ঘুড়ি ওড়ানো থেকে শুরু করে বাজি পোড়ানো, কলকাতার বাঙালিবাবুদের কাছে বাবুগিরি ফলানোটাই খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল সেই আঠেরো শতকে। এই দেখনদারির জন্য তাঁরা সময়, শ্রম আর টাকা ওড়াতেন অকাতরে।

গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 18 October 2025 18:41
বাজির আলোয় শুধু আকাশ নয়, জ্বলে উঠত অহঙ্কারও। আঠেরো শতকের কলকাতায় (Kolkata) কালীপুজো (Kali Pujo) মানে কেবল ভক্তির রাত্রি ছিল না —সেটা ছিল বাবুদের আত্মমর্যাদার প্রদর্শনী। ধূপের গন্ধে মিশে থাকত বারুদের ঝাঁঝ, আর শাঁখের ধ্বনির আড়ালে বাজত প্রতিযোগিতার ঢাক। কে বেশি খরচ করবে, কার উঠোনে বাজির রোশনাই (Fire Crackers) বেশি উজ্জ্বল হবে—এই অঘোষিত লড়াইয়ে পুড়ে যেত শুধু বাজি নয়, সুবুদ্ধিও। কালীপুজোর রাত তখন হয়ে উঠেছিল কলকাতার বাবুদের (Kolkata Babu Culture) অহংকারের মঞ্চ, যেখানে আনন্দ আর আগুন একসঙ্গেই নাচত।
বস্তুত, ঘুড়ি ওড়ানো থেকে শুরু করে বাজি পোড়ানো, কলকাতার বাঙালিবাবুদের কাছে বাবুগিরি ফলানোটাই খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল সেই আঠেরো শতকে। এই দেখনদারির জন্য তাঁরা সময়, শ্রম আর টাকা ওড়াতেন অকাতরে। বাজির সঙ্গে মানসম্মান এতটাই জড়িয়ে ফেলতেন যে একে কেন্দ্র করে মনোমালিন্য, মারামারিরও অন্ত থাকত না।
সে সময়ের কলকাতায়, ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবে আনন্দ প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে বাজির ব্যবহার ছিল একেবারে প্রতিদিনের ব্যাপার। ইংরেজ জমানায় সেই আনন্দে যুক্ত হয়েছিল ইউরোপীয় প্রভাব। তাদের আমোদপ্রমোদের অন্যতম অঙ্গ ছিল আতসবাজি।
১৭৬৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথম ময়নুদ্দিন বারুদওয়ালাকে বাজি তৈরির লাইসেন্স দেয়। দু’বছর পর কালীচরণ সিংহও অনুমতি পান। কোম্পানির হিসেব অনুযায়ী, প্রতি বছরই কলকাতার কারিগররা নতুন করে বাজি বানাতেন, আর কালীপুজোর রাতে সেই বাজির রোশনাইতে ভুবন রাঙাতেন।
কিন্তু আনন্দের এই খেলা যে কতটা বিপজ্জনক ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় কোম্পানির এক আদেশনামায়। ১৭৬২ সালের ১২ ডিসেম্বরের সেখানে বলা হয়, শহরে আতসবাজি ছোড়ার ফলে চালাবাড়িতে আগুন লেগে পাড়ার পর পাড়া ছাই হয়ে যাচ্ছে। তাই শহরের মধ্যে বাজি পোড়ানো নিষিদ্ধ করা হল।
তবে ইতিহাস জানায়, এই নির্দেশ কার্যকর হয়নি। কারণ মাত্র দু’বছর পরই আবার কালীচরণ সিংহকে আতসবাজি তৈরির অনুমতি দেওয়া হয়। অর্থাৎ, নিষেধাজ্ঞা থাকলেও কলকাতার আকাশ তখনও আলোকিত ছিল বাহারি বাজির আলোয়।
