উচ্চশিক্ষার জন্য গেছিলেন আমেরিকায়, এভিয়েশন নিয়ে পড়াশোনা করতে। কিন্তু বিদেশে গিয়ে যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন, তা বদলে দেয় তাঁর জীবন।

গ্রাফিক্স - দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 20 October 2025 16:12
'বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর...' কারও মৃত্যুর হাজারো কারণ থাকতে পারে। কিন্তু কিছু মৃত্যুর গল্প সময়ের সঙ্গে মিশে যায় না, বরং আরও গভীর রহস্যে ঢেকে যায়। ভারতের প্রথম প্যারানর্মাল ইনভেস্টিগেটর (Paranormal Investigator) গৌরব তিওয়ারির (Gaurav Tiwari) ঘটনাটিও ঠিক তেমনই। ২০১৬ সালে মাত্র ৩১ বছর বয়সে জীবন থেমে গিয়েছিল তাঁর। কিন্তু ২০২৫-এ দাঁড়িয়ে এখনও সেই মৃত্যু নিয়ে কৌতূহল ফুরোয়নি।
৫৪ বছর বয়সি প্যারানর্মাল ইনভেস্টিগেটর এবং মার্কিন সেনাবাহিনীর জওয়ান ড্যান রিভেরার মৃত্যুর খবরে চমকেছেন অনেকেই। কুখ্যাত এবং কথিত ভুতুড়ে 'অ্যানাবেল' পুতুলের (Annabelle) সঙ্গে ভ্রমণের সময় অপ্রত্যাশিতভাবে মারা যান তিনি। সেই প্রেক্ষিতেই সম্প্রতি আবারও গৌরবের নাম উঠে এসেছে নানা আলোচনায়। কারণ? ভূতের ভয়, বা প্যারানর্মাল অ্যাক্টিভিটি (Paranormal Activity) - যে বিষয়টিকে অনেকেই অবিশ্বাসের চোখে দেখেন, কিন্তু যেটি আজও মানুষের কৌতূহলের শীর্ষে। ভুতুড়ে গল্পের প্রতি এই মুগ্ধতাই একসময় গৌরব তিওয়ারিকে নিয়ে গিয়েছিল সেই অদ্ভুত জগতে, যেখানে বিজ্ঞান আর বিশ্বাসের সীমারেখা মিলেমিশে যায়।
১৯৮৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর জন্ম গৌরবের। ছোটবেলা থেকেই অজানার প্রতি আকর্ষণ ছিল তাঁর। উচ্চশিক্ষার জন্য গেছিলেন আমেরিকায়, এভিয়েশন (Aviation) নিয়ে পড়াশোনা করতে। কিন্তু বিদেশে গিয়ে যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন, তা বদলে দেয় তাঁর জীবন। তিনি দাবি করেছিলেন, এক রাতে নিজের ফ্ল্যাটে দেখেছিলেন এক ছোট মেয়েকে, যে আসলে জীবিত নয়। সেই থেকেই শুরু হয় তাঁর প্যারানর্মাল জার্নি।
ভারতে ফিরে গৌরব প্রতিষ্ঠা করেন ইন্ডিয়ান প্যারানর্মাল সোসাইটি (Indian Paranormal Society) - দেশের প্রথম সংস্থা যা বৈজ্ঞানিকভাবে তথাকথিত ভুতুড়ে জায়গাগুলোর অনুসন্ধান করত। পরে তিনি যোগ দেন আন্তর্জাতিক সংগঠন ParaNexus-এর ভারতীয় প্রতিনিধি হিসেবে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রায় ৬,০০০টি হন্টেড জায়গায় রিসার্চ করেছেন তিনি।
টেলিভিশনের পর্দায়ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন গৌরব। এমটিভির আলোচিত শো 'Girl’s Night Out'-এর সহ-সঞ্চালক ছিলেন তিনি। প্রতি সপ্তাহে তিন তরুণীকে পাঠানো হত এক ভয়ঙ্কর জায়গায়। সঙ্গে থাকত না কোনও ক্রু, ফোন, বা বাইরের যোগাযোগ। শুধু ভয় আর অজানার মুখোমুখি হয়ে কাটাতে হত এক রাত। এই অনুষ্ঠানই তাঁকে করে তোলে এক রহস্যময় তারকা।
তবে ভানগর দুর্গের এক এপিসোডে এক প্রতিযোগী অসুস্থ হয়ে পড়ার পরই শোটি বন্ধ হয়ে যায়। গৌরবের গবেষণা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিল ভূত আয়া, ফিয়ার ফাইলস-এর মতো জনপ্রিয় শো'র গল্পও।
২০১৬ সালের ৭ জুলাই সব বদলে গেল। আর সেদিন থেকেই জন্ম নিল এক রহস্য যার ভাগশেষ এখনও বিজোড়। ওই দিন সকালে সব কিছুই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু ১১টার পর বাথরুমে গিয়ে আর বেরিয়ে আসেননি গৌরব। পরিবারের লোকেরা তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান, কিন্তু তখন দেরি হয়ে গেছিল। চিকিৎসকরা বলেছিলেন, হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু। কিন্তু গৌরবের গলায় লম্বা এক কালো দাগ দেখে চমকে যান সকলে। পুলিশ জানায়, শ্বাসরোধে মৃত্যু হয়েছে, আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করে তারা।
কিন্তু যারা গৌরবকে চিনতেন, তাঁদের কেউই বিশ্বাস করতে পারেননি। যে মানুষ মৃত্যুকে বোঝার চেষ্টা করতেন, সে কি নিজেই মৃত্যুকে ডেকে আনতে পারেন?
মৃত্যুর এক মাস আগে গৌরব তাঁর স্ত্রীকে বলেছিলেন - এক অজানা শক্তি যেন তাঁকে টানছে, আর তিনি সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। স্ত্রী ভেবেছিলেন, কাজের চাপ থেকে আসা মানসিক ক্লান্তির প্রকাশ। কিন্তু মৃত্যুর ঠিক আগে গৌরব নাকি বলেছিলেন - “আমি একটা ছোট মেয়েকে দেখতে পাচ্ছি, সে আমাকে নিজের দুনিয়ায় নিয়ে যেতে চাইছে…”
সেই সময় গৌরব তদন্ত করছিলেন এক বাড়িতে, যেখানে তাঁর দাবি অনুযায়ী ১২টি আত্মার উপস্থিতি ছিল। এরপরই ঘটে সেই অপ্রত্যাশিত মৃত্যু।
সরকারিভাবে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলা হলেও, আজও কেউ জানে না, গৌরব তিওয়ারির মৃত্যুর আসল কারণ কী। হয়তো এটা ছিল নিছক দুর্ঘটনা, হয়তো মানসিক চাপে আত্মহত্যা। কিন্তু সেই 'তৃতীয় কারণ' নিয়েও জলঘোলা কখনও কমেনি।
যারা ভূত-প্রেতের ঘটনায় বিশ্বাস করেন, যারা আজ এই বিষয় নিয়ে রিসার্চ করতে চান, প্যারানর্মাল অ্যাক্টিভিস্ট হতে চান, তাদের পথিকৃত অবশ্যভাবেই গৌরব তিওয়ারি। ভারতের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় 'প্যারানর্মাল ইনভেস্টিগেটর' তিনিই। নিজের গোটা জীবন মৃত্যুর পিছনের রহস্য খুঁজতে লাগিয়েছিলেন গৌরব। কে জানত, তাঁর নিজের মৃত্যুই সবচেয়ে বড় রহস্য হয়ে দাঁড়াবে।