Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরগরমে মেজাজ হারালেন কর্মীরা! চুঁচুড়ায় নিজের দলের লোকেদেরই বিক্ষোভের মুখে দেবাংশুবার্নল-বোরোলিন বিতর্ক, ‘লুম্পেনদের’ হুঁশিয়ারি দিয়ে বিপাকে ডিইও, কমিশনকে কড়া চিঠি ডেরেক ও’ব্রায়েনেরভাঁড়ে মা ভবানী! ঘটা করে বৈঠক ডেকে সেরেনা হোটেলের বিলই মেটাতে পারল না 'শান্তি দূত' পাকিস্তান

ভারত জিআই দেওয়ার পর ইউনেসকোর তকমা চায় বাংলাদেশ, 'টাঙ্গাইল' শাড়ি নিয়ে টানাটানির শুরুটা কোথা থেকে?

ভারত টাঙ্গাইল শাড়িকে জিআই তকমা দেওয়ার পরই ইউনেসকোর স্বীকৃতি চাইছে বাংলাদেশ। টাঙ্গাইল শাড়িকে ঘিরে দুই দেশের টানাটানির সূত্রপাত কোথা থেকে, তা নিয়েই নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

ভারত জিআই দেওয়ার পর ইউনেসকোর তকমা চায় বাংলাদেশ, 'টাঙ্গাইল' শাড়ি নিয়ে টানাটানির শুরুটা কোথা থেকে?

টাঙ্গাইল (ছবি- দ্য ওয়াল)

শেষ আপডেট: 7 December 2025 18:02

গার্গী দাস

টাঙ্গাইল শাড়িকে নিজস্বভাবে জিআই ট্যাগ দিয়েছে ভারত। এবার ঢাকা চাইছে ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের তকমা। অবিভক্ত বাংলায় তৈরি হত এই শাড়ি। পরে টাঙ্গাইল কার, সেনিয়ে রীতিমতো দড়ি টানাটানি হয়। আর সেনিয়েই চর্চা ও বিতর্ক এখন তুঙ্গে।

দুই বাংলার সম্পর্ককে ‘একই সংস্কৃতি, একটাই ইতিহাস’ বলা হোক না কেন, টাঙ্গাইল শাড়িকে ঘিরে টানাটানি কিন্তু পরিষ্কার। একদিকে ভারত সরকার ‘টাঙ্গাইল শাড়ি অব বেঙ্গল’ নামে জিআই স্বীকৃতি দিয়েছে ২০২৪-এ। অন্যদিকে বাংলাদেশের দাবি, নামেই সব কেচ্ছা, টাঙ্গাইল তো আসলে তাদেরই জেলার, সেখান থেকেই জন্ম এই বস্ত্রের। তাই এবার ইউনেসকোর ‘অমূল্য ঐতিহ্য’ (Intangible Heritage) তকমার লড়াইয়ে নেমে পড়েছে তারা।

টাঙ্গাইল কি সত্যিই বাংলাদেশের? না আদতে পশ্চিমবঙ্গের। এটা জানতে গেলে একটু পেছনে যেতে হবে।

ঢাকার ধামরাই চৌহাটে বসাক সম্প্রদায়ের তাঁতিরা থাকতেন। মূলত মসলিনের কাজ করতেন সকলে। ওঁদের মসলিনের কারিগরই বলা হত। উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে  জমিদারদের আমন্ত্রণে তাঁরা পাড়ি দেন ময়মনসিংহের টাঙ্গাইল মহকুমায়। এই বসাকদের তত্ত্বাবধানে টাঙ্গাইলে তৈরি হতে শুরু করে সূক্ষ্ম কাপড়, রঙিন পাড়, বুটির খেলা–ভরা এক বিশেষ ধাঁচের শাড়ি। স্থানীয় হাটে, বাজারে পরে সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে শাড়িটি।

