রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনানন্দের কবিতাকে বলেছেন ‘চিত্ররূপময়’। বুদ্ধদেব বসু বলেছেন ‘নির্জনতম কবি’।

মানুষটি লঘুস্বরে উত্তর দিলেন– জীবনানন্দ দাশ। ১৮৩, ল্যান্সডাউন রোড।
শেষ আপডেট: 22 October 2025 10:51
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৪ অক্টোবর, দিব্য সুস্থ। তিনি বেড়াতে যাওয়ার জন্য গিয়েছিলেন সুবোধ রায়ের বাড়ি। সুবোধ রায় ইনফ্লুয়েঞ্জার জেরে কাহিল থাকার জন্য একা বের হয়েছিলেন হাঁটতে। হেমন্ত ঋতুতে তিনি ল্যান্সডাউন রোড ধরে একা একা হেঁটে বেড়াতেন। সুবোধ রায়ও বের হচ্ছিলেন একটু দেরি করেই, হঠাৎ তাঁর কাছে ছুটে এলেন একটু আগেই বেড়াতে বের হওয়া মানুষটির ছেলে রঞ্জু। এসে বললে, জানেন সর্বনাশ হয়েছে। বাবাকে এইমাত্র হাসপাতাল নিয়ে গেল। উৎকণ্ঠায় কালো রঞ্জুর মুখ।
রঞ্জুর কাছেই তিনি জানলেন রঞ্জুর বাবা হেঁটে ফেরার পথে রাসবিহারী অ্যাভিনিউ-র কাছে 'জলখাবার', 'জুয়েল হাউসে'র সামনে রাস্তা অন্যমনস্কভাবে পার হচ্ছিলেন। চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে রাস্তার মাঝের ট্রাম লাইন পার হলেন। এদিকে চলন্ত ডাউন বালিগঞ্জ ট্রাম তখনও তাঁর থেকে ছিল পঁচিশ-ত্রিশ হাত দূরে। অবিরাম ঘণ্টা বাজানো ছাড়াও সতর্কবাণী ঘোষণা করে বারবার ড্রাইভার সাবধান করে দিচ্ছেন। অবশ্যম্ভাবীভাবে ট্রাম এসে পড়ল মানুষটির সামনে। ব্রেক কষে গাড়ি থামালেন ড্রাইভার। কিন্তু ততক্ষণে তাঁর দেহ আটকে গেছে ক্যাচারের ভেতরে। তাঁকে টেনে-হিঁচড়ে বের করলেন সবাই।
ধরাধরি করে সবাই তাঁকে নিয়ে এলেন রাস্তার ওপারে। রাস্তার পথচারী ও দোকানদারই মুখে-হাতে জল দিলেন, কেউ বাতাস করলেন। কেউ দোকান থেকে বরফ এনে তাঁর আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে বুলিয়ে দিলেন। ধীরেধীরে তাঁর সংজ্ঞা ফিরল, প্রশ্ন করলেন সামনে থাকা জটলাকে, কী হয়েছে? আমি এখানে কেন? এক ভদ্রলোক প্রশ্ন করলেন কবিকে, আপনার নাম কী? ঠিকানা কী? মানুষটি লঘুস্বরে উত্তর দিলেন– জীবনানন্দ দাশ। ১৮৩, ল্যান্সডাউন রোড। সবাই ধরাধরি করে একটা ট্যাক্সিতে তুললেন। ট্যাক্সি চলল শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালের দিকে। ২নং ওয়ার্ড।
তিনি রবীন্দ্র পরবর্তী যুগের আধুনিক কবি। তাঁর কবিতা বর্তমান কবিদের প্রভাবিত করলেও জীবদ্দশায় তিনি তা দেখে যেতে পারেননি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনানন্দের কবিতাকে বলেছেন ‘চিত্ররূপময়’। বুদ্ধদেব বসু বলেছেন ‘নির্জনতম কবি’। এছাড়াও ‘রূপসী বাংলার কবি’, ‘তিমির হননের কবি’ উপনামগুলো তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তিনি রবীন্দ্র পরবর্তী যুগের আধুনিক কবি।
জীবনানন্দ দাশের মৃত্যু নিয়ে রয়েছে রহস্য। কবির মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা না আত্মহত্যা এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। পৃথিবীতে যে কবি-সাহিত্যিকদের মৃত্যু নিয়ে রহস্য ঘনীভূত হয়েছে সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে জীবনানন্দ দাশের নাম। ২২ অক্টোবর শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে মারা যাওয়ার পর থেকেই তাঁর মৃত্যু রহস্যময়তা সৃষ্টি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যে জানা যায়, জীবনানন্দ দাশ যখন ট্রাম লাইন পার হচ্ছিলেন তখন তাঁর হাতে ডাব ছিল। একজন মানুষ হাতে ডাব নিয়ে আত্মহত্যা করতে পারেন কি না এ নিয়ে প্রশ্ন থাকাটাই স্বাভাবিক। যদিও জীবনানন্দ গবেষক ভূমেন্দ্র গুহ বলেছেন, কলকাতার ইতিহাসে জীবনানন্দই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ট্রাম দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন। তাঁর লেখাগুলো পড়লেই বোঝা যায়, তিনি মৃত্যুচিন্তায় চিন্তিত ছিলেন। এক্ষেত্রে এটা আত্মহত্যা হলেও হতে পারে।
রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের প্রয়াণ দিবসে তাঁকে জানাই আন্তরিক শ্রদ্ধাঞ্জলি।
— Mamata Banerjee (@MamataOfficial) October 22, 2025
কবির স্ত্রী লাবণ্য দাশের কথায় আত্মহত্যার বিষয়টি সামনে চলে আসে। তিনি লিখেছেন, মৃত্যুর পরপার সম্পর্কে ওর একটা অদ্ভুত আকর্ষণ ছিল। মাঝে মাঝেই ওই কথা বলতেন। বলতেন, মৃত্যুর পরে অনেক প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা হয়। আর খালি বলতেন, আচ্ছা বলতো আমি মারা গেলে তুমি কী করবে? (আমার স্বামী জীবনানন্দ দাশ, লাবণ্য দাশ)। আজীবন দুঃখ-কষ্ট অভাবের সঙ্গে সংগ্রাম করা কবি ব্যক্তিগত জীবনে দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত ছিলেন। অনেক চেষ্টার পরেও যেন আর্থিক সমস্যার সমাধান হচ্ছিল না। অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। তাই এই দুর্ঘটনাকে স্বাভাবিক বলতে নারাজ অনেকে।
১৭ অক্টোবর, ১৯৫৪, শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে ২নং ওয়ার্ডে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকছেন কবি ও সম্পাদক সঞ্জয় ভট্টাচার্য। পরিচিত কয়েকজনের ভিড় পার হয়ে তিনি গিয়ে বসলেন মুমূর্ষু একজন রোগীর সামনে। রোগীর কোমর থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত ব্যান্ডেজ বাঁধা। একটু আগেই মেডিকেল কলেজের ছাত্র ভূমেন গুহ রোগীকে দেখে গেছেন। সজনীকান্ত দাশের বিশেষ অনুরোধে পরেরদিন রোগীকে দেখতে আসবেন ডঃ বিধানচন্দ্র রায়। হঠাৎ সঞ্জয় ভট্টাচার্যের হাত ধরে রোগী বললেন, এখানে ভালো লাগছে না। একটা কমলালেবু খেতে পারব?
২২ অক্টোবর, শুক্রবার, সকাল থেকেই কথা বন্ধ হয়ে গেল তাঁর। কিছুই খাওয়ানো গেল না। ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে আনা রক্ত বৃথায় পড়ে রইল। পত্নী লাবণ্য দাশ আর সামলাতে পারলেন না নিজেকে। জীবনের এত সংগ্রাম এক মুহূর্তে এসে থমকে দাঁড়াল। তখন এগোরোটা পঁয়ত্রিশ, তিনি সব আশা-ভরসাকে ব্যর্থ করে পাড়ি দিলেন রূপাতীত অন্ধকারে নাকি আলোর দেশে?
আইন অনুযায়ী তাঁর মৃত্যু যেহেতু দুর্ঘটনায়, ফলে পোস্টমর্টেম তো হতে হবে। তাই কবির মৃতদেহ নিয়ে যেতে হাসপাতালে এসে দাঁড়িয়েছিল কলকাতা পুলিশ। এ সময় জীবনানন্দের চিরকালের প্রায়-শত্রু ও সমালোচক, ‘শনিবারের চিঠি’র সজনীকান্ত দাস আবার দাঁড়ালেন ত্রাতার ভূমিকায়। এর আগে জীবনানন্দ যখন দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন, সে সময় শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে সজনীকান্তের দৌড়ঝাঁপেই মূলত সুচিকিৎসার ব্যবস্থা হয় জীবনানন্দের। এবারও তিনিই নিলেন মুখ্য ভূমিকা। মূলত তাঁর তদবির ও কলকাতার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের পরোক্ষ হস্তক্ষেপে পোস্টমর্টেম থেকে নিবৃত্ত হয় পুলিশ।
জীবনানন্দ দাশের জীবনীকারের মধ্যে অন্যতম প্রধান গোপালচন্দ্র রায় তাঁর ‘জীবনানন্দ’ বইতে লিখেছেন অসুস্থ জীবনানন্দের সাথে আমার শেষ দেখা হয়েছিল আকাশবাণীর পুরনো বাড়িতে কবিসভায়। আমি জীবনানন্দের সেই উদভ্রান্ত অন্যমনস্ক দৃষ্টিতে আহত হয়েও ভাবতে পারিনি যে, তাঁর শেষদিন আসন্ন। এই সাংঘাতিক অন্যমনস্কতাই তাঁর কাল হল। কবি বুদ্ধদেব বসু জীবনানন্দ দাশের শ্রদ্ধাবাসরে বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের পর বাংলাদেশে জীবনানন্দ দাশের মতো এতো বড়ো প্রতিভাবান, প্রতিপত্তিশালী কবির আর মৃত্যু ঘটেনি।