সেই সময় কলকাতার বাবুদেরও ছিল এক অদ্ভুত জাত। রাজা-জমিদারদের উত্তরসূরি, কিন্তু ভোগবিলাসে মত্ত। দিনে ঘুম, সন্ধ্যায় সেতার-বীণা, আর রাতে বারাঙ্গনাদের আখড়ায় আমোদ।
কালীপুজোর রাতে এই বাবুরাই প্রতিযোগিতায় নেমে পড়তেন। কার বাড়ির বাজি বেশি ঝলমলে, কার তুবড়ি কতটা উঁচুতে উঠে বাহারি আলো ছড়ায়। কেউ হাজার টাকার বাজি পোড়াতেন, কেউ আবার পুতুলের বিয়েতেও লক্ষাধিক টাকা খরচ করতেন।
বিমল মিত্রের ‘সাহেব বিবি গোলাম’-এর পাঠকরা নিশ্চয়ই মনে রাখবেন জানবাজারের সেই ঘটনাটা। বড়বাড়ির ছোটকর্তা ও তার রক্ষিতা চুনীদাসীর কালীপুজোর রাত।
সেদিন একে একে বাজির ঝাঁক উড়ে গিয়েছিল এক বাড়ি থেকে আর এক বাড়িতে। এক বাড়ির ছাদের মেয়েরা, আরেক বাড়ির বাবুরা— দু’দলেই প্রতিযোগিতা। হাসি, চিৎকার, বাজির ঝলক, একসময় হুল্লোড়ের সেই আসর পরিণত হয়েছিল বিপর্যয়ে। আগুন ছড়িয়েছিল শাড়িতে, চুলে, উঠোনে। তবু কারও হুঁশ নেই। এই উন্মাদনার মধ্যে মিশে ছিল নেশা, হিংসা আর অহঙ্কারের আগুনও।
বড়লোক বাড়ির বাবুদের মতোই, শহরের ছেলেমেয়েরাও তখন বাজির নেশায় মেতে উঠত। একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা চলত হইহই করে।
তখন কলকাতার কালীপুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং শহরের সামাজিক উন্মাদনার এক প্রতিচ্ছবিও বটে। আতসবাজির আলো যেমন অন্ধকার ভেদ করত, তেমনি সেই আলোয় ঢাকা পড়ত বাবুগিরি ফলানো শহুরে লালসা, প্রতিযোগিতা, ও অন্ধ ভোগের গল্প।
বাবুদের আভিজাত্যের চাকচিক্য শুধু কথার ফুলঝুরি বা নিরামিষ আচারেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল যথেষ্টই ‘আমিষ’ জীবনযাপন। সমাজে পুরুষালি ভাব বজায় রাখতে অধিকাংশ বাবু দিনের বেলা থাকতেন নিজের বাড়িতে, কিন্তু রাত নামলেই পা পড়ত রক্ষিতার ঘরে। কারও ছিল এক, তো কারও একাধিক রক্ষিতা। ধর্মভীরু হোন বা কালীপুজোর নিয়মিত উপাসক— রক্ষিতা আর বাইজিদের ক্ষেত্রে তাঁরা ছিলেন বেশ অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী। মুসলমান উপপত্নী রাখাকে কেউই ধর্মবিরুদ্ধ মনে করতেন না।
নিজের বাড়িতে স্ত্রীকে পাশে নিয়ে নিষ্ঠাভরে যেমন কালীপুজো করতেন, তেমনই উপচার শেষে মুসলমান প্রেয়সীর সঙ্গে বাজি ফাটানোয় কোনও বাধা ছিল না। সুন্দরী উপপত্নীকে নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, হিংসে আর গালগল্পে সেই সময়ের বাবু সমাজে বাজির রোশনাইয়ের চেয়েও বেশি উত্তাপ ছড়াত।
কলকাতার সেই বাবুরা আজ নেই, কিন্তু যে বাজি-পোড়া আলো এখনও শহরকে রাঙায় কালীপুজোয়, তার ছায়ায় লুকিয়ে থাকে সেই পুরোনো কাহিনি। সেখানে দেবীর আরাধনার সঙ্গেই প্রতিযোগিতা করত মানুষের অহঙ্কার। ইতিহাসের পাতায় হয়তো ধুলো পড়েছে, ওই রাতের বারুদের গন্ধ এখনও মনে করিয়ে দেয়, বাজির মতোই বাবুগিরিও একদিন নিভে যায়।