এই মুঠোয় ধরে রাখা সৌন্দর্য দিনদিন ঝরে পড়ছে। দ্রুত বদল ঘটছে গোটা এলাকার। কয়েক বছর আগেও যে পর্বতশৃঙ্গ সারা বছর বরফে ঢাকা থাকত, এখন সেগুলিরই পাথুরে চূড়া দৃশ্যমান হচ্ছে।

মেরু এলাকার বাইরে হিমালয়ই হল পৃথিবীর বৃহত্তম তুষার ও বরফের ভাণ্ডার।
শেষ আপডেট: 21 August 2025 14:56
দ্য ওয়াল ব্যুরো: লাদাখ, বাঙালি কেন যে কোনও পাহাড়প্রেমী মানুষেরই স্বপ্নের ভ্রমণ সফর। লেহ্ হল হিমালয়-কারাকোরামের কোলে এক ছবির শহর। যেখান থেকে দেখা মেলে মেঘের খেলাঘর। বরফে মোড়া পাহাড়ের শ্রেণি ও শৃঙ্গের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা। বরফ ঠান্ডা বাতাস, দিগন্ত বিস্তৃত অপরূপ ছবির ফ্রেমের মতো এক পৃথিবী। পুরু বরফের হিমবাহ গলিত ঝরনা। কিন্তু, এই মুঠোয় ধরে রাখা সৌন্দর্য দিনদিন ঝরে পড়ছে। দ্রুত বদল ঘটছে গোটা এলাকার। কয়েক বছর আগেও যে পর্বতশৃঙ্গ সারা বছর বরফে ঢাকা থাকত, এখন সেগুলিরই পাথুরে চূড়া দৃশ্যমান হচ্ছে।
মেরু এলাকার বাইরে হিমালয়ই হল পৃথিবীর বৃহত্তম তুষার ও বরফের ভাণ্ডার। এখানে বড় বড় জলের আধার হিমবাহগুলি অঞ্চলের জল-আর্থিক কাঠামোর মূল ভিত। যদিও এগুলি ধীরে ধীরে মানুষের সভ্যতার ভিড়ে আলগা হয়ে আসছে। বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং জলবায়ুর পরিবর্তনে হিমালয়জাত হিমবাহগুলি মুমূর্ষু হয়ে পড়ছে। যা অদূর ভবিষ্যতে শুধু লাদাখ কিংবা ভারত নয়, গোটা গ্রহেরই বিনাশ ডেকে আনতে পারে।
উত্তর ভারতের তুষার মরু বলা হয় লাদাখকে। হিমালয়, কারাকোরাম ও জান্সকর পর্বতশ্রেণি জুড়ে প্রায় ২,২০০ হিমবাহ রয়েছে এই এলাকায়। যা গোটা অঞ্চলের ৬ শতাংশ এলাকা অথবা ৭,৯০০ বর্গকিমি বিস্তৃত। বিশাল সিয়াচেন হিমবাহ হল ভারতের বৃহত্তম, যা ৭৩ কিমি এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। কারাকোরাম শ্রেণিতে রয়েছে। জান্সকরে রয়ে ড্রাং ড্রুং এবং সুরু উপত্যকার পারাচিক উল্লেখযোগ্য হিমবাহগুলির মধ্যে রয়েছে।
অধিকাংশ হিমবাহই রয়েছে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পাঁচ থেকে ছয় হাজার মিটার উঁচুতে। এর ৯০ শতাংশই হল ৫ কিমি দীর্ঘ। এই হিমবাহগুলি থেকে জন্ম নিয়েছে সিন্ধু, জান্সকর, লেহ্ নদী এবং প্যাংগং ও টিসো মোরিরির মতো প্রাকৃতিক হ্রদ। এগুলি শুধু সেচ ও কৃষির কাজেই আসে না। এগুলি থেকে মেলে পানীয় জল যা সরবরাহ হয় লাদাখ ও জম্মু-কাশ্মীরে।
