যে লাইব্রেরিগুলো একসময় পাঠক, গবেষক ও সাধারণ মানুষের শিক্ষার মূল ভরসা ছিল, আজ তার অনেকগুলিই তালাবদ্ধ, অব্যবহৃত বা ইঁদুরে ভর্তি।
.jpg.webp)
প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 21 September 2025 18:28
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পশ্চিমবঙ্গের জনজীবনে নীরবেই তৈরি হচ্ছে এক গভীর সংকট। ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে পাড়ার পাঠকদের একটা বড় ভরসা – জনসাধারণের জন্য তৈরি হওয়া লাইব্রেরি। যে লাইব্রেরিগুলো একসময় পাঠক, গবেষক ও সাধারণ মানুষের শিক্ষার মূল ভরসা ছিল, আজ তার অনেকগুলিই তালাবদ্ধ, অব্যবহৃত বা ইঁদুরে ভর্তি। কোথাও পরিকাঠামো ভেঙে পড়ছে, কোথাও কর্মী অভাবে বন্ধ হয়ে আছে।
ভারতের সংবিধান শিক্ষার অধিকারকে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার অধিকার (আর্টিকেল ২১)-এর অংশ করেছে। ২০০২ সালের ৮৬তম সংশোধনী প্রাথমিক শিক্ষাকে সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু বাস্তবে পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে মোট ২,৪৮০টি লাইব্রেরি, তার মধ্যে মাত্র ১৩টি পূর্ণ সরকারি লাইব্রেরি রয়েছে প্রায় ১০ কোটিরও বেশি মানুষের জন্য। কলকাতার মতো মহানগরীতে, যেখানে জনসংখ্যা ১.৬ কোটির কাছাকাছি, সেখানে সরকারি লাইব্রেরি মাত্র দু’টি।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ASER রিপোর্ট ২০২৪ জানাচ্ছে, ২০২৪ সালে প্রাথমিক স্তরে (প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি) ভর্তি হার কমেছে। ছেলেদের ৮৬.৪% এবং মেয়েদের ৮৯.৪%।
পড়াশোনার মান উদ্বেগজনক। মাত্র ৩৩.৩% ছেলে ও ৩৮.৯% মেয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির টেক্সট পড়তে পারে। পঞ্চম শ্রেণিতে এই হার ৫০% ছেলে ও ৫৭.৮% মেয়ে, অষ্টমে ৬৬.৯% ছেলে ও ৭৩.৯% মেয়ে।
তাছাড়া, ২০২৪ সালে স্কুলের ৪৭%–এ লাইব্রেরি নেই। ডিজিটাল বৈষম্যও এখানে সুস্পষ্ট। ১৪–১৬ বছর বয়সে শিক্ষার জন্য মোবাইল ব্যবহার করেছে ৪০–৪৭%, অথচ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেছে ৭৩–৭৯%। মোবাইল ফোনের মালিকানায় বড় লিঙ্গ বৈষম্য দেখা যাচ্ছে। ছেলেদের ক্ষেত্রে যেখানে ১৯%, সেটাই মেয়েদের ক্ষেত্রে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে মাত্র ৯%।
আইন ও প্রশাসনিক অবহেলা
১৯৭৯ সালে পশ্চিমবঙ্গ পাবলিক লাইব্রেরি আইন প্রণীত হয়েছিল একটি সংগঠিত লাইব্রেরি সিস্টেম গড়ার উদ্দেশ্যে। আইন অনুযায়ী লাইব্রেরির জন্য আলাদা দফতরও রয়েছে, কিন্তু চার বছরেরও বেশি সময় ধরে সেই ওয়েবসাইট আপডেট হয়নি, এটাই তো অবহেলার বড় প্রমাণ।
সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ
২০২৫ সালের এপ্রিলে সুপ্রিম কোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলায় শুনানি হয়, যেখানে গ্রামীণ এলাকায় গ্রন্থাগার গড়তে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দেওয়ার দাবি ওঠে। আদালত জানায়, লাইব্রেরি সামাজিক ন্যায়বিচারের অংশ। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানীয় জল-সহ অন্যান্য মৌলিক সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে লাইব্রেরিও অপরিহার্য।
শুনানিতে আরও বলা হয়, ই-লাইব্রেরি গড়ে তুলতে CSR ফান্ড ব্যবহার করতে হবে। গ্রন্থাগার হবে ‘গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সাংবিধানিক সংস্কৃতির বাহক।’
করণীয় পরিবর্তন
বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি দিক নির্দেশ করেছেন—
• ডিজিটাল লাইব্রেরি কার্ড চালু করা, যাতে এক কার্ডে রাজ্যের সব লাইব্রেরি ব্যবহার করা যায়।
• বিদ্যমান লাইব্রেরিকে পাঠকবান্ধব করা যেমন - টয়লেট, জল, বিদ্যুৎ, কর্মী নিশ্চিত করতে হবে।
• ধাপে ধাপে ডিজিটাল ইন্টিগ্রেশন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও NGO–র সঙ্গে সমন্বয়।
• ব্রেইল বইয়ের সংস্করণ যোগ করা, যাতে বিশেষভাবে সক্ষম পাঠকরাও সমান সুযোগ পান।
• লাইব্রেরিকে কমিউনিটি লার্নিং হাব হিসেবে ব্যবহার করা, স্কুল-পরবর্তী সময়ে।
প্রেরণার উদাহরণ
• কর্নাটকের ‘ওদুভা বেলাকু’ কর্মসূচি (কোভিড-পরবর্তী সময়ে শিশুদের পড়াশোনায় যুক্ত রাখতে)।
• মাদুরাইয়ের কালাইনগর সেন্টেনারি লাইব্রেরি (২০২৩), বিশ্বমানের অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রকল্প।
• প্রয়াগরাজে ৪০০ গ্রামে ডিজিটাল লাইব্রেরি গড়ার পরিকল্পনা।
তবে সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফে এক উদ্যোগে আশার আলো দেখছে ওয়াকিবহাল মহল।
লাইব্রেরিকে (library) নতুন করে সাজিয়ে গুছিয়ে তুলতে বই ও জার্নাল (books and journals) কেনার জন্য ৫ লক্ষ টাকা করে অনুদান পাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের সরকার-অনুদানপ্রাপ্ত কলেজ (Government-Aided Colleges)। ৩৯৯টি কলেজ রয়েছে এই প্রকল্পের আওতায়। ‘ইন-প্রিন্সিপল অনুমোদন’ হিসেবে মোট বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯ কোটি ৯৫ লক্ষ টাকা। কর্তৃপক্ষ ও অধ্যক্ষদের মতে, বিশেষ করে ছোট কলেজগুলোকে এটি এক রকমের জীবনীশক্তি জোগাবে।