গাছের নীচে চলছিল অন্য যুদ্ধ। কোম্পানি হেলিকপ্টার উড়িয়ে ভয় দেখাত, দড়ি কেটে দিত, পাহারায় রাখত প্রহরী। কিন্তু জুলিয়া ছিলেন অটল। দিন গড়িয়ে মাস, মাস পেরিয়ে বছর। পৃথিবীর সংবাদমাধ্যমে তাঁর গল্প ছড়িয়ে পড়ল আগুনের মতো। তাঁকে ঘিরে তৈরি হল আশা, প্রতিরোধ, আর এক নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন।
৭৩৮ দিন পর, অর্থাৎ ১৯৯৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর ইতিহাস তৈরি হল। চুক্তি হয়, লুনা এবং তার আশেপাশের ২০০ ফুটের মধ্যে থাকা সব গাছকে চিরস্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা হবে। তারপরই গাছ থেকে নেমে আসেন জুলিয়া। শুধু নামেননি, দীর্ঘ এক প্রতিবাদী যাত্রার পর হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেছিলেন। পরে তিনি গড়ে তোলেন ‘সার্কল অফ লাইফ’ নামে এক সংস্থা, যা শেখায় প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে বাঁচার পথ।
২০২৪ সালে, 'লুনা'র ২৫ তম বর্ষপূর্তিতে আবার সেই গাছের নীচে ফিরে গিয়েছিলেন জুলিয়া, যা তাঁর অতীতের সেই অবিস্মরণীয় ২ বছর আবার চোখের সামনে ফিরিয়ে দিয়েছিল।