লোটাস বিসকফের হাইপের আড়ালে আসল গল্প, বিমানযাত্রীর প্রিয় ‘ডেলটা কুকি’ কীভাবে ঢুকে পড়ল পাড়ার দোকানে।
.jpeg.webp)
বেলজিয়াম থেকে কলকাতার দোকানে, বিসকফের যাত্রাপথ (ছবি- দিব্যেন্দু দাস)
শেষ আপডেট: 4 December 2025 18:53
রাস্তাঘাটে যে দোকানেই তাকাচ্ছেন চোখে পড়ছে লাল সাদা ম্যাট ফিনিশ প্যাকেটে সরু লম্বা বিস্কুট? আর তাতে আপনার প্রিয় বিসকফ! গত কয়েকদিন ধরে শীতের শহরের এই ছবি অনেকের চোখেই ধরা দিয়েছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে পড়েছে আকাশ কেউ খেয়েছেন, কেউ চেনেন না, কেউ আবার বিসকফ দোকানে দোকানে পাওয়া যাচ্ছে দেখে এক্সাইটেড।
এই বিসকফ এশহরে বা এদেশেও খুব একটা পরিচিত নয়। যারা চেনেন তারা মূলত চিসকেকের সূত্রে। এ শহরে কোকোয়া, ফ্রেঞ্চ লফ, ক্র্যাফ্ট কফি, সুইট টুথ, ডো অ্যাস ইউ লাইক, এখন মিও আমোরের মতো অনেক বেকারি চিজ কেক বানায় ও তার ওপরে অনেকে লোটাসের বিস্কুট একটা সাজিয়ে দেয়। বাস্কিন রবিনসের মতো নামী প্রতিষ্ঠান আইসক্রিমে বিসকফের ব্যবহার করে। কিন্তু খোলা বাজারে পাওয়া যায় না। এমন দুর্লভ বিস্কুট হঠাৎ এই বিস্কুট কেন এল আমার আপনার পাড়ার দোকানে? কারা আনল?
বিসকফের নাম বিসকফ হল কেমন করে, বিসকফ হাতে পেলে কীভাবে চিজকেক বানাবেন। সব প্রশ্নের উত্তর নিয়ে হাজির দ্য ওয়াল। খাদ্যপ্রেমীদের যেকোনও নতুন খাবার নিয়ে চেখে দেখার পাশাপাশি কৌতুহল মেটাও তো দরকার!
এতদিন পর্যন্ত বিসকফ ছিল একটু ‘দূর সম্পর্কের আত্মীয়’–এর মতো। বিদেশফেরত দিদি, মেসো বা বন্ধুর সুটকেস থেকে বেরোত। পাতলা, লম্বা, ঝকঝকে প্যাকেট থেকে বের করে কেউ কফির সঙ্গে ডুবিয়ে খেতেন, কেউ গপাগপ, আর কলকাতার বেকারিগুলোর কাছে এটা ছিল সোনার ডিম পাড়া হাঁস, চিজকেকের বেস হিসেবে ব্যবহার হলেই ‘লোটাস বিসকফ চিজকেক’ বলে চড়চড়িয়ে দাম বাড়ানো।
এবার প্লট পাল্টে গেল। বেলজিয়ামের এই ক্যারামেলাইজড স্পাইসড বিস্কুটকে ভারতের খোলা বাজারে আনল মান্ডেলিজ (Mondelez)-ই। মানে যারা ক্যাডবেরি, ওরিও, বর্নভিটা বানায়, সেই সংস্থাই এখন লোটাস বেকারিজ (Lotus Bakeries)–এর সঙ্গে হাত মিলিয়ে দেশে ‘অফিশিয়াল’ বিসকফ চালু করল। ক্যাম্পেনের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ওয়েলকাম টু দ্য বিসকফ ফিলিং’। শুনতে সিনেমার ডায়লগের মতো হলেও মার্কেট অ্যানালিস্টরা বলছেন, এটি খুবই হিসাবি ব্র্যান্ডিংয়ের পরিচয়।

প্যাকেটের লাল–সাদা, ম্যাট টেক্সচার, সরু স্টিকের মতো বিস্কুট, সামান্য দারুচিনি–আদার ঝাঁজ মেশানো ক্যারামেলের স্বাদ- সবটাই এমনভাবে প্যাকেজ করা, যাতে আপনি সেফলি ধরে নেবেন, ‘এই জিনিসটা বিদেশি, তাই প্রিমিয়াম।’ তার উপর মান্ডেলিজের চাল, পাড়ার দোকানে দোকানে, এয়ারলাইন থেকে ক্যাফে, স্যোশাল মিডিয়ায় ইনফ্লুয়েন্সারের হাতে, সব জায়গায় একই বার্তা, বিসকফ মানেই শুধু বিস্কুট না, ‘ফিলিং’।
কিন্তু এই ‘ফিলিং’–এর গোড়ার গল্পটা কোথায়?
