সংঘাত নয়, সহাবস্থানই যে বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের আসল পথ, তা প্রমাণ করছেন এই জেলার স্থানীয় বাসিন্দারা। হাতির করিডর রক্ষায় তাঁদের এই নিরলস লড়াইকে কুর্নিশ জানাচ্ছেন পশুপ্রেমীরা।

সংগৃহীত ছবি
শেষ আপডেট: 28 December 2025 18:48
দ্য ওয়াল ব্যুরো: একটা ফোনকল। রাতের অন্ধকার। ডুয়ার্সের (Dooars) এক নদীর ধারে হইচই। গ্রামবাসীরা আতশবাজি ফাটিয়ে, চিৎকার করে তাড়াতে চাইছেন দু’টি হাতিকে। সেই খবর পেয়ে ছুটে গিয়েছিলেন এস পি পাণ্ডে। স্থানীয় স্কুলশিক্ষক। আরেক পরিচয়- বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের এক নিরলস কর্মী।
ঘটনাস্থলে পৌঁছে আচমকাই চোখে পড়ে অন্য দৃশ্য। নদীর জলে যেন পাথর ভেসে উঠছে-ডুবছে। ভাল করে তাকিয়ে বোঝা যায়, সেগুলো পাথর নয়। প্রায় ৩০টি হাতির বিশাল দল, নিঃশব্দে নদী পার হচ্ছে। সামনে দু’টি হাতি মানুষের নজর ঘুরিয়ে রেখেছে। পিছনে পুরো পাল নিরাপদে করিডর ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। ‘দেখুন, কতটা বুদ্ধিমান এরা,’ আজও বিস্ময় লুকোতে পারেন না পাণ্ডে
এই ঘটনাই বুঝিয়ে দেয়, এশীয় হাতি (Asian Elephant) শুধু বিপন্ন প্রাণী নয়, তারা নির্দিষ্ট পথ মেনে চলা এক চলমান বাস্তুতন্ত্র। অথচ সেই পথই সবচেয়ে বিপদের মুখে।
হাতির পথেই মানুষের কংক্রিট
শিকার, বেআইনি বাণিজ্য, বন উজাড়-সব মিলিয়ে ভারতে হাতির সংখ্যা কমছে। ২০১৭ সালে যেখানে সংখ্যা ছিল প্রায় ২৭ হাজার, সাম্প্রতিক হিসেব বলছে তা নেমে এসেছে প্রায় ২২ হাজারে। সবচেয়ে বড় সংকট কিন্তু অন্য জায়গায়, হাতির যাতায়াতের প্রাকৃতিক পথ অর্থাৎ করিডরগুলো।
রাস্তাঘাট, রেললাইন, বসতি, শিল্পাঞ্চল-মানুষের উন্নয়নের মানচিত্র হাতির প্রাচীন রুটের ওপর চাপা পড়েছে। ফল? সংঘর্ষ। মৃত্যু। সম্পত্তির ক্ষতি। সবচেয়ে বেশি ভুগছে করিডরের ধারে থাকা গ্রামগুলো। ডুয়ার্স তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
‘রাইট অফ প্যাসেজ’: হাতির চলার অধিকার
এই সংকট থেকেই জন্ম নেয় ‘রাইট অফ প্যাসেজ’ (Right of Passage) প্রকল্প। যা নিয়ে আজকের প্রতিবেদন। ২০০৫ সালে উদ্যোগ নেয় ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া (Wildlife Trust of India)। সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থা, আইএফএডব্লিউ, আইইউসিএন-নেদারল্যান্ডস, ওয়ার্ল্ড ল্যান্ড ট্রাস্ট, এলিফ্যান্ট ফ্যামিলি। লক্ষ্য একটাই, হাতিদের স্বাধীনভাবে চলার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া।
দেশজুড়ে গবেষণা করে চিহ্নিত করা হয় ৮৮টি হাতির করিডর। পরে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০১-এ। কিন্তু শুধু মানচিত্রে দাগ টানলেই সমস্যা মেটে না।
করিডর পাহারায় ‘গ্রিন করিডর চ্যাম্পিয়ন’
এখানেই আসে স্থানীয় মানুষের ভূমিকা। ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া তৈরি করে ‘গ্রিন করিডর চ্যাম্পিয়ন’ (Green Corridor Champion) মডেল। করিডরের ধারে বসবাসকারী মানুষদেরই দায়িত্ব দেওয়া হয় নজরদারি, সচেতনতা এবং প্রশাসনের সঙ্গে সেতুবন্ধনের।
এস পি পাণ্ডে তাঁদেরই একজন। তাঁর সংগঠন স্পোয়ার (SPOAR) বন দফতর, পঞ্চায়েত, চা-বাগান মালিকদের সঙ্গে মিলেই কাজ করে। ফলাফল চোখে পড়ার মতো। পাণ্ডের দাবি, ডুয়ার্স অঞ্চলে হাতি-মানুষ সংঘর্ষে মৃত্যু ও ক্ষতির ঘটনা কমেছে প্রায় ৬০ শতাংশ।
কীভাবে করিডরগুলি রক্ষা করেন তাঁরা?
চারটি মডেলে করিডর রক্ষা
১) প্রাইভেট পারচেজ: জমি কিনে বন দফতরের হাতে তুলে দেওয়া
২) গভর্নমেন্ট অ্যাকুইজিশন: সরকারের মাধ্যমে করিডর অধিগ্রহণ
৩) কমিউনিটি সিকিওরমেন্ট: স্থানীয় মানুষের সঙ্গে লাভ-ভাগাভাগি
৪) পাবলিক সিকিওরমেন্ট: গ্রিন করিডর চ্যাম্পিয়নদের মাধ্যমে নজরদারি
এই শেষ মডেলটাই সবচেয়ে কার্যকর বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, করিডর রক্ষা তখন বাইরের হস্তক্ষেপ নয়, স্থানীয় দায়িত্বে পরিণত হয়।
সহাবস্থানের লড়াই
এই উদ্যোগ শুধু হাতিকে বাঁচানোর নয়। মানুষকেও রক্ষা করার চেষ্টা, বলছেন পাণ্ডেজিরা। স্কুলে স্কুলে সচেতনতা, গ্রামের বৈঠক, প্রশাসনিক সমন্বয়-সব মিলিয়ে ধীর কিন্তু ধারাবাহিক একটা কাজ। পশুপ্রেমী উপাসনা গাঙ্গুলির কথায়, ‘হাতি যদি নিরাপদে চলতে পারে, সংঘর্ষ এমনিতেই কমে।’ আর হাতি কেন রাস্তা পার হয়? কারণ মানুষই তার পথে রাস্তা বানিয়েছে। তারা তো হাঁটবেই।
ডুয়ার্সের নদীতে সেই ‘ভাসমান পাথরে’র দৃশ্য মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতি এখনও বুদ্ধিমান। প্রশ্ন একটাই, আমরা কি সেই বুদ্ধিমত্তার পাশে দাঁড়াতে পারব?