সেই থেকে আজও নিজামুদ্দিন আউলিয়ার দরগায় বসন্ত পঞ্চমীতে হলুদ ফুল ছড়িয়ে রেখে যান তাঁর অনুরাগীরা। হিন্দুস্থানী উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত আর কাওয়ালির মূর্ছনায় তৈরি হয় অন্য আবহ। ঘুচে যায় হিন্দু-মুসলিম বিভেদ।

দ্য ওয়াল।
শেষ আপডেট: 26 January 2026 11:37
তিনি নিজে নিঃসন্তান। বোন তাকিউদ্দিন নূহের পুত্রকে ঘিরেই ছিল তাঁর পৃথিবী। তাঁকেই স্নেহের পাত্র উপুড় করে দিয়েছিলেন। তাঁকে ঘিরে আবর্তিত হত জীবনের অনেকটা। সেই ভাগ্নের অকালে চলে যাওয়া নাড়িয়ে দিয়েছিল নিজামুদ্দিন আউলিয়াকেও (Nizamuddin Auliya)। শোকে দুঃখে স্থবির হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। সবকিছু থেকে একরকম সরিয়ে নিয়েছিলেন নিজেকে ।
দিনের পর দিন নিঃসঙ্গ, শোকাহত, নীরব এবং অসুস্থ গুরুকে দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন আমির খসরু (Amir Khasru)। বেদনার কারণ আলাদা হলেও গুরুর সঙ্গেই বিষাদে ডুবে যাচ্ছিলেন তিনিও। আমির খসরু (Amir Khasru), যাকে 'কাওয়ালি'-র জনক বলা হয়, একই সঙ্গে চিহ্নিত করা হয় 'ভারতের তোতাপাখি' নামে। পারস্য ও ভারতীয় সংস্কৃতির মিশ্রণে এক নতুন সাহিত্য ও সংগীত ধারার জন্ম দিয়েছিলেন তিনি। সেতার ও তবলা আবিষ্কারের কৃতিত্বও দেওয়া হয় তাঁকে। অথচ কীভাবে গুরুকে এই অবস্থা থেকে বের করে আনবেন তার দিশা মিলছিল না।
বসন্ত পঞ্চমীর বাসন্তী (Saraswati Puja 2026) রঙ শান্তির প্রলেপ হয়ে এল গুরু-শিষ্য দুজনের জীবনেই। পিছিয়ে যেতে হবে প্রায় সাতশো বছর। পুরোনো দিল্লির গলিপথ রঙিন হয়েছিল বাসন্তী রঙে। সর্ষের ফুল আর হলুদ ফুলের আবির উড়িয়ে গান গাইতে গাইতে পথ হাঁটছিলেন একদল মানুষ। পরনেও হলুদ বস্ত্র। আমির খসরুর (Amir Khasru) নজর টেনেছিল সেই সাজ আর আবহ। উৎসাহী হয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন কী উৎসবে মেতেছেন তাঁরা।
উত্তর এসেছিল, "আজ আমাদের বসন্ত পঞ্চমী (Basanti Panchami)। বাকদেবী সরস্বতীর আরাধনার দিন। দেবীকে তুষ্ট করলে তবেই মিলবে জ্ঞান-ধী-প্রজ্ঞা। শিল্পকলা-সঙ্গীত-জ্ঞানের আধার দেবী। তাঁকে আরাধনা করতে হয় 'যা কুন্দেনু তুষার হার ধবলা যা শুভ্রবস্ত্রাবৃতা' মন্ত্রে। বসন্তে তাঁর আরাধনা, তাই তিনি বাসন্তী। তাই আমরা হলুদ রঙে সেজেছি।"
সেই মিছিলের ভাবনা-রং-রূপে আকৃষ্ট হয়েছিলেন আমির খসরু। সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়েছিল, এই রূপ দেখিয়ে যদি গুরুকেও বিষাদ থেকে ফিরিয়ে আনা যায়! সেই দলটিকে তিনি অনুরোধ করলেন তাঁর সঙ্গে একবার আউলিয়ার দরগায় যেতে। সেখানে গিয়ে গুরুর পায়ে হলুদ ফুলের অর্ঘ্য দিলেন আমির খসরু। পোশাক-ফুল-আবিরে হলুদ হওয়া দলটির সুরে সাড়া দিলেন নিজামুদ্দিন আউলিয়া। তাঁর চোখ থেকে ঝরে পড়ল অশ্রু। দীর্ঘদিন পর ভাগ্নের কবরে উঠে সুরে সুরে স্মৃতিচারণ করলেন।
সেখানেই শেষ নয়। বরং শুরু। সেই থেকে আজও নিজামুদ্দিন আউলিয়ার (Nizamuddin Auliya) দরগায় বসন্ত পঞ্চমীতে হলুদ ফুল ছড়িয়ে রেখে যান তাঁর অনুরাগীরা। হিন্দুস্থানী উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত আর কাওয়ালির মূর্ছনায় তৈরি হয় অন্য আবহ। ঘুচে যায় হিন্দু-মুসলিম (Hindu-Muslim) বিভেদ। সুফি সাধকের স্বপ্নের বিচ্ছুরণ দেখা যায় এই বিশেষ দিনে।