বাঙালির ভূতের গল্পে ভয় যেমন আছে, তেমনই আছে এক ধরনের কোমল হাস্যরস। টেনি-পিনডির গল্পে সেই দুই মিশ্রণ এত নিখুঁত যে পাঠক ভয় পেয়ে হেসে ফেলেন।

গ্রাফিক্স: দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 19 October 2025 16:33
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলা সাহিত্য (Bengali Literature) মানেই এক অনন্য জগৎ, যেখানে প্রেম, প্রকৃতি, সমাজ— সব কিছুর পাশাপাশি ভূতেরাও (Bhuter Golpo) পেয়েছে এক বিশেষ জায়গা। কবি থেকে কথাসাহিত্যিক, প্রায় প্রত্যেকেই কোনও না কোনও ভাবে কলম ধরেছেন অশরীরী নিয়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Rabindranath Tagore) থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের লেখক, সবার লেখাতেই ভূতের ছায়া কখনও ভয় জাগায়, কখনও হাসায়।
ভূতের গল্প (Horror Story) বাংলার সাহিত্যে শুধু পাঠকের বিনোদনের জন্য নয়, বরং মানুষের মনের অজানা দিকগুলো ছুঁয়ে দেখার এক সাহিত্যিক প্রয়াসও বটে। কখনও বিদেশি দানব ড্রাকুলা বা নেকড়েমানব ঢুকে পড়েছে আমাদের গল্পে, আবার কখনও আমাদের আপন ব্রহ্মদৈত্য, শাকচুন্নি বা ডাকিনীই হয়ে উঠেছে কাহিনির নায়ক।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথও এই ধারার বাইরে ছিলেন না। তাঁর ‘গল্পগুচ্ছ’-এর অনেক গল্পেই দেখা মেলে সূক্ষ্ম এক ভৌতিক আবহের। কখনও সরাসরি ভূত এসে হাজির হয়, আবার কখনও পরিবেশ, ভাষা ও চরিত্রের মনস্তত্ত্বই তৈরি করে রহস্যময়তা। তবে রবীন্দ্রনাথের ভূত কখনোই রক্তচক্ষু বা ভয়ঙ্কর চেহারার নয়। তিনি ভয় দেখানোর জন্য ভূত আনেননি, বরং মানুষের ভেতