ভারতের রাজনীতিতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের Mamata Banerjee) মাস্টারস্ট্রোক লক্ষ্মীর ভাণ্ডার (Lakshmir Bhandar) প্রকল্পের পর দেশের একের পর এক রাজ্যে শুরু হয়েছে মহিলাদের সরাসরি নগদ ভাতা (Direct Cash Transfer) দেওয়ার হিড়িক।

চড়চড় করে বাড়ছে খয়রাতির রাজনীতির প্রতিযোগিতা। আর চাপ বাড়ছে সরকারি কোষাগারের উপর।
শেষ আপডেট: 6 February 2026 12:51
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভোটার হলেন লক্ষ্মী। তাই ভোটারের ঘরের ভাণ্ডার ভরে রাখলেই মুঠোয় আসবে ভোট। তাতে সরকারের আর্থিক ‘জান’ যায় যাক, সরকারে টিকে থাকার ‘মান’ যেন না যায়। আর সেকারণেই ভারতের রাজনীতিতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের Mamata Banerjee) মাস্টারস্ট্রোক লক্ষ্মীর ভাণ্ডার (Lakshmir Bhandar) প্রকল্পের পর দেশের একের পর এক রাজ্যে শুরু হয়েছে মহিলাদের সরাসরি নগদ ভাতা (Direct Cash Transfer) দেওয়ার হিড়িক। বিহারে বিধানসভা ভোটের মুখে বিজেপি নেতৃত্বাধীন নীতীশ কুমার সরকার মহিলা স্বরোজগারের উদ্দেশ্যে সরাসরি অ্যাকাউন্টে ১০ হাজার টাকা দেন। যাকে চ্যালেঞ্জ করে বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টে আর্জি দাখিল করেছেন জনসুরজ পার্টির নেতা প্রশান্ত কিশোর।
শুধু এই কয়েকটিই নয়, মহারাষ্ট্রে লাডলি বহেনা (Ladli Behna), ওড়িশায় সুভদ্রা যোজনা (Subhadra Yojana), দিল্লিতে মহিলা সমৃদ্ধি (Mahila Samriddhi)— সর্বত্রই ভোটের আগে মহিলাদের হাতে টাকা পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। মমতা এবার লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে টাকা বাড়িয়ে দেড় হাজার করে দেবেন বলেছেন। অন্যদিকে, বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছেন, ক্ষমতায় এলে বিজেপি সরকার দেবে ৩ হাজার টাকা করে। এই ভাবে চড়চড় করে বাড়ছে খয়রাতির রাজনীতির প্রতিযোগিতা। আর চাপ বাড়ছে সরকারি কোষাগারের উপর। বর্ধিত অর্থের জন্য রাজ্য বাজেটে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পের মোট বরাদ্দ আরও ১৫ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষ থেকেই এই বরাদ্দ কার্যকর হবে।
খয়রাতি (Freebie) বলতে সাধারণত এমন সরকারি সুবিধা বা প্রতিশ্রুতিকে বোঝানো হয়, যা স্বল্পমেয়াদি (short-term), জনপ্রিয়তামুখী (populist) এবং যার পিছনে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বা উন্নয়নমূলক দৃষ্টিভঙ্গি থাকে না। এগুলি মূলত ভোটারদের তাৎক্ষণিক ‘প্রলুব্ধ’ করার উদ্দেশ্যে ঘোষণা করা হয়।
খয়রাতি বা ভাতা প্রদান ও প্রকৃত কল্যাণমূলক প্রকল্প (Welfare Measures)-এর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কল্যাণমূলক প্রকল্প সংবিধানের রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি (Directive Principles of State Policy)-এর সঙ্গে যুক্ত। যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তা ইত্যাদি ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। অন্যদিকে, ভাতা হল সাধারণত এমন সুবিধা, যা উৎপাদনশীলতা বাড়ায় না, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে না এবং ভবিষ্যতে আর্থিক চাপ (fiscal burden) বাড়াতে পারে।
রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া (Reserve Bank of India) এই ধরনের ঘোষণাকে সংজ্ঞায়িত করেছে:
