বই মানেই যেখানে মানুষের কাছে অত্যন্ত সম্মানীয় এবং পবিত্র একটি বিষয়, সেখানে বই নিয়ে ‘মেলা’ হবে, বিষয়টি প্রথমে একেবারেই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। আজ কলকাতা বইমেলা যে মানুষের কাছে এই আদর পেয়েছে, তার নেপথ্যে রয়েছে একটা বড়সড় কাহিনী। সেটা বুঝতে গেলে আমাদের ফিরতে হবে বইমেলা শুরুর ঠিক আগের দিনগুলোতে।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 2 February 2026 20:58
১৯৭৬ মানে আমি তখন কলেজে পড়ি। ৩ মার্চ, প্রথম বইমেলা দেখল কলকাতা। স্পষ্ট মনে আছে, গোটা বইমেলায় মেরেকেটে ৩২ কি ৩৩টা স্টল হয়েছিল। গুটিগুটি পায়ে পথচলা শুরু করে সেই বইমেলাই আজ ৪৯তম বছর ছুঁয়েছে। বাঙালির মনে তথা বিশ্বের দরবারে সে নিজের স্থান পাকাপোক্ত করে ফেলেছে বটে, তবে শুরুর পথটা এত মসৃণ মোটেই ছিল না। বই মানেই যেখানে মানুষের কাছে অত্যন্ত সম্মাননীয় এবং পবিত্র একটি বিষয়, সেখানে বই নিয়ে ‘মেলা’ হবে, বিষয়টি প্রথমে একেবারেই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। আজ কলকাতা বইমেলা যে মানুষের কাছে এই আদর পেয়েছে, তার নেপথ্যে রয়েছে একটা বড়সড় কাহিনি। সেটা বুঝতে গেলে আমাদের ফিরতে হবে বইমেলা শুরুর ঠিক আগের দিনগুলোতে।
প্রকাশক বিমল ধর, দাশগুপ্ত অ্যান্ড কোম্পানির প্রবীর দাশগুপ্ত তো ছিলেনই, জয়ন্ত বাগচি, অশোক বারিকের মতো বেশ কয়েকজনের হাত ধরে ১৯৭৫-এ শুরু হয়েছিল আজকের কলকাতা বইমেলার সফর। তার আগে কলকাতায় একটাই সংগঠন ছিল, পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স অ্যাসোসিয়েশন। সেই শিকড় বহু প্রাচীন, ১৯১২ সালে প্রোথিত। তৎকালীন নতুন প্রজন্ম বিমল ধর, প্রবীর দাশগুপ্তরা ভেবেছিলেন ফ্র্যাঙ্কফুটে যদি মানুষ বইমেলাকে এমন ভালবাসা দিতে পারে, সেখানে কলকাতার সংস্কৃতিমনস্ক মানুষের জন্য এখানে বইমেলা কেন হবে না! সেই আর্জি নিয়ে তাঁরা গিয়েছিলেন পাবলিশিং ট্রেডের কাছে। তখন যাঁরা এই সংগঠনের নেতৃত্ব ছিলেন, তাঁরা সেই আর্জি শুধু খারিজই করেননি, দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, তোমরা পাগল নাকি! এ কী জুতো-শাড়ির মেলা! বই নিয়ে মেলা বসবে! বইয়ের সঙ্গে মানুষের শ্রদ্ধা, মেধা-মনন জড়িয়ে রয়েছে – সেটা এভাবে ফুটপাথে নামিয়ে আনবে? লে লে বাবু ছ’আনা?
