১৯৯৬ সালের জানুয়ারির গোড়ায় বেঙ্গালুরুর এক ঘটনা আন্তর্জাতিক সংবাদে তোলপাড় ফেলে দিয়েছিল। উত্তাল হয়ে উঠেছিল আজকের সিলিকন ভ্যালি।

শেষ আপডেট: 27 September 2025 20:18
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৯৯৬ সালের জানুয়ারির গোড়ায় বেঙ্গালুরুর এক ঘটনা আন্তর্জাতিক সংবাদে তোলপাড় ফেলে দিয়েছিল। এক ব্রিটিশ নাগরিকের খুন এবং এক ব্রিটিশ মহিলার ধর্ষণের ঘটনায় উত্তাল হয়ে উঠেছিল আজকের সিলিকন ভ্যালি। যথারীতি রহস্যের কিনারা করতে তদন্তে নামে পুলিশ।
প্রথমে দুই ঘটনা একসূত্রে বাঁধা ভেবে তদন্ত এগোতে থাকে। পরে জানা যায়, খুন ও ধর্ষণ - একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কহীন। তবে অবশেষে পুলিশের এক অভিনব কৌশল - এক ‘বিয়ার পার্টি’তেই ধরা পড়ে যায় ধর্ষকের আসল মুখোশ।
প্রথমে চন্দ্র লেআউট এলাকায় এক বিদেশির মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরিচয়পত্র ও কেনাকাটার বিল দেখে জানা যায়, মৃতের নাম জেমস উইলিয়াম স্টুয়ার্ট। তিনি ব্রিটিশ নাগরিক। তিনি কটনপেটের এক লজে উঠেছিলেন। সেখানে গিয়ে পুলিশ স্টুয়ার্টের সঙ্গী, এক ২৭ বছরের ব্রিটিশ মহিলাকে খুঁজে পায়।
তদন্তকারী পুলিশ অফিসার বি বি অশোক কুমার জানান, দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই ওই মহিলা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি জানান, আগের রাতে তাঁকে এক অটোচালক ধর্ষণ করেছে। অশোক জানান, মহিলাকে ওইভাবে ভেঙে পড়তে দেখে তাঁরা প্রথমে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না যে, স্টুয়ার্টের মৃত্যুর কথা তাঁকে জানাবেন কিনা। তখন থেকেই একটা সন্দেহ কাজ করছিল যে, হতেই পারে খুন আর ধর্ষণ দুই-ই একই লোকের কাজ।
পুলিশ বিস্তারিত তদন্ত শুরু করে।
মামলা আদালতে ওঠে নিয়মমাফিক। ব্রিটিশ ওই মহিলা আদালতে জানান, তিনি ও স্টুয়ার্ট, তাঁরা সম্পর্কে ছিলেন। ভারতে ঘুরতে এসেছিলেন, তাজ মহল দেখার ইচ্ছে ছিল তাঁদের। পরে দু'জনে মিলে কর্নাটকের নানা জায়গা ঘুরে দেখেন। সেই সময়ই সুধা লজে থাকছিলেন তাঁরা।
জানুয়ারি ৪ তারিখ রাতে এক রেস্তরাঁয় খাওয়ার পর স্টুয়ার্ট অসুস্থ বোধ করতে থাকেন, পেটে ব্যথা বোধ করায় স্টুয়ার্ট ফিরে আসেন লজের উদ্দেশে। মহিলা একা খাওয়া শেষ করে ফেরার পথে রাস্তা হারিয়ে ফেলেন। সেই সময় গুগল ম্যাপস বা অন্যান্য কোনও সুযোগ-সুবিধা ছিল না। ক্লান্ত হয়ে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। তারই সুযোগ নিয়ে আরআর নগরের দিকে অটো ঘুরিয়ে দেয় ব্যক্তি। তখন ওই এলাকাও আজকের মতো এত জমজমাট ছিল না।