অনেকেই জানেন না, লোটাস ব্র্যান্ডের জন্ম বেলজিয়ামে, গত শতকের ত্রিশের দশকে। সেই সময় নাম ছিল স্পেকুলুস (Speculoos)-সিন্টারক্লাস (সেন্ট নিকোলাস ডে)–এর সময় ছোটদের হাতে হাতে যেত মশলার ঘ্রাণওয়ালা পাতলা বিস্কুট। আদা, দারুচিনি, জায়ফল, লবঙ্গ, এলাচ- শীতের মশলা একসঙ্গে। পরে আশির দশকে যখন এই বিস্কুটকে কফির সঙ্গে জোড়া লাগিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে নামানো হল, তখনই নাম বদলে হল‘বিসকফ’। বিস্কুট + কফি = বিসকফ।

কিন্তু কেবল সুস্বাদু হলেই তো দুনিয়ার বাজার হাতে আনা যায় না। আসল গেমটা হয়েছে মার্কেটিংয়ে। মার্কেটিংয়ের ইতিহাসে আলাদা কেস স্টাডি হওয়া উচিত ‘ডেলটা কুকি’–কে ঘিরে, বলেন অনেকেই।
বিসকফ যখন মার্কিন বাজারে ঢুকল, তখন তারা সোজা গিয়েছিল ডেলটা এয়ারলাইন্স (Delta Airlines)–এর দরজায়। চুক্তি হল, প্লেনের মধ্যে কমপ্লিমেন্টারি স্ন্যাক্স হিসেবে মিলবে ছোট্ট লাল–সাদা কাগজে মোড়া এই বিস্কুট। ফ্রি জিনিস, আর প্লেনের মধ্যে, আর কী চাই! হাজার হাজার যাত্রী আকাশে উড়তে উড়তেই এই ‘ডেলটা কুকি’–র সঙ্গে পরিচিত হলেন।
প্লেন থেকে নেমে সেই লোকেরা সুপারমার্কেটে গিয়ে ওই বিস্কুট খুঁজতে শুরু করলেন। নাম মনে নেই, প্যাকেট মনে আছে। এইভাবেই ‘বিসকফ’ হয়ে উঠল ‘আই ওয়ান্ট দ্যাট এয়ারপ্লেন কুকি’। পরে না কি এক সময় এমনও অফার ছিল, বিসকফ কিনলে পাওয়া যাবে ডেলটা পয়েন্ট, মানে লয়্যাল্টি প্রোগ্রামের অংশ। আর তার সঙ্গে যোগ হল আলাদা করে নজরকাড়া প্যাকেজিং, প্রত্যেকটা বিস্কুট আলাদা মোড়কে, ফন্ট–কালারে স্পষ্ট ইউরোপিয়ান আভিজাত্য।

এই ‘এয়ারলাইন্স লিঙ্ক’–টাই ছিল বিসকফের আসল টার্নিং পয়েন্ট। আকাশের মধ্যে ফ্রিতে খাইয়ে মানুষের মাথায় বসিয়ে দেওয়া হল, এই বিস্কুট মানেই ‘ভ্রমণ’, ‘প্রিমিয়াম’, ‘বিদেশ’। সেখান থেকে ধীরে ধীরে ইউরোপ, আমেরিকাজুড়ে বিসকফের জনপ্রিয়তা। সময় পেরলো, বারকোড-সহ রিটেলে জায়গা হল।
এবার আসা যাক ভারত প্রসঙ্গে!