কিন্তু নতুন প্রজন্মও নাছোড়বান্দা। তাঁদের সাফ উত্তর, আমরা ফ্র্যাঙ্কফুট থেকে দেখে এসেছি। সেখানের মানুষ সাদরে গ্রহণ করেছেন বইমেলাকে। আমাদেরও বইমেলার অনুমতি দিন। ছাড়পত্র এল না। ‘বড়’দের সিদ্ধান্তে একপ্রকার বিরক্ত হয়ে গিয়ে কফিহাউসে একটা সংগঠন তৈরি করলেন ‘নতুন প্রজন্ম’। ১৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫ - তৈরি হল পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড। ঠিক হল, যাই হয়ে যাক না কেন, বইমেলা হবেই।
সেই মতো মার্চ মাসে বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের উল্টো দিকের মাঠে শুরু হল বইমেলা। সেখানেও বাধাবিপত্তির শেষ নেই। প্রথম বছরেই প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি। বইমেলার গেটটির নকশা করেছিলেন শুভাপ্রসন্নবাবু (শুভাপ্রসন্ন ভট্টাচার্য)। সেই মেন গেট ভেঙে পড়ল। সে এক দিন বটে! আমরা কলেজ থেকে গিয়েছিলাম। বেশ মজাই লেগেছিল। পকেটে পয়সা থাকত না। মনে আছে প্রথমবার চার আনার টিকিট ছিল (তারপর আট আনা, তারপর এক টাকা। পাঁচ টাকা পর্যন্ত টিকিট হয়েছিল)। তেমন কোনও জাঁকজমক নেই, বড় কিছু স্টলই ছিল। আমরা গিয়ে বইটই দেখেছিলাম। তখন কেউ ভাবতেই পারেননি, সেই বইমেলা আজ এখানে এসে পৌঁছবে। এ যেন এক অলৌকিক যাত্রা!
বুকসেলার্স গিল্ডের প্রথম দিকের সদস্যরা এখন তাঁরা প্রায় কেউ নেই। অধিকাংশই কালের নিয়মে চলে গেছেন। দু’একজন এখনও আমাদের মাথার উপরের ছাদ হয়ে রয়েছেন, অভিভাবকের মতো।
৩২-৩৩টা স্টল থেকে শুরু করে আজ বইমেলায় স্টল-লিটিল ম্যাগাজিন নিয়ে প্রায় ১১০০ অংশগ্রহণকারী। এই জায়গায় যে আজ গিল্ড পৌঁছতে পেরেছে, তাঁর সমস্ত কৃতিত্বই কলকাতার মানুষের। শুধু তাই নয়, সমগ্র পশ্চিমবঙ্গের মানুষ, বিশেষত বইপ্রেমী বাঙালির ভালবাসা ছাড়া বইমেলা অসম্পূর্ণ। অডিওবুক, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, গুগলের (তাদের আমি বইয়ের সহকর্মী বা সহমর্মী বলেই মনে করি) যুগেও যে বইমেলা গর্বের ৪৯তম বছরে পৌঁছছে এটা অকল্পনীয় তো বটেই।
১৯৮১ সালের ৩ অগস্ট পত্রভারতীর যাত্রা শুরু, তখন ১২-১৩টা বই ছিল। সেই সম্পদ নিয়ে পরের বছর থেকে পত্রভারতীও বইমেলার অংশ হয়ে ওঠে। অধিকাংশই নন্টে ফন্টে বা অন্যান্য কমিকস, দু’তিনটে বই।
১৯৮৩ সালে যখন ব্রিগেডে বইমেলা হয়েছিল, তখনও আমি বইমেলা বা গিল্ডের মেম্বার হইনি। ইন্টারন্যাশনাল পাবলিশার্স অ্যাসোসসিয়েশনের (আইপিএ) ভাইস প্রেসিডেন্ট অশোক ঘোষের (উনিও এখন চলে গেছেন) আমন্ত্রণে আইপিএ-এর খুব বিখ্যাত মানুষ কুচুমাও এসেছিলেন কলকাতা বইমেলায়। আয়োজন দেখে মুগ্ধ মানুষটি তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক বইমেলার ক্যালেন্ডারে স্থান পাওয়া উচিত কলকাতার। তখন আন্তর্জাতিক বইমেলার ছাপা ক্যালেন্ডার হতো, এখন অবশ্য সেটা ডিজিটালি হয়।