অটোচালক তাঁকে আরআর নগরের এক নির্জন জায়গায় নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে। প্রতিরোধ করতে গিয়ে মহিলা তাঁর কাছে থাকা পেন নাইফ দিয়ে তিনবার অটোচালককে আঘাত করেন, তবু শেষ পর্যন্ত নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি। নির্যাতনের শিকার হতে হয় তাঁকে। ওই অবস্থায় মহিলাকে ফেলেই পালায় ওই ব্যক্তি। পরে এক ট্রাকচালকের সাহায্যে তিনি সেন্ট্রাল থানায় পৌঁছন, তবে ইংরেজি না বোঝায় ডিউটিতে থাকা পুলিশরা তাঁকে ফের লজে পৌঁছে দেয়।
তাঁর লেখা বই 'বুলার সাভারি'তে অশোক কুমার লেখেন, পুলিশ কনস্টেবল মহিলার ভাষা বুঝতে না পারলেও ঊর্ধ্বতন অফিসারকে খবর দিয়ে সজাগ করতে পারত, কিন্তু তাঁরা তা করেননি। সেখানেই বড়সড় খামতি থেকে গিয়েছিল পুলিশের কাজে।
বলাই বাহুল্য, এই ঘটনাকে শিরোনাম করতে ছাড়েনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। বড় বড় করে ছাপা হয়েছিল এই খবর। ভারতে, বিশেষ করে বেঙ্গালুরুতে বিদেশীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন উঠে গিয়েছিল এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে।
এরপর ওই মহিলার ধর্ষণের তদন্তভার পান অফিসার অশোক কুমার এবং আবদুল আজিম নামের এক পুলিশ ইন্সপেক্টরের কাছে যায় স্টুয়ার্টের খুনের মামলা।
অশোক কুমারের হাতে এই মামলার দায়ভার আসার পর তিনি নির্যাতিতা মহিলাকে তাঁর নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন। অশোকের কথায়, 'ওই ঘটনায় মহিলা ভীষণ শক পেয়েছিলেন, ট্রমায় ছিলেন। আমি তাঁকে আমার বাড়িতে নিয়ে আসি। আমার স্ত্রী-মেয়ের সঙ্গে আলাপ করাই। আস্তে আসতে সহজ বোধ করায় আমাদের পরিবারের সঙ্গে তিনি মিশতে শুরু করেন। দু-তিন দিনের মধ্যে তিনি সমস্ত ঘটনা খুলে বলেন সেদিন ঠিক কী হয়েছিল। মহিলা জানিয়েছিলেন, তিনি অটোচালককে তিনবার ছুরি মেরেছিলেন। সেই তথ্য থেকে সামনে আসে যে, ওই অটোচালক সেদিন মাইসোর রোড ধরেছিল।'
পুলিশের কাছে ওই অটোচালকের ব্যাপারে কোনও বিশেষ তথ্য ছিল না, শুধু তার পিঠে তিনটে ক্ষত ছাড়া। কিছুটা অন্ধকারে তীর চালানোর মতো করেই তদন্ত নিয়ে এগোতে হচ্ছিল পুলিশকে। হাতে থাকা ওই একটামাত্র সূত্র ধরে পুলিশ আশপাশের ক্লিনিক হাসপাতালে খোঁজ নেন। অবশেষে আজাদ নগরের সৌভাগ্য নার্সিংহোমের এক নার্স জানান, দু’দিন আগে ২৮ বছর বয়সি কাদিরেশ নামের এক ব্যক্তির শুশ্রূষা করেছিলেন তিনি, তার পিঠে জখম ছিল। কিন্তু কোনওরকম থিকানা সে রেখে যায়নি।
তখন সবে সবে আরটিও দফতরে ডিজিটাল বা কম্পিউটারে নথি এন্ট্রি করা শুরু হয়েছে। এই ঘটনায় সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগায় পুলিশ। নথি ঘেঁটে কাদিরেশের ঠিকানা, ছবি পাওয়া যায়। তার ছবির সঙ্গে আরও কয়েকটি ছবি নিয়ে গিয়ে ওই নার্সের সামনে তুলে ধরলে কাদিরেশকে সঠিক শনাক্ত করেন তিনি।