এ দেশে বিসকফের খ্যাতি ছিল সীমিত। যারা বিদেশ যেতেন বা বন্ধু-আত্মীয়ের মাধ্যমে আনিয়ে নিতেন, তাঁদের কাছে এটা ছিল ‘সুটকেস–স্মৃতি’। তার সঙ্গে একটু একটু করে ঢুকেছে ক্যাফে কালচার, কফির পাশে ছোট ডিশে লোটাস বিস্কুট, অথবা চিজকেকের বেসে গুঁড়িয়ে দেওয়া বিসকফ। ইনস্টাগ্রামের ছবি, রিল, ফুড ব্লগ-সব মিলিয়ে বিস্কুটের বদলে ‘আইডেন্টিটি’ বিক্রি হয়েছে।

মান্ডেলিজ এই জায়গাটাই ধরেছে। ভারতের বিস্কুট মার্কেট প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার। সিংহভাগ দখল করে রেখেছে ব্রিটানিয়া, পারলে, আইটিসি। চকোলেট-কনফেকশনারির বাজারে ক্যাডবেরি–ওরিওর দাপট থাকলেও, কুকিজ সেগমেন্টে মান্ডেলিজ এখনও ততটা বড় নয়। ফলে, লোটাসের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ওরা নামল ‘প্রিমিয়াম বিস্কুট’ সেগমেন্টে।
দামও সেটা বলছে। ১০ টাকার ছোট প্যাকেট থেকে ১০০ টাকার বড় প্যাক কিন্তু কিলো প্রতি গড় দাম বাজারের গড় বিস্কুটের দামের প্রায় আড়াই গুণ। অর্থাৎ, ব্রিটানিয়ার চা-বিস্কুটের সঙ্গে লড়তে নামেনি বিসকফ, লড়ছে ‘ডেজার্ট কুকি’ আর ‘কফি–সঙ্গী’ হিসেবে। প্রথম ফোকাস শহুরে গ্রাহক, কফি–সংস্কৃতিতে যাঁরা মগ্ন, ইনস্টা স্ক্রল করা জেন জি।
ক্যাম্পেনের নাম ‘ওয়েলকাম টু দ্য বিসকফ ফিলিং’। ওগিলভি (Ogilvy)–র ক্রিয়েটিভ টিম আইডিয়াটা তুলেছে খুব সোজা জায়গা থেকে- এটা এমন একটা ক্যারামেলাইজড টেস্ট, যা ‘টেস্ট’–এর থেকেও বেশি ‘ফিলিং’। তাই বিজ্ঞাপনে দেখা যাচ্ছে, টেবিলে চায়ের কাপ বা কফি, আশপাশে বন্ধুবান্ধব, আর তাদের আড্ডার মধ্যে লাল–সাদা প্যাকেট থেকে বেরোচ্ছে বিসকফ।
উল্টোদিকে ওরা জানে, ভারতে গায়ের জেদে ‘বিদেশি’ বলে কোনও কিছু বেশিদিন বিক্রি হয় না। তাই পার্টনার হিসেবে মান্ডেলিজকে বেছে নিয়েছে লোটাস। লাভ? স্থানীয় প্রোডাকশন। ভারতেই তৈরি হবে বিসকফ, তাই দাম কমবে, প্রোডাকশন বাড়বে। কিন্তু রেসিপি? সেটা লোটাস নিজের হাতে রেখে দিয়েছে। বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে মাত্র কয়েকজন পুরো রেসিপি জানেন। বেলজিয়ামে তৈরি হয় এক গোপন প্রি–মিক্স, সেটুকু আসে ভারতেও, তারপর এখানে বাকি প্রক্রিয়া।
এই গল্পটাও ব্র্যান্ডিংয়ের অঙ্গ, আপনি জানলেন, ‘আরে, গোপন মশলা তো এখনও বেলজিয়ামের!’ মনে হবে, তাই তো টেস্টটা ‘অরিজিনাল’ থাকছে।
এখন প্রশ্ন, কেন এত হাইপ?