১৯৮৭-৮৮ থেকে নানা দেশ অংশ নিতে শুরু করে। শুরুতে অবশ্য থিম বিষয়টি ছিল না। তারপর ১৯৮৯-তে, আমি সেই বছর প্রথম মেম্বার হয়েছি, প্রথম অসম ‘ফোকাল থিম স্টেট’ হল। অসম, ত্রিপুরা, ওড়িশা, বিহার - এইভাবে পথ চলতে চলতে ১৯৯৭ সালে ফ্রান্সকে ফোকাল থিম কান্ট্রি করা হল। আর দুর্ভাগ্যের বিষয়, সেই বছরই, ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড দেখল কলকাতা বইমেলা। নোবেলজয়ী জাক দেরিদা উদ্বোধন করেছিলেন। ৫ দিন হইহই করে কাটার পর আগুন লাগল মেলায়। বইমেলার একটা বড় অংশ সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে যায়। তৎকালীন রাজ্য সরকার এবং তথ্যসংস্কৃতি ও পুলিশ মন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কৃতিত্বে মাত্র ৫ দিনেই বইমেলা আবারও নতুন করে শুরু হয়েছিল। তখন বিরোধী নেত্রী ছিলেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনিও এসেছিলেন, সবরকম সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। আমি তখন গ্রাউন্ড কনভেনর। মনে আছে উনি বলেছিলেন, ‘আমি এখানে রাজনীতি করতে আসিনি, বইমেলার পাশে দাঁড়াতে এসেছি।’
১৯৯৫-৯৬ থেকে গিল্ডের হয়ে ডিসিশান মেকিং বডির সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। ২০০০-এ আমি জয়েন্ট সেক্রেটারি হলাম। বলা যেতে পারে, তখন থেকে কলকাতা বইমেলায় আমাদের নিজস্ব মতামত তৈরি হতে শুরু করেছিল। আমরা তখন বইমেলার নতুন প্রজন্ম। সেটাও প্রায় ২৫-২৬ বছর আগে। এখন আবার নতুন প্রজন্মরা এসেছে বইমেলার দায়িত্বে।
বইমেলা যে একটু একটু করে এগিয়ে চলেছে, এটাকে আমি একটা ‘কন্টিনিউয়াস প্রসেস’-ই বুঝি। এই বইমেলা আমাদের সকলের স্বপ্ন নিয়েই তৈরি। প্রতিবছর কিছু না কিছু নতুন উদ্যোগ, নতুন আকর্ষণ তুলে ধরার ইচ্ছে থাকে। তাঁর মধ্যেই একটা যেমন ছিল লটারি - এও মানুষকে বই কিনতে উৎসাহিত করার নতুন এক পরিকল্পনা। আগে টিকিট রাখা হতো, বই কিনলে সেই টিকিটের দাম ফেরত দিয়ে দেওয়া হতো। ২০১২-এর পর থেকে অবশ্য সেই সিস্টেম উঠে যায়।
আমার একটা পরিচয় প্রকাশক-সম্পাদক-লেখক, পাশাপাশি আরও একটা বড় পরিচয়, আমি একজন পাঠক। সোশ্যাল মিডিয়া আদৌ কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং বইকে পাঠকের কাছে তাড়াতাড়ি পৌঁছে দেওয়াই তার উদ্দেশ্য। আমি তো মনে করি, সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই বেশ কিছু লেখক (অবশ্যই তার মধ্যে আমরাও পড়ি) আরও বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। কোনও তথ্য প্রকাশে এখনকার লেখকরা অনেক বেশি সতর্ক। সতর্ক প্রকাশকরাও। বানানে গন্ডগোল, ছাপার কোনও ভুল হলে সঙ্গে সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায় রিঅ্যাকশন আসতে থাকে, প্রকাশকরা ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকেন। বইয়ের স্বার্থ যদি ভাবি, এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক দিক।
এখন বইমেলায় যেমন লেখকদের প্রমোশনেরও একটা ব্যাপার থাকে। সেখানে অবশ্যই প্রকাশকের একটা উদ্যোগ রয়েছে। কমবেশি অনেক প্রকাশক আগে থেকে লিস্ট তৈরি করিয়ে রাখেন যে, অমুক লেখক আজ স্টলে বসছেন। এটা তো ভালই। আসলে বই তো একটা কমোডিটি। প্রকাশক-লেখক হিসেবে আমি তো এখানে কোনও ভুল দেখি না। আমার মতে, এটা যত হয়, তত ভাল।