বেলজিয়াম থেকে সদ্য কম্যান্ডো কোর্স শেষ করে আসা বিক্রমের উত্তর ছিল, “চিন্তা করিস না। হয় তেরঙ্গা উড়িয়ে ফিরব, নয়ত তেরঙ্গায় জড়িয়ে ফিরব। কিন্তু ফিরবই।”

পালামপুরের এক দেশপ্রেমিক তরুণ বিক্রম বত্রা
শেষ আপডেট: 15 August 2025 13:41
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সালটা ১৯৯৯। প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর শান্তির হাত বাড়িয়ে দেওয়া পাকিস্তান সফরের মাত্র তিন মাস পরেই বিশ্বাসঘাতকতার পথে এগোতে শুরু করে পাকিস্তান। নিয়ন্ত্রণরেখা (LoC) পেরিয়ে, শীতকালে প্রবল তুষারপাতের জন্য ফাঁকা থাকা কাশ্মীরের (Kashmir) ভারতীয় সেনা ঘাঁটিগুলো দখল করে নেয় পাক সেনা।
তাদের মূল লক্ষ্য ছিল, ১-ডি জাতীয় সড়ক দখল করে লাদাখকে ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করা। এতে সিয়াচেন গ্লেসিয়ার দখলের সুযোগ মিলবে, যা নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের (India-Pakistan war) মধ্যে চলছিল বহু বছরের লড়াই। কিন্তু পাকিস্তানের জন্য কাজটি যতটা সহজ মনে হয়েছিল, বাস্তবে কিন্তু ততটা ছিল না।
ভারতীয় সেনা এই বিশ্বাসঘাতকতার কড়া জবাব দিয়েছিল, শুরু হয়েছিল ‘অপারেশন বিজয়’। শ্রীনগর থেকে ২০৫ কিলোমিটার দূরের শান্ত গ্রাম কার্গিল সেই মুহূর্ত থেকে পরিণত হয়েছিল রক্তক্ষয়ী রণাঙ্গণে (Kargil War)।
পালামপুরের এক দেশপ্রেমিক তরুণের গল্প
হিমাচল প্রদেশের কাংড়া উপত্যকার ছোট্ট শহর পালামপুর। এখানকার সরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক গিরিধারীলাল বত্রা ও শিক্ষিকা কোমলকান্তের যমজ পুত্র বিক্রম ও বিশাল। বিক্রম জন্মের ১৪ মিনিটের বড়। পরিবার ও বন্ধুদের কাছে তিনি ‘ভিকি’।
ছোট থেকেই মেধাবী, চটপটে, এবং সবার প্রিয়। খেলাধুলো, নাটক, গান, বিতর্ক, আবৃত্তি, আঁকায় সমান দক্ষ। উত্তর ভারতের সেরা এনসিসি ক্যাডেট, ক্যারাটেতে ‘গ্রিন বেল্ট’, জাতীয় স্তরের টেবল টেনিস খেলোয়াড় - সবই ছিল তাঁর কৃতিত্বের ঝুলিতে। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক (Vikram Batra)।
ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার। তাই হংকং-এর মার্চেন্ট নেভির লোভনীয় চাকরি ফিরিয়ে দিয়ে ১৯৯৬ সালে যোগ দেন ভারতীয় মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে। তারপর লেফটেন্যান্ট হিসেবে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।
১৯৯৯ সালের প্রথম দিকে, একদিন বন্ধু মজা করে বলেছিলেন, “ভিকি, কাশ্মীরে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, কে জানে কখন তোর ডাক আসবে। সাবধানে থাকিস।” তখন বেলজিয়াম থেকে সদ্য কম্যান্ডো কোর্স শেষ করে আসা বিক্রমের উত্তর ছিল, “চিন্তা করিস না। হয় তেরঙ্গা উড়িয়ে ফিরব, নয়ত তেরঙ্গায় জড়িয়ে ফিরব। কিন্তু ফিরবই।”
বন্ধুর আশঙ্কাই সত্যি হল। বিক্রমের ইউনিট ‘১৩ জম্মু ও কাশ্মীর রাইফেলস’ কার্গিল যুদ্ধে যাওয়ার নির্দেশ পেল। তাদের লক্ষ্য, ‘পয়েন্ট ৫১৪০’ পুনর্দখল।
পয়েন্ট ৫১৪০-এর অভিযান