“A public welfare measure that is provided free of charge”— অর্থাৎ এমন জনকল্যাণমূলক সুবিধা যা বিনামূল্যে দেওয়া হয়। তবে RBI একই সঙ্গে খয়রাতি ও দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণমূলক প্রকল্পের মধ্যে পার্থক্য টেনেছে। RBI-র মতে, সব বিনামূল্যের সুবিধাই প্রকৃত কল্যাণমূলক প্রকল্প নয়। ভারতের নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India) এখনও সরকারি অর্থ বিলিবণ্টনের কোনও আইনি ও নির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেয়নি। ফলে রাজনৈতিক ঘোষণাগুলির উপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণের অভাব থেকেই যাচ্ছে।
তামিলনাড়ুর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কে কামরাজ (K. Kamaraj) প্রথম অবৈতনিক শিক্ষা ও স্কুলে বিনামূল্যে মিড-ডে মিল চালু করেন (1954-1963)। উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার প্রসার ও শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা। ডিএমকের (DMK) প্রতিষ্ঠাতা সি এন আন্নাদুরাই (C. N. Annadurai) নির্বাচনী প্রচারে (1967) ১ টাকায় ৪.৫ কেজি চাল দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এটি ছিল রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে খয়রাতির বড় ব্যবহার। ২০০৬ সালে ডিএমকে সরকার রাজ্যের ভোটে ভোটারদের রঙিন টিভি দেওয়ার ঘোষণা করেছিল। এখান থেকেই ভোটব্যাঙ্ক কেনার রাজনীতি নতুন মাত্রা পায়।
এরপর থেকে শুরু হয় রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা। এক দল খয়রাতির সুবিধা দিলে, অন্য দল তার চেয়েও বেশি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। গ্যাসের চুল্লি, নগদ টাকা, জমি, স্মার্টফোন, সাইকেল, মাতৃত্ব ভাতা— এই সবই ধীরে ধীরে নির্বাচনী অস্ত্র হয়ে ওঠে। এই প্রতিযোগিতামূলক খয়রাতির সংস্কৃতিকে অনেক অর্থনীতিবিদ “Race to the bottom” বলেছেন, যেখানে ভোট জেতার লড়াইয়ে রাজ্যের আর্থিক স্থিতি (fiscal stability) সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে পড়ে। এবার প্রশ্ন উঠছে, এই ধারাই কি ধীরে ধীরে বেকার ভাতার (Unemployment Allowance) দিকে এগোচ্ছে? রাজ্যে রাজ্যে কি ভাতা-র রাজনীতি (Freebie Politics) দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে ফেলছে?
পশ্চিমবঙ্গে লক্ষ্ণীর ভাণ্ডারের আওতায় গ্রামীণ মহিলারা মাসে ১,০০০ টাকা এবং শহরের মহিলারা ১,৫০০ টাকা পাচ্ছেন। আগামী নির্বাচনের মুখে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছেন, এই ভাতা আরও বাড়ানো হবে। অন্যদিকে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) সরাসরি ৩,০০০ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভাতার রাজনীতিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন।
মহারাষ্ট্রে একনাথ শিন্ডে (Eknath Shinde) সরকারের লাডলি বহেনা প্রকল্পে মহিলাদের মাসে ১,৫০০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। ওড়িশায় নবীন পট্টনায়েক (Naveen Patnaik) সরকারের সুভদ্রা যোজনায় একইভাবে নগদ সহায়তা পৌঁছচ্ছে লক্ষ লক্ষ পরিবারে। দিল্লিতে অরবিন্দ কেজরিওয়াল (Arvind Kejriwal) মহিলা সমৃদ্ধি প্রকল্পে মহিলাদের জন্য বিশেষ ভাতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই ধারাবাহিক নগদ বণ্টন কি সত্যিই দারিদ্র্য দূরীকরণ (Poverty Alleviation), না কি ভোট কেনার কৌশল (Vote Bank Politics)? এই বছর কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক সমীক্ষা (Economic Survey 2025-26) স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছে এই ভাতা সংস্কৃতি নিয়ে। সমীক্ষার মতে, অতিরিক্ত খয়রাতি প্রকল্প (Freebie Schemes) রাজ্যের আর্থিক শৃঙ্খলা (Fiscal Discipline) ভেঙে দিতে পারে। উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ (Productive Investment) না বাড়িয়ে শুধু ভাতা দিলে কর্মসংস্থান (Job Creation) হবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে রাজ্যগুলির ঋণের বোঝা (Public Debt) বাড়বে।