টাঙ্গাইলে তৈরি হতে শুরু করে এই বিশেষ শাড়ি এবং টাঙ্গাইল থেকেই জনপ্রিয়তা, তাই এই শাড়ির নাম হয় 'টাঙ্গাইল'।

তারপর আসে ১৯৪৭, ভাগ, ধর্ম নিয়ে উত্তেজনা এবং তার আরও পরে ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। টাঙ্গাইলের সেই হিন্দু তাঁতিরা ক্রমে ভিটে–মাটি বিক্রি করে সপরিবারে পালিয়ে আসেন এপারে, পশ্চিমবাংলায়। কেউ থাকতে শুরু করলেন নদিয়া জেলার ফুলিয়ায়, কেউ পূর্ব বর্ধমানের ধাত্রীগ্রাম-সমুদ্রগড়ে। শূন্য হাতে শুরু নতুন জীবন, পুরনো পেশাতেই ভরসা।

কিন্তু বাজার বদলে গিয়েছে ততদিনে। এপারে ‘টাঙ্গাইল’ বাংলাদেশের মত চলছিল না। ক্রেতার রুচি অন্য, প্রতিযোগী অনেক। ফলে ডিজাইনে বদল আনতে বাধ্য হলেন তাঁতিরা। সীমিত বুটি আর সাদা জমির ক্লাসিক টাঙ্গাইল থেকে ধীরে ধীরে চলে এলেন ফুলিয়া–জামদানি ধাঁচে। বডি জুড়ে নকশা, আল্পনা, মানুষের ফিগার, ঘুরন্ত লতা, নানা রঙের সূক্ষ্ম কাজ। আগের তুলনায় আলাদা হলেও, হাতের কাজ আর বুননের কৌশল টাঙ্গাইলেরই ধারাবাহিকতা। এই ‘ফুলিয়া টাঙ্গাইল’ই আজকের ভারতের বাজারে টাঙ্গাইল শাড়ির মুখ।

এরই মধ্যে আসে জিআই (Geographical Indication) তকমার প্রশ্ন। সহজ করে বললে, কোনও পণ্য নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে থাকলে, সেই নামকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হল জিআই। যেমন দার্জিলিং চা, বেনারসি শাড়ি, শ্যাম্পেন। ২০২০ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ‘টাঙ্গাইল শাড়ি অব ওয়েস্ট বেঙ্গল’ নামে আবেদন করে। আপত্তি ওঠে, নাম সংশোধনের পর ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ‘টাঙ্গাইল শাড়ি অব বেঙ্গল’ নথিভুক্ত হয়।

এবার শুরু হয় প্রকৃত ঝামেলা। কারণ নামের প্রথম অংশটাই তো একটি বিদেশি জেলার, বাংলাদেশের। সেখানকার বস্ত্র বিশেষজ্ঞ, নীতি-নির্ধারকরা তাই বলেন, ভারত না কি প্রস্তুত পণ্যের ব্র্যান্ড ভ্যালুতে ‘ফ্রি–রাইড’ করছে। প্রায় ২৫০ বছরের পরিচিতি জমানো নাম ব্যবহার করে নিজেদের পণ্যকে তুলে ধরছে বিশ্ব বাজারে। তাদের যুক্তি, দক্ষ তাঁতি এপারে এসেছেন ঠিকই, কিন্তু জিআই–এর সংজ্ঞা অনুযায়ী টাঙ্গাইল তো বাংলাদেশের ভৌগোলিক অঞ্চল। নামের মধ্যে সেই জায়গাকে টেনে আনা তাই বিভ্রান্তিকর।