দ্রাস সেক্টরের সামরিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়চূড়া ‘পয়েন্ট ৫১৪০’ ছিল পাক সেনার দখলে। ১ জুন ১৯৯৯, বিক্রমকে ফ্রন্টলাইনে যোগ দেওয়ার নির্দেশ আসে। এই অভিযানের দায়িত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল যোগেশ কুমার জোশী।
মিটিংয়ে ঠিক হয়, বিক্রমের ডেল্টা টিমের বিজয় সংকেত হবে - সেই সময়ের পেপসি বিজ্ঞাপনের বিখ্যাত লাইন ‘ইয়ে দিল মাঙ্গে মোর’। এই লাইনটি পরে গোটা ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রেরণার মন্ত্রে পরিণত হয়।
১৯ জুন রাত ৮টা ৩০ মিনিট। ডেল্টা ও ব্রাভো কমান্ডোরা রকেট ও মর্টারের আড়ালে এগোতে শুরু করল পাহাড়চূড়ার দিকে। ভোর ৩টা ৩০ মিনিটে ব্রাভো কমান্ডোরা প্রথম পাকিস্তানি বাঙ্কার উড়িয়ে দেয়।
বিক্রম সিদ্ধান্ত নেন, পিছন দিক থেকে আক্রমণ করে পাক সেনাদের পথ রুদ্ধ করবেন। নিজে তিনটি রকেট ছুঁড়ে পূর্ব দিকের বাঙ্কারগুলিকে বিভ্রান্ত করেন, তারপর অন্ধকারে খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠতে থাকেন। প্রথম বাঙ্কারের মাত্র ৩০ ফুট দূর থেকে পরপর দু’টি গ্রেনেড ছুঁড়ে মেশিনগান স্তব্ধ করে দেন। আহত অবস্থায়ও তিন পাক সেনাকে একাই গুলি করে মারেন। এরপর দু’শো মিটার দূরের দ্বিতীয় বাঙ্কার আক্রমণ করে আট পাক সেনাকে খতম করেন।
২০ জুন ভোর ৪টা ৩৫ মিনিট, ওয়াকি-টকিতে শোনা যায় বিক্রমের কণ্ঠ, ‘ইয়ে দিল মাঙ্গে মোর!’ পয়েন্ট ৫১৪০ ভারতের দখলে আসে। এক জনও ভারতীয় সেনা এই অভিযানে প্রাণ হারাননি।
এই অভূতপূর্ব সাফল্যের জন্য বিক্রমকে প্রমোশন দিয়ে ক্যাপ্টেন করা হয়। তাঁর হাসিমাখা মুখ সারা ভারতের টিভি স্ক্রিনে ছড়িয়ে পড়ে, পাকিস্তানও চিনে নেয় তাঁর সাংকেতিক নাম ‘শের শাহ’ (Shershah)।
পয়েন্ট ৪৮৭৫: শেষ লড়াই ও অমর বীরত্বগাথা
পয়েন্ট ৫১৪০ জয় করার পর, ১৩ জম্মু ও কাশ্মীর রাইফেলস ৩০ জুন চলে আসে মুশকো উপত্যকায়। এখানকার মিশন ১৭,০০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত পয়েন্ট ৪৮৭৫ দখল করা। শৃঙ্গটি এতটাই দুর্গম যে জুন মাসেও বরফে ঢাকা, আর চূড়ায় ওঠার পথ ৮০ ডিগ্রি খাড়া। তার উপর সারাক্ষণ ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন।
খবর আসে, ১৬,০০০ ফুট উচ্চতায় পাক সেনারা ওঁত পেতে আছে। এখান থেকে তারা ভারতের গান পজিশন, সেনা ছাউনি ও ট্রুপ মুভমেন্টে সহজেই নজর রাখছে এবং গোলাবর্ষণ করছে। এর আগেই এই চূড়ার গুলিতে বহু ভারতীয় সেনা শহিদ হয়েছেন।
৪ জুলাই সন্ধ্যা ৬টায় ভারতীয় সেনা শুরু করে তীব্র কামান ও রকেট হামলা। রাত ৮টা ৩০ মিনিটে আলফা ও ব্রাভো কোম্পানি আক্রমণে নামে। পরদিন সকাল ১০টায় চার্লি কোম্পানি মেজর গুরপ্রীত সিংয়ের নেতৃত্বে আক্রমণ চালায়। অবশেষে দুপুরে ভারতীয় বাহিনী পয়েন্ট ৪৮৭৫ দখল করে। কিন্তু তখনও পাশের ফ্ল্যাট টপ শৃঙ্গ থেকে পাক সেনারা প্রবল গোলাবর্ষণ চালাচ্ছিল। এটি দখল না করলে পয়েন্ট ৪৮৭৫ ধরে রাখা অসম্ভব।
