আতশবাজি, উৎসবের জাঁকজমক - সবই সেখানে অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ। কোনও বিশেষ পদের আয়োজন হয় না রান্নাঘরে। সাম্মুর (Himachal Pradesh Sammoo) প্রবীণদের কথায় ফিরে ফিরে আসে সাবধানবাণী।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 18 October 2025 20:41
দ্য ওয়াল ব্যুরো: উৎসব মানে সেখানে মিশে থাকে নানা বয়সের মানুষের হাসির শব্দ, একরাশ আলো আর অনেকটা আনন্দ। জীবনের যাবতীয় দুঃখ কিছুদিনের জন্য দূরে কোথাও সরিয়ে রেখে, সব ভুলে মানুষ মেতে ওঠেন রঙের আলোয়।
তার মধ্যেও ভারতের এমন এক জায়গা আছে, যেখানে দীপাবলিতে টিমটিম করে প্রদীপের আলোর শিখাটুকুই জ্বলে ওঠে, তার নিচে জমাটবাঁধা অন্ধকারের মতো গাঢ় হয়ে থাকে অভিশাপের কালো ছায়া।
হিমাচল প্রদেশে হামিরপুর সদর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে সাম্মু নামের একটি ছোট গ্রাম আছে। বহু বছরের প্রথা মেনে এবারও সেখানে দীপাবলির আলো জ্বলেনি। নেপথ্যে গাঢ় হয়ে উঠেছে এক শতাব্দী প্রাচীন অভিশাপ।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, এক সতী নারীর গভীর শোক থেকে উঠে আসা অভিশাপের ছায়া ঘুরে বেড়াচ্ছে আজও সাম্মুর বাতাসে। সেখানে গ্রামবাসীরা দীপাবলি উদ্যাপন করতে পারেন না।

গ্রামপ্রধানের সহকারী বীণা দেবীর কথায়, ''অনেক যুগ ধরে এই রীতি চলে আসছে। এক সময় এক মহিলা স্বামীর চিতায় আত্মাহুতি দেন এবং অভিশাপ দেন যে, এই গ্রামে কেউ দীপাবলি পালন করতে পারবে না।''
দীপাবলির দিনে যেখানে সারা দেশ মেতে ওঠে আলোর রোশনাইতে, সেখানে সাম্মুতে আলোর উৎসবে শুধু নামমাত্র জ্বলে কেবল প্রদীপ। আতশবাজি পোড়ানো বা উৎসবের জাঁকজমক - সবই সেখানে কার্যত অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ। কোনও বিশেষ রান্নার আয়োজন হয় না রান্নাঘরে। গ্রামের প্রবীণদের কথায় বারবার ফিরে আসে সাবধানবাণী।

এভাবেই কি নিয়তিকে মেনে নিয়েছেন সাম্মু গ্রামের মানুষ? ব্যাপারটা আসলে এত সহজ নয়। যখনই কেউ এই শতাব্দী প্রাচীন অভিশাপের তেজ পরখ করতে গিয়েছেন, বিপদ অনিবার্য হয়ে নেমে এসেছে তাঁদের পরিবারে, জীবনে।
গ্রামের এক প্রবীণ থাকুর বিধীচাঁদ বলেন, “যে বছর কেউ নিয়ম ভেঙেছে, সেই বছরই কখনও কারও মৃত্যু হয়েছে, কখনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ।”
বাসিন্দারা গ্রাম ছেড়ে গেলেও, অভিশাপ মিশে গিয়েছে তাঁদের জীবনের সঙ্গে। জানা যায়, একবার এক পরিবার গ্রাম থেকে বেরিয়ে পাকাপাকিভাবে দূরে কোথাও গিয়ে থাকা শুরু করে। দীপাবলির দিন বিশেষ পদ রান্না করতে গিয়ে বাড়িতে আগুন লেগে যায়।
কী সেই অভিশাপ?
স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, কয়েকশো বছর আগে গ্রামের এক গর্ভবতী মহিলা দীপাবলি উপলক্ষে বাবার বাড়িতে এসেছিলেন। তখন খবর আসে তাঁর স্বামী, স্থানীয় রাজ্যের সেনায় কর্মরত, যুদ্ধে শহিদ হয়েছেন। শোকে পাগল হয়ে তিনি স্বামীর চিতায় আত্মাহুতি দেন। মৃত্যুর আগে শেষ কথা শোনা যায়, “এই গ্রাম আর কখনও দীপাবলি পালন করতে পারবে না।”
সেই অভিশাপে আজও ভারী হয়ে আছে সাম্মুর বাতাস। এরপর থেকেই সাম্মু গ্রামে দীপাবলি নিষিদ্ধ। অভিশাপ ভাঙতে একাধিকবার ‘যজ্ঞের’ আয়োজন করা হয়েছে, কিন্তু তাতেও কোনও লাভ হয়নি। প্রবীণ এক বাসিন্দা বিজয় কুমার জানান, “তিন বছর আগে বিশাল যজ্ঞ হয়েছিল। কিন্তু অভিশাপের প্রভাব আজও অটুট।”
এমনকী অনেকে নাকি দীপাবলির দিনে বাড়ি থেকেও বার হন না। ভয়, এই বুঝি আবার কোনও বিপদ ডেকে আনল গ্রামের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ানো পুরনো অভিশাপ। তবে আশা ছাড়েননি তাঁরা, একদিন হঠাৎ করেই সব ঠিক হয়ে যাবে, দীপাবলির রাতে গ্রামে আলোর রোশনাই ঠিক আসবে, আসবেই।