গত কয়েক বছরে ডাউহিলে বেড়াতে গিয়ে রহস্যজনকভাবে মারা গেছেন বেশ কয়েকজন। কখনও কোনও হোমস্টেতে, কখনও পাহাড়ি হোটেলে।

গ্রাফিক্স - দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 22 October 2025 20:03
একদিকে পাহাড়ি অর্কিডের মিষ্টি গন্ধ, অন্যদিকে ঘন পাইনবনের ভিতর ঘোর অন্ধকার — কার্শিয়াংয়ের (Kurseong) ডাউহিল (Dow Hill) যেন প্রকৃতি আর রহস্যের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন। দার্জিলিং (Darjeeling) থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরের এই ছোট্ট পাহাড়ি এলাকা যেন নিস্তব্ধতারও এক অনন্য ঠিকানা। যারা গেছেন, তাঁরা শুধু পাহাড়ের আদর নয়, সঙ্গে করে ফিরেছেন এক অচেনা অনুভূতিও — যা ভয় নয়, আবার পুরোপুরি কল্পনাও নয়।
ডাউহিল (Dow Hill) দেখতে সাধারণ পাহাড়ি শহরের মতোই। কিন্তু এর বুকজুড়ে লুকিয়ে আছে শতবর্ষের ইতিহাস আর কিছু অসমাপ্ত গল্প। শতবর্ষের ভিক্টোরিয়া বয়েজ হাই স্কুল (Victoria Boys), ‘ডেথ রোড’ (Death Road), পরিত্যক্ত চার্চ (Church) - সব মিলিয়ে জায়গাটা যেন নিজের মতো করে লিখে চলেছে এক ভৌতিক উপন্যাস।
ডাউহিলের সকাল মানেই কুয়াশার চাদরে ঢাকা বন। বাতাসে ঠান্ডার সঙ্গে মেশে এক অদ্ভুত গন্ধ। স্থানীয়রা বলেন, কখনও কখনও মনে হয়, যেন কেউ গাছের ফাঁক থেকে তাকিয়ে আছে। কেউ সেই চোখ দেখেনি, কিন্তু অনুভব করেছে। কেউ কেউ আবার দাবি করে বলেছেন, মুণ্ডহীন এক কিশোরকে পাহাড়ি পথে হাঁটতে দেখা গেছে, পাশাপাশি কেউ অচেনা এক বৃদ্ধার হাতছানিও টের পেয়েছেন।
ভয়, সন্দেহ আর কৌতূহলের এই মিশ্রণই ডাউহিলকে করেছে ভারতের অন্যতম রহস্যময় স্থান। পর্যটকদের মধ্যে কেউ বলেছেন - পাইন গাছের মধ্যে দিয়ে বন্ধুর রুদ্ধশ্বাস দৌড়ের কথা। সে নাকি তাঁর মৃত বাবাকে দেখতে পেয়েছিল; কেউ আবার জানিয়েছেন, চার্চের সামনে দাঁড়িয়ে সময়ের ধারণা হারিয়ে ফেলেছিলেন।
লোকমুখে শোনা যায়, ভিক্টোরিয়া বয়েজ স্কুলের কয়েকটি ঘর আজও বন্ধ। কেউ জানে না, কেন। স্কুল কর্তৃপক্ষ অবশ্য এসব মানতে চান না। তাঁদের দাবি, “এ সব ভয়ের গল্প ছড়িয়ে পড়ায় স্কুলের নামটাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”
তবে চার্চটি নিয়েই আলোচনা সবচেয়ে বেশি। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, বহু বছর কেউ সেখানে পা রাখেনি। কাঠ দিয়ে বন্ধ সমস্ত জানলা, দেওয়ালে শ্যাওলা, আর আশ্চর্যের বিষয় —চার্চের মাথায় নেই কোনও ক্রস। কেউ জানে না, কেন। কী এমন ঘটেছিল, যে প্রার্থনার ঘরকেও নীরব করে দেওয়া হল, সে উত্তর আজও মেলেনি।
গত কয়েক বছরে ডাউহিলে বেড়াতে গিয়ে রহস্যজনকভাবে মারা গেছেন বেশ কয়েকজন। কখনও কোনও হোমস্টেতে, কখনও পাহাড়ি হোটেলে। পুলিশের ব্যাখ্যা প্রতিবারই স্পষ্ট, “অসুস্থতা বা দুর্ঘটনা।” কিন্তু স্থানীয়দের বিশ্বাস, ডাউহিলের অদ্ভুত শক্তি মাঝে মাঝে নিজের উপস্থিতি জানান দেয়। তবে আশ্চর্য, মৃত্যুভয়েও কমেনি পর্যটকের ভিড়। বরং বেড়েছে। ভয়ই যেন এখানে এক নতুন আকর্ষণ।
স্থানীয় সেনা জওয়ানরাও বলেন, রাত আটটার পর তাঁরা বিশেষ প্রয়োজন না থাকলে টহলদারিতে যান না। কেউ কেউ নাকি ফিরে এসে বলেছেন, “ওই পথে কেউ হাঁটছিল, কিন্তু কাছে যেতেই উধাও হয়ে গেল।”
ডাউহিলের সবচেয়ে বিখ্যাত রাস্তাটির নাম ‘ডেথ রোড’। নামটিই যেন নিজের কথা বলে দেয়। দিনে শান্ত, রাতে অচেনা। কেউ বলেন, “ওই পথের বাতাসের গতি আলাদা। মনে হয় কেউ পাশে হাঁটছে।”
ভূতের গল্পে বিশ্বাস না থাকলেও, কৌতূহলকে আটকানো যায় না। তাই আজ ডাউহিল তার অন্ধকারকে ভয় নয়, থিম বানিয়ে ফেলেছে। ডেথ রোডের চারপাশে তৈরি হয়েছে নতুন রাস্তা, আলো বসানো হয়েছে, এমনকী স্থানীয়রা ভয় নয়, রহস্যকেই পর্যটনের আকর্ষণ হিসেবে তুলে ধরছেন।
ডাউহিলের বাতাসে আজও মিশে আছে সেই চেনা গন্ধ, কুয়াশা, পাইন আর একটুখানি ভয়। হয়তো ভূত নেই, কিন্তু রহস্য আছে। আর সেই রহস্যই ডাকে, বারবার।