৬ জুলাই বিকেলে ভারতীয় সেনারা ফ্ল্যাট টপের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, কিন্তু ক্যাপ্টেন বিক্রম তখন প্রবল জ্বর ও পুরোনো আঘাতের যন্ত্রণায় প্রায় অচেতন। তাঁকে টেন্টে বিশ্রামের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবুও তিনি পরিস্থিতি দেখে সিদ্ধান্ত নেন, তিনি যাবেন। তাঁর সাহস দেখে ডেল্টা কোম্পানির অনেক কমান্ডো স্বেচ্ছায় সঙ্গী হওয়ার প্রস্তাব দেন, যদিও আদেশ অমান্য করলে কোর্ট-মার্শালের সম্ভাবনা ছিল।
শের শাহের প্রত্যাবর্তন
রাত নামতেই ডেল্টা কোম্পানির ২৫ জন সেনা মন্দিরে প্রার্থনা করে অভিযানে নামে। ভারতীয় বাহিনীর ওয়্যারলেসে ভেসে আসে বার্তা, “শের শাহ আসছেন”। পাকিস্তানিরাও এই বার্তা ধরে ফেলে। তারা জানত পয়েন্ট ৫১৪০ জয়ী সেই ভয়ংকর কমান্ডার আসছেন। পাক সেনারা বিদ্রূপ করে বিক্রমকে বলে, “শের শাহ, নাম রাখলেই শের হওয়া যায় না।” বিক্রম ঠান্ডা গলায় জবাব দেন, “আমাদের কথা বাদ দাও, নিজের মৃত্যুর কথা ভাবো।”
ঘন কুয়াশার আড়ালে হামাগুড়ি দিয়ে বিক্রম পৌঁছে যান পাকিস্তানের হেভি মেশিনগানের কাছে। নিখুঁত গ্রেনেড নিক্ষেপে মেশিনগান ধ্বংস হয়, মারা যায় পাঁচ পাক সেনা। পরের বাঙ্কার ধ্বংস করতে এগিয়ে গিয়ে বলেন, “Boys, follow me!”
রক্তাক্ত শরীর নিয়েও একে-৪৭ হাতে সামনে এগিয়ে চলেন। রাতভর লড়াই শেষে ৭ জুলাই ভোরে তাঁরা পৌঁছে যান সবচেয়ে শক্তিশালী পাক বাঙ্কারের সামনে। দিনের আলো ফুটে যাওয়ার আগেই বিক্রম চিৎকার করেন, “দুর্গা মাতা কি জয়!”
প্রথমেই তিনি তিন পাক সেনাকে গুলি করে মারেন। এক পাকিস্তানি ছুরি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লে বিক্রম এক ঘুষিতে তার নাক থেঁতলে দেন, তারপর বেয়নেটে পেট বিদ্ধ করেন। আরেকজন পিছন থেকে ধরলে ক্যারাটের গ্রিন বেল্ট বিক্রম তাকে আছাড় মেরে পাহাড়ের নিচে ফেলে দেন।
এখানেই শেষ নয়, এরপরও তিনি আরও একটি বাঙ্কার আক্রমণ করে চার পাক সেনাকে হত্যা করেন। ঠিক তখনই তাঁর এক জুনিয়র অফিসার গ্রেনেডে গুরুতর আহত হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। সুবেদার রঘুনাথ সিং বললেন, “স্যার, আমি ওঁকে নিয়ে আসছি।” বিক্রম জবাব দেন, “না, তোমার সন্তান আছে, তোমাকে ফিরতেই হবে।”
তিনি নিজেই আহত সহযোদ্ধাকে উদ্ধার করতে ছুটে যান। কাঁধে তোলার মুহূর্তে পাক স্নাইপারের গুলি তাঁর বুকে লাগে, আর গ্রেনেডের স্প্লিন্টার মাথায় আঘাত করে। শেষ শক্তি দিয়ে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, “জয় মাতাদি!” এরপর অচেতন হয়ে চির নিদ্রায় চোখ বোজে ভারত মায়ের বীর সন্তান ক্যাপ্টেন বিক্রম বত্রার।
ক্যাপ্টেন বিক্রম বত্রার (Captain Vikram Batra) মৃত্যু যেন অগ্নিশিখায় ভস্মীভূত হয়নি, বরং তা প্রজ্বলিত করেছে সাহস ও ত্যাগের চিরন্তন প্রদীপ। তাঁর আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে (মরণোত্তর) পরমবীর চক্র প্রদান করা হয়। বন্ধুকে দেওয়া কথা তিনি রেখেছিলেন, তেরঙ্গায় জড়িয়ে ফিরেছিলেন নিজের শহর পালামপুরে। তাঁর মা বলেছিলেন, “ভগবান আমাকে যমজ পুত্র দিয়েছিলেন। একজন আমার জন্য, আরেকজন দেশের জন্য।”
আজ যখন আমরা জাতীয় পতাকা উড়তে দেখি, মনে রাখা উচিত, “আমাদের পতাকা বাতাসে ওড়ে না, ওড়ে শহিদ সেনাদের শেষ নিঃশ্বাসে।”