সমীক্ষায় আরও বলা হয়েছে, সরাসরি নগদ সহায়তা স্বল্পমেয়াদে জনপ্রিয় হলেও, এতে মানুষ কাজের বদলে ভাতার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। ফলে শ্রমবাজারে (Labour Market) অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের একাংশ বলছেন, সামাজিক সুরক্ষা (Social Security) জরুরি হলেও তা যদি দক্ষতা উন্নয়ন (Skill Development) ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত না হয়, তবে এই ভাতা প্রকল্প ভবিষ্যতে আর্থিক ফাঁদ (Fiscal Trap) হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সম্প্রতি ভারতের সর্বোচ্চ আদালত (Supreme Court of India) জানিয়ে দিয়েছে, রাষ্ট্র যখন জনকল্যাণ (public welfare) বা সমাজগত উন্নয়ন-ভিত্তিক ব্যয়ে অর্থ বরাদ্দ করে, সেটা বৈধ। কিন্তু, নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে ভোটমুখী খয়রাতিতে (freebies) অযৌক্তিকভাবে সরকারি তহবিল ব্যবহার করা হলে তা অর্থনৈতিক ও সংবিধানগত দিক থেকে একটি গুরুতর বিষয় বিবেচনা করা হবে এবং সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বিচারপতিরা বলেন, শুধুমাত্র ভোটের জন্য ভাতা বা সহায়তা দিতে গিয়ে কি ভবিষ্যতে রাজ্যের অর্থনীতি বা বাজেট (state finances) দুর্বল হচ্ছে, তা বিচার করা গুরুত্বপূর্ণ।
আদালতে এক জনস্বার্থ মামলায় (Public Interest Litigation) দাবি করা হয়েছিল রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের সময় বিভিন্ন ভাতা ও উপহার ঘোষণা করে জনগণের ভোট আদায় করছে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের (Chief Justice Surya Kant) নেতৃত্বে বেঞ্চ বলেছে, খয়রাতি বা ভাতা এবং প্রকৃত জনকল্যাণ প্রকল্পের মধ্যে যুক্তিসঙ্গত পার্থক্য থাকা উচিত। আদালত স্মরণ করিয়েছে যে সঠিকভাবে জনকল্যাণ-ভিত্তিক ব্যয় যেমন শিক্ষা (education), স্বাস্থ্য (health care), সামাজিক নিরাপত্তা (social security) ইত্যাদিতে বিনিয়োগ নাগরিকদের ক্ষমতায়ন করে। তেমনই শুধুমাত্র নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে নগদ বা বিনামূল্যে বণ্টন যদি তহবিলের উপর দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলে, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
বিচারপতিরা উল্লেখ করেছেন যে, রাষ্ট্রের সংবিধানভিত্তিক কর্তব্য হল জনকল্যাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা। কিন্তু একই সঙ্গে তহবিল ব্যবহারের দায়িত্বশীলতা (financial accountability) বজায় রাখা আর্থিক ভারসাম্য fiscal discipline) রক্ষায় জরুরি। আদালত এই বিষয়ে একটি বিশেষ বেঞ্চ বা বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের কথাও ভাবছে, যাতে সুস্পষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করা যায়। যেখানে কখন, কোন ব্যয় “জনকল্যাণ বিনিয়োগ” এবং কখন “খয়রাতি বা ভাতা” হিসেবে গণ্য হবে।
প্রচলিত রাজনৈতিক খরচ যেমন ইলেকট্রনিক ডিভাইস বিতরণ, নগদ ভাতা বা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি কি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদে জনগণের কল্যাণে ব্যবহৃত হচ্ছে, নাকি তা সংশ্লিষ্ট দলের ভোটব্যাঙ্ক বাড়াচ্ছে— এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার চেষ্টা এই সিদ্ধান্তে ফুটে উঠেছে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার যে রাজনৈতিকভাবে সফল, তা নিয়ে বিতর্ক নেই। কিন্তু সেই মডেল যদি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, তবে কি ভারত ধীরে ধীরে ‘কল্যাণকর রাষ্ট্র’ থেকে ‘ভাতা নির্ভর রাষ্ট্রে’ (Welfare to Freebie State) পরিণত হবে? এই প্রশ্নই এখন রাজনীতির কেন্দ্রে।