শুধু গাজিয়াবাদই বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায়শই মোবাইল কেড়ে নেওয়ায় কিংবা স্মার্টফোন কিনে না দেওয়ায় অভিমানে আত্মঘাতী হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে। বারবার দেখা যাচ্ছে একই দৃশ্য।
.jpeg.webp)
প্রশ্নটা আর শুধু পারিবারিক নয়, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে শিশু-কিশোরদের আদৌ কি স্মার্টফোন বা সোশ্যাল মিডিয়া থাকা উচিত? ছবি এআই সাহায্য নিয়ে তৈরি।
শেষ আপডেট: 7 February 2026 13:12
দ্য ওয়াল ব্যুরো: গাজিয়াবাদে তিন বোনের আত্মহত্যার ঘটনায় গোটা দেশ শিউরে উঠেছে। শুধু গাজিয়াবাদই বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায়শই মোবাইল কেড়ে নেওয়ায় কিংবা স্মার্টফোন কিনে না দেওয়ায় অভিমানে আত্মঘাতী হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে। বারবার দেখা যাচ্ছে একই দৃশ্য। একজন অভিভাবক সন্তানের হাত থেকে স্মার্টফোন কেড়ে নিয়েছেন। মুহূর্তের মধ্যে কিশোর-কিশোরীর মেজাজ বদলে গেছে। কান্না, রাগ, দরজা বন্ধ করে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া— ঘরের এই ছোট ঝগড়াগুলোই আজ বড় সামাজিক প্রশ্নে রূপ নিচ্ছে। প্রশ্নটা আর শুধু পারিবারিক নয়, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে শিশু-কিশোরদের আদৌ কি স্মার্টফোন (Smartphone ban) বা সোশ্যাল মিডিয়া (social media for children) থাকা উচিত?
যা একসময় স্কুল বা পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, সেই বিতর্ক এখন বিশ্বজুড়ে। স্পেন, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা— বিভিন্ন দেশ স্কুলে ফোন নিষিদ্ধ, বয়সভিত্তিক সীমা, সোশ্যাল মিডিয়ায় কড়াকড়ি— সবকিছু নিয়েই ভাবছে। কোথাও নিষেধাজ্ঞা, কোথাও নিয়ন্ত্রণ। এই বিতর্ক ভারতে আরও গভীর, কারণ ভারতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য— বিশ্বের সবচেয়ে তরুণ জনসংখ্যা (young population India) এবং বিশ্বের অন্যতম সস্তা ইন্টারনেট (cheap internet India)।
সাম্প্রতিক গাজিয়াবাদের তিন বোনের মৃত্যুর ঘটনা এই উদ্বেগকে আরও উসকে দিয়েছে। পরিবারের অভিযোগ— স্মার্টফোনের উপর আসক্তি এবং অনলাইন কনটেন্টের মানসিক প্রভাব তাদের ভেঙে দিয়েছিল। এই ধরনের ঘটনা সমাজে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে— অযাচিত ডিজিটাল অভ্যাস কি তরুণ প্রজন্মকে ধীরে ধীরে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে?
ভারতের আর্থিক সমীক্ষা ২০২৫–২৬ (Economic Survey 2025–26) এই উদ্বেগকে পরিসংখ্যান দিয়ে আরও স্পষ্ট করেছে। রিপোর্ট বলছে, দেশের ৮৫.৫ শতাংশ পরিবারে অন্তত একটি স্মার্টফোন রয়েছে এবং ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহার প্রায় সর্বজনীন (smartphone penetration India)। অর্থাৎ আজ প্রশ্ন উঠছে, আর প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার নয়, প্রশ্ন হল— এই নিরবচ্ছিন্ন ডিজিটাল উপস্থিতির মানসিক ও সামাজিক মূল্য কতটা ভয়াবহ?
