উত্তর কলকাতাশ রাত যেমন হতো দেরিতে। সকাল তেমনই বেলায়। শুধু বাঙালবাড়িগুলো ভোর থেকে শোনা যেত আকাশবাণীর সানাইয়ের সুর। বাগবাজারের মা গঙ্গা ততক্ষণে পা রেখেছেন ঘাটের শেষ সিঁড়িটাতে।

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 8 July 2025 11:59
উত্তর কলকাতাশ রাত যেমন হতো দেরিতে। সকাল তেমনই বেলায়। শুধু বাঙালবাড়িগুলো ভোর থেকে শোনা যেত আকাশবাণীর সানাইয়ের সুর। বাগবাজারের মা গঙ্গা ততক্ষণে পা রেখেছেন ঘাটের শেষ সিঁড়িটাতে। আকাশ থেকে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টির মধ্যে বিহারি রিকশওয়ালা, ঠেলাওয়ালারা কাপড় কাচছে, চান করছে। ওরা ভোররাতে ওঠে। গঙ্গার পাড়েই লোকচক্ষুর আড়ালে কাজকর্ম সেরে ফেলতে হতো। কিছু বকধার্মিক সার দিয়ে থাকা মন্দিরগুলো শিবের মাথায় জল ঢালতে ঢালতে স্নান সেরে ফিরতেন। তাঁদের কোনও কাজ ছিল না। পূর্বপুরুষদের করে যাওয়া বাড়ির ভাড়ায় গঙ্গার ইলিশ কিনতেন। কোনও কোনও সময় ধারেও।
তখন ইলিশ মাছ গোপনে রাঁধা যেত না। গলির এমুড়ো থেকে ওমুড়ো গন্ধ পাওয়া যেত। চিৎপুর রোড দিয়ে ঠনঠনিয়ে চলে যাওয়া ট্রাম থেকেও গন্ধ পাওয়া যেত। বাড়ির ফাটা চাল কিংবা ছাদ দিয়ে চুঁইয়ে পড়া জলে ভিজে যেত কয়লা ঘরের কয়লা, ঘুঁটে, গুল। তখন শুরু হতো উনুন ধরানোর কুস্তি। বাইরের মেঘবৃষ্টিতে ধোঁয়া বাইরে বেরতে চাইত না। সব ধোঁয়া ঘরের পাখার হাওয়ায় কুণ্ডলী পাকাত। ভিজে আবহাওয়ায় ভেজা কাপড়েও সেই গন্ধ সেন্টের মতো চিপকে যেত, যেগুলি শুকোত ঘরের ভিতর দড়ি টাঙিয়ে ও কিছু খাটের ছত্রিতে।
সাড়ে ৭টা নাগাদ কাগজ আসত। অন্যদিনের থেকে অনেক দেরি। ছপছপে জলের উপর দিয়ে গামবুট পরে তিনি সাইকেল ধরে গলিতে ঢুকতেন। ন্যাতার মতো কাগজটা উনুনের গায়ে অথবা টেবিল ল্যাম্পের গায়ে রেখে শুকোতে হতো। সব বাড়িতে তখন কাগজ আসত না। যে বাড়িতে আসত, সেখানে অন্য পড়শিরা জুটে যেত। সঙ্গে সকালের চা আর থিন অ্যারারুট ফ্রি।
গলি নর্দমা বুজে ততক্ষণে জল ঘরে ঢুকছে। বাচ্চারা খাটে বসে অঙ্ক খাতার পুরনো অঙ্কের খেয়া ভাসাচ্ছে। একটু কিশোরী বয়সের কোনও দিদি বা মাসি গেয়ে উঠত, কেয়াপাতার নৌকো গড়ে...অথবা এবার তোর মরা গাঙে বান এসেছে...। মা-জেঠিমারা হেসে বলতেন মরণ, ধিঙ্গি মেয়ের কাণ্ড দেখো। আরে বাসনগুলো তোল না। নয়তো মেজে দে। আজ তো ও পোড়ার মুখী আসবে না।
দুপুরে সব চুপচাপ। চালেডালে ফুটিয়ে খাওয়া শেষ। মা-জেঠিমারা খাটে বসে পান চিবোচ্ছেন। আর বাচ্চাগুলোর গায়ে চাদর টেনে দিচ্ছেন। পাখা হালকা গতিতে চলছে। কর্তার নাক তীব্র গতিতে ছুটছে। চোখ ঢুলে আসছে। একতলার ঘরে আলোর প্রবেশ প্রায় বন্ধ। জেঠিমা জড়ানো গলায় প্রশ্ন করলেন, হ্যাঁরে ছোট এবার পুজোয় কী শাড়ি নিবি রে?