ভারতের আছে পাল্টা যুক্তি। আবেদন পত্রেই উল্লেখ আছে, আদতে এই বুননের ধারা এসেছে পূর্ববঙ্গের টাঙ্গাইল থেকে চলে আসা বসাক তাঁতিদের হাত ধরে। তাঁদের উত্তরসূরীরাই আজ ফুলিয়া বা ধাত্রীগ্রামে সারা বছর টাঙ্গাইল বুনছেন, ডিজাইন বদলালেও টেকনিকের ভিতটা একই। ফলে নিজেদের তৈরি শাড়িকে ‘ফুলিয়া টাঙ্গাইল’ বা ‘টাঙ্গাইল অব বেঙ্গল’ নামে রেজিস্টার করায় অন্যায় কিছু নেই।

বাংলাদেশ কী করছে? ওদিকে টাঙ্গাইল শাড়িকে বহুদিন ধরেই জাতীয় সম্পদের ন্যায় হিসেবে দেখা হয়। হাতে বোনা শাড়ি, উৎসব–বিয়ে, জাতীয় দিবসে যেন এক ধরনের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বহিঃপ্রকাশ। ইউনেসকোর ‘অমূল্য ঐতিহ্য’ তালিকায় ঢোকানোর জন্য ঢাকার আশপাশের তাঁতির গ্রামগুলোকে সামনে রেখে ইতিমধ্যেই সেখানে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তাদের আশা, এই স্বীকৃতি পেলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আরও বাড়বে, তরুণ প্রজন্মকে কাজে টেনে আনা সহজ হবে, হাতের কাজ বাঁচবে।

সমস্যা হল, আন্তর্জাতিক আইনের খুঁটিনাটি আর বাস্তব রাজনৈতিক লড়াই। ভারতের জিআই–নথিভুক্তি নিয়ে আপত্তি জানানোর সুযোগ ছিল প্রকাশের তিন মাসের মধ্যেই। বাংলাদেশ সে সময় বিষয়টি ধরতেই পারেনি, পরে সামাজিক মাধ্যমে ভারতের সংস্কৃতি মন্ত্রকের একটি পোস্ট ভাইরাল হওয়ার পর সে দেশে শোরগোল শুরু হয়। এখন যদি আপত্তি তুলতেই হয়, পথ একটাই, ভারতের আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে নিবন্ধন পুনর্বিবেচনা করতে বলা।

অন্যদিকে, নিজেদের ঘরও গুছিয়ে নিতে হবে ঢাকা–দিল্লি দু’পক্ষকেই। বাংলাদেশের জন্য জরুরি, সঠিক প্রক্রিয়ায় টাঙ্গাইল শাড়িকে জিআই হিসেবে নথিভুক্ত করা, ইউনেসকোর জন্য যুক্তিযুক্ত কারণ তৈরি করা ও বিশ্ববাজারে ‘টাঙ্গাইল অব বাংলাদেশ’ নামে আলাদা জায়গা তৈরি করা। ভারতের দায়িত্ব, সরকারি ভাষায় বা প্রচারে যেন টাঙ্গাইলকে ‘ওরিজিনালি বেঙ্গল’ বলে দেখানোর মত দাবি না উঠে, যা প্রতিবেশী দেশের স্বাভাবিক সংবেদনশীলতায় আঘাত হানে।

দিনের শেষে, এই লড়াই শুধু তকমা বা নাম লেখা চিঠির নয়। টাঙ্গাইল মানে দুই দেশেরই হাজার হাজার তাঁতির সংসার, মেয়েদের পড়াশোনা, বুড়ো বাবা–মায়ের ওষুধের টাকা। সীমানার এ পারে হোক বা ওপারে হোক, তাঁতির নকশা, সুতো, বুননের গর্বই আসল ‘ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি’।

জিআই হোক বা ইউনেসকোর তকমা- সব বিতর্কের মধ্যেই সবার আগে মনে রাখতে হয় সেই হাতগুলোর কথা, যারা আজও কাঠের তাঁতের তালে তালে গায়ের ঘাম ঝড়িয়ে সুতো বানিয়ে তৈরি করছেন গর্বের টাঙ্গাইল শাড়ি। 


```