তিন লক্ষ মানুষের বাস লাদাখ এই হিমবাহের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। ২০২৪ সালের একটি সমীক্ষায় ধরা পড়েছে, কীভাবে জলবায়ুর পরিবর্তন এবং মানুষের পদরেখা গত কয়েক দশক ধরে মৃত্যু ডেকে আনছে হিমবাহর। যার ফলে লাদাখ হিমালয়ের ভূস্তরের জলাভাব ক্রমশ ঘনিয়ে আসছে। লিটল আইস এজ (১৬৫০ খ্রিস্টাব্দ) থেকে হিমবাহ এলাকা প্রায় ৪০ শতাংশ গলে গিয়েছে। একইসঙ্গে প্রতিবছর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ঘটেছে ১৫ শতাংশ করে।
এই এলাকার ৪০ শতাংশ জল আসে হিমবাহের গলনে। যার কোনও রকম বিঘ্ন ঘটলে অববাহিকা অঞ্চল যেমন- গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা বাদে সিন্ধু অববাহিকায় সরাসরি জলাভাব দেখা দেবে। জানান আইআইটি, ইন্দোরের অধ্যাপক ফারুক আজম। লাদাখের জনসংখ্যা ও সামাজিক পরিবর্তন দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে নগরায়নের ফলে। কোভিড পরবর্তীকালে এই এলাকায় ব্যাপক হারে পর্যটন শিল্পে জোয়ার এসেছে।
যার ফলে লাদাখ জুড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য হোটেল ও হোম স্টে। লেহ্ উপত্যকা থেকে চাংথাং এমনকী জান্সকর এলাকাতেও। যে কারণে চাহিদা বেড়েছে বহু পরিমাণ পানীয় ও ব্যবহার্য জল এবং নির্মাণকাজের জন্য কৃষিজমি। এছাড়াও বিদ্যুৎ ব্যবহার। এখানে এসি মেশিনের দরকার না হলেও রুম হিটার লাগে। তবে গ্রীষ্মকালে ইদানীং গরম পড়তে থাকায় এসির ব্যবহারও সমানুপাতিক হারে বাড়ছে।
পর্যটকদের চাহিদা মেটাতে হোটেল ও হোম স্টেগুলি কূপ খনন করে জল সরবরাহ বজায় রাখতে গিয়ে ভূগর্ভস্থ জলস্তর কমছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এতে ভূগর্ভস্থ এলাকা ফাঁকা হতে থাকায় যে কোনও সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। শুকনো ঠান্ডা প্রকৃতির জন্য লেহ্-তে দিনদিন তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়াও চিনের সঙ্গে গালওয়ান সংঘর্ষের পর থেকে এই অঞ্চলে সেনা মোতায়েনের পরিমাণ বেড়ে গিয়েছে।
সেনা বহর বাড়ায় আরও বেশি পরিমাণে লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিটি শিবিরে অতিরিক্ত জওয়ান, অতিরিক্ত গাড়ি, যুদ্ধ সরঞ্জাম এসে মজুত রয়েছে। যার ফলে হিমবাহের গলন আরও দ্রুত বাড়ছে। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো পর্যটক, সেনা মোতায়েন ও নগরায়নের জেরে কার্বন দূষণের পরিমাণও বেড়ে গিয়েছে। হিমবাহ চাপা পড়ে যাচ্ছে সভ্যতার দূষিত কালি ও ধোঁয়া-ধুলোয়। শ্বেতশুভ্র বরফের উপর ধোঁয়া ধোঁয়া চাদরের মতো দেখা যেতে শুরু করেছে, যা হিমবাহের পক্ষে মারণরোগ। এই ধোঁয়ার চাদর সূর্যের আলো বরফের উপর ছিটকে পড়ার আগেই তা শুষে নিচ্ছে। যে কারণে আগের থেকে অনেক দ্রুত বরফ গলে যাচ্ছে।