আর্থিক সমীক্ষা সরাসরি বলছে, শিশু-কিশোরদের মধ্যে ডিজিটাল আসক্তি (digital addiction) একটি বাস্তব আচরণগত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের ফলে মনোযোগ কমে যাচ্ছে, ঘুমের সমস্যা বাড়ছে, উদ্বেগ ও একাকিত্ব বাড়ছে, পড়াশোনায় আগ্রহ কমছে। বহু শিক্ষক বলছেন, অনেক শিক্ষার্থী ফোন ছাড়া কয়েক মিনিটও মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। অনলাইন গেমিং (online gaming addiction) এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সমস্যার বড় অংশ তৈরি করছে সোশ্যাল মিডিয়ার ধাপে ধাপে প্রভাব বৃদ্ধি। সীমাহীন মোবাইল নাড়াচাড়া, শর্ট ভিডিও দেখা, লাইক-ভিত্তিক স্বীকৃতি— এই সবকিছু মানুষের মস্তিষ্কে সুখের হরমোন (Dopamine) বা ফিলগুড প্রবাহ তৈরি করে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও এই প্রভাব প্রবল, কিন্তু কিশোরদের ক্ষেত্রে তা আরও তীব্র, কারণ তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও আত্মসংযমের ক্ষমতা এখনও পুরোপুরি তৈরি হয়নি।
তবে আসক্তির বাইরে আরও একটি নীরব, কিন্তু গভীর বিপদ রয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা (cybersecurity) ও ডেটা নজরদারি (data privacy for children)। একটি শিশু যখন গেম বা অ্যাপ ডাউনলোড করে, তখন সে শুধু ছবি বা বার্তা শেয়ার করছে না। সে দিয়ে দিচ্ছে লোকেশন ডেটা, মুখের ছবি, কণ্ঠস্বর, আচরণগত প্যাটার্ন— যা একটি বিশাল বৈশ্বিক নজরদারি অর্থনীতির (surveillance economy) অংশ হয়ে যাচ্ছে। ভারতে একাধিক এডটেক, গেমিং ও মেসেজিং প্ল্যাটফর্মে ডেটা লিকের ঘটনা ঘটেছে। শিশুরা প্রাইভেসি পলিসি বোঝে না, সম্মতির ভাষা বোঝে না। অনেক অ্যাপ গোপনে তথ্য সংগ্রহ করে এবং তা তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করে। পুরো নিষিদ্ধ করে দিলে কিছুটা ঝুঁকি কমতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এতে ব্যবহার চলে যায় ভিপিএন ও অচেনা প্ল্যাটফর্মে, যেখানে নজরদারি আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিকটি হল অনলাইন গ্রুমিং (online grooming) ও যৌন শোষণ (child exploitation)। বিশ্বজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলি বলছে, শিশুদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল যৌন অপরাধ দ্রুত বাড়ছে। অপরাধীরা এখন অপরিচিত কেউ নয়— তারা বন্ধু সেজে আসে, গেমার সেজে আসে, এমনকী শিক্ষক বা মেন্টর সেজেও। এদেশের মতো সমাজে, যেখানে যৌন নির্যাতন নিয়ে কথা বলা এখনও সামাজিকভাবে সংকোচের বিষয়, সেখানে অনলাইন শিকার আরও নীরবে ঘটে। বহু পরিবার এখনও মনে করে, ডিজিটাল ক্ষতি শারীরিক ক্ষতির মতো গুরুতর নয়— এই ভুল ধারণাই অনেক সময় বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তবু ছবির আরেক দিকও আছে। প্রযুক্তি শুধু ক্ষতিই করছে না, সুযোগও তৈরি করছে। আজ বহু কিশোর-কিশোরী ইনস্টাগ্রামে ব্যবসা করছে, ইউটিউবে কনটেন্ট বানাচ্ছে, ওপেন সোর্স প্রজেক্টে কাজ করছে, ছোট শহর থেকেও গ্লোবাল কোর্স করছে। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে প্রযুক্তি শেখায় সমস্যা সমাধান, ডিজিটাল স্কিল, উদ্যোক্তা মানসিকতা। পুরোপুরি নিষিদ্ধ করলে এই সুযোগগুলোও বন্ধ হয়ে যায়। আর সেই সুযোগ সবচেয়ে বেশি হারায় দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের শিশুরা। ধনী পরিবার সবসময় বিকল্প পথ খুঁজে নেয়, কিন্তু বাকিরা পিছিয়ে পড়ে। ফলে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ সামাজিক বৈষম্য আরও বাড়াতে পারে।
এই কারণেই সরকারগুলো স্মার্টফোন নিষিদ্ধ করা নিয়ে ধন্দে রয়েছে। নিষিদ্ধ ঘোষণা করা সহজ, কার্যকর করা কঠিন। নিয়ন্ত্রণ চাই প্রযুক্তি ও নজরদারিতে। শিক্ষা চাই সময় ও বিনিয়োগে। চিন, ফ্রান্স, স্পেন, অস্ট্রেলিয়া— সবাই মূলত স্কুলভিত্তিক গণ্ডি বেঁধে দিয়েছে, সম্পূর্ণ নিষেধ নয়। দক্ষিণ কোরিয়া রাতের গেমিং কার্ফু তুলে দিয়ে বাবা-মায়েদের নিয়ন্ত্রণের উপর জোর দিয়েছে। এদেশের সরকারও ধীরে ধীরে যাচ্ছে সতর্ক পথে। পরামর্শ, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, ডেটা সুরক্ষা আইন, ডিজিটাল লিটারেসির দিকে। আর্থিক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, দেশে এখনও পর্যাপ্ত তথ্য নেই কোন বয়সে, কোন অঞ্চলে ডিজিটাল আসক্তির প্রভাব কতটা। তাই নীতি নির্ধারকেরা হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে চাইছেন না।
সব মিলিয়ে বাস্তব সমাধান সম্ভবত নিষিদ্ধ করায় নয়, মোবাইলের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে (regulated access)। বয়সভিত্তিক সীমা, ডিফল্ট প্রাইভেসি সেটিং, শিশুদের জন্য আলাদা ডেটা সুরক্ষা আইন, স্কুলে ডিজিটাল শিক্ষা, বাবা-মায়ের সচেতনতা— এই সব মিলিয়ে চলা পথই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর। এটা ঠিক যে, স্মার্টফোন আর তুলে নেওয়া যাবে না। ফলে আমরা কি ভয় থেকে নিষেধাজ্ঞা বেছে নেব, নাকি সামাজিক দায়িত্ব থেকে সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলব? শিশু যেমন জটিল, ডিজিটাল সমাজও তেমন জটিল। তাই নীতিও হতে হবে মানবিক, বাস্তববাদী এবং ভবিষ্যৎমুখী।