ঘটনাচক্রে কেঙ্গেরি গেট থানার পেছনেই থাকত কাদিরেশ। সেখান থেকে গ্রেফতার করা হয় তাকে। সেই দিন যে জামা তার পরনে ছিল তাও উদ্ধার করা হয়।
সেইসময় পুলিশের ওপর সব মহল থেকেই চাপ বাড়তে থাকে। কাদিরেশকে থানায় নিয়ে আসার আগেই বলা হয় ডিসিপি-র অফিসে নিয়ে আসতে। সেখান থেকে এই মামলা কর্পস অফ ডিটেকটিভস (অধুনা ‘সিআইডি’)-এর হাতে চলে যায়।
তারপর এই মামলা থেকে সরে যেতে হয় অশোক কুমারের টিমকে।
কিন্তু গ্রেফতারের পরও কোনওভাবেই কাদিরেশের মুখ খোলাতে পারেনি পুলিশ, সিওডির আধিকারিকরা। অশোক কুমার জানান, ‘সেই সময় পুলিশের ‘ট্রিটমেন্ট’ থানায় চললেও সিওডি আধিকারিকরা তদন্ত চলাকালীন অভিযুক্তের গায়ে হাত তুলতেন না।
সিবিআইয়ের তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার প্রভীন সুদ নির্দেশ দেন, যেহেতু এই মামলা অত্যন্ত সংবেদনশীল - তাই নির্যাতন নয়, অন্য কৌশলের সাহায্য নিয়ে স্বীকারোক্তি বার করতে হবে কাদিরেশের মুখ থেকে।
এরপর অশোক কুমাররা কাদিরেশকে জেজে নগর থানায় এনে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ শুরু করেন। অশোকের কথায়, ‘তার পরিবারের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হয়, জানতে চাওয়া হয় সে মদ্যপান করতে চায় কিনা। উত্তরে কাদিরেশ জানায়, সে শুধু বিয়ার খায়। তখন তাকে বিয়ার অফার করা হয়, দুটো বোতল আনা হয়। দুটোতেই তবে কাদিরেশের অজান্তেই তাতে ১৮০ মিলি ব্র্যান্ডি মেশানো হয়। ২৫ মিনিটের মধ্যেই সে দুটোই শেষ করে ফেলে। তখন আস্তে আস্তে ধর্ষণের দিনের কথা জানতে চাওয়া হয়।’
অশোক আরও জানান, ‘কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে এমন পরিস্থিতিতে নিয়ে যাওয়া হয় যে, সে গড়গড় করে সেদিনের কথা উগড়োতে থাকে। এই সুযোগে পুরো কথোপকথন রেকর্ড করা হয়।
এরপর বেঙ্গালুরুর স্পেশাল কোর্টে পেশ করার আগে কাদিরেশের বিরুদ্ধে চার্জশিট ফাইল করা হয়। তদন্তের প্রমাণ, নার্সের সাক্ষ্য ও নির্যাতিতার বয়ানের ভিত্তিতে ১৯৯৮ সালে আদালত কাদিরেশকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।
অশোক কুমার পরে বলেন, ‘আজকের দিনে পুলিশ স্টেশনে এমন কৌশল কল্পনাও করা যায় না। তবে সেই সময়ের বাস্তবতায় সেটাই ছিল কার্যকর উপায়। এরকম বেশ কিছু নজির রয়েছে যেখানে, মদ্যপানের কৌশলে বার করে নেওয়া স্বীকারোক্তি কোর্টে পেশ করা হয়েছে। এবং তাতে ‘সাবস্ট্যানশিয়াল’ প্রমাণও দিতে হয়েছে।’
পরে ২০০২ সালে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কন্নড় ছবি Police Officers মুক্তি পায়।