একদিকে আছে মার্কেটিংয়ের ধূর্ত চাল-এয়ারলাইন্স পার্টনারশিপ, প্রিমিয়াম প্যাকেট, ক্যাফে–কালচার, ইনফ্লুয়েন্সার আর ইনস্টা–রিলের বন্যা। অন্যদিকে আছে কিছু বাস্তব সুবিধাও। বিসকফের বড় সেলিং পয়েন্ট- এটা ভেগান, বাদাম–বিহীন, নন–জিএমও উপকরণে তৈরি বলে দাবি করা হয়। অনেকেরই দুধ বা বাদামে অ্যালার্জি থাকে, তাদের কাছে এটা সেফ অপশন। আবার ক্যারামেলাইজড স্পাইসড টেস্টটা ভারতীয় জিভে খুব অচেনা নয়, আমরা তো মশলাদার, ঝাল–ঝাল, মিষ্টি–মশলা সবই খাই বিস্কুটের ক্ষেত্রে। ফলে, টেস্ট–প্যালেট মানিয়ে নিতে বেশি সময় লাগে না।
তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ‘স্কার্সিটি ভ্যালু’। এতদিন দোকানে পাওয়া যেত না বলে এটা ছিল ‘এয়ারপোর্ট–সুটকেস বিস্কুট’। যে জিনিস সহজলভ্য নয়, সেটা নিয়েই তো বেশি আলোচনা হয়। এখন হঠাৎ যখন পাড়ার দোকান, সুপারমার্কেট, অনলাইন সব জায়গায় একসঙ্গে লাল–সাদা প্যাকেটগুলো ঘুরছে, দেখে মনে হচ্ছে, ‘যে জিনিস এতদিন বিদেশ থেকে আনাতাম, এখন এখানে পেলাম!’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মনস্তত্ত্বকেই দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছে মান্ডেলিজ আর লোটাস।
এদিকে, যেখানে বিসকফ প্রচণ্ড ক্যালকুলেটেডভাবে ঢুকে পড়েছে, সেটা ডেজার্ট–হ্যাক।
চকলেট, ওরিও, মেরি বিস্কুট-সব দিয়েই চিজকেক হয়। কিন্তু ‘বিসকফ চিজকেক’ কথাটার মধ্যে আবার যে বিদেশি আভিজাত্য, সেইটা কেউ মিস করতে চায় না। ঘরোয়া লেভেলে বানাতেও খুব কষ্ট নেই।
ধরুন, আপনি নিজের রান্নাঘরে বসে বানাতে চান নো–বেক বিসকফ চিজকেক। কী করতে হবে?
বিসকফ বিস্কুট গুঁড়িয়ে নিন, সামান্য গলানো মাখনের সঙ্গে মেখে একটা পাত্রের তলায় চেপে বসিয়ে দিন, এটাই বেস। আলাদা বাটিতে ক্রিম চিজ, চিনি গুঁড়ো আর বিসকফ স্প্রেড একসঙ্গে বিট করে মেশান, তারপর হালকা ফেটানো হেভি ক্রিম মিশিয়ে দিন। এই মিশ্রণ বেসের উপরে ঢেলে ফ্রিজে রাখুন চার–পাঁচ ঘণ্টা। বের করে উপর থেকে আবার পাতলা করে বিসকফ স্প্রেড বা গুঁড়ো বিস্কুট ছড়িয়ে দিলেই তৈরি হয়ে গেল ‘ইনস্টাগ্রাম–রেডি’ চিজকেক।

খুব বেশি ঝামেলা নয়, কিন্তু দেখাবে ভীষণ প্রিমিয়াম। খেতে তো ভালই। ব্র্যান্ড ঠিক এই জায়গাটাকেই ক্যাশ করছে, আপনি ঘরে বসেও মনে করবেন, ‘আজ একটু স্পেশাল কিছু বানালাম।’
সব মিলিয়ে, বিসকফের এখনকার ভারত–যাত্রা তিনটে স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে বলে মনে করছেন অনেকে-
ইমেজ: এয়ারলাইন্স, কফি–সংস্কৃতি, লাল–সাদা প্যাকেট, সুটকেস–স্মৃতি—সব মিলিয়ে এক ধরনের গ্লোবাল, ‘ট্রাভেল–টেস্ট’–এর হাওয়া
দুই, অ্যাক্সেসিবিলিটি: মান্ডেলিজের ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্কের জন্য এখন চা–দোকান থেকে মল—সব জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছে বিসকফ, লোকাল প্রোডাকশন হওয়ায় দামও আগের ইম্পোর্টেড প্যাকেটের তুলনায় কমেছে
তিন, অ্যাডাপ্টেবিলিটি: কফির পাশে, চায়ের সঙ্গে, ডিপ হিসেবে, চিজকেক–বেস হিসেবে—যেভাবেই ব্যবহার করুন, টেস্টটা নতুন কিন্তু গ্রহণযোগ্য।

তা বলে কি এটা স্রেফ হাইপ? পুরোপুরি তা নয়, আবার একেবারে ‘জীবন বদলে দেওয়া বিস্কুট’ও নয়। ক্যারামেলাইজড স্পাইসড বিস্কুট—এটাই তার মূল পরিচয়। স্বাদ ভাল, স্মার্ট প্যাকেজিং, চালাক মার্কেটিং-এই ত্রিভুজের উপর দাঁড়িয়ে বিসকফ আজ শহরজুড়ে নজর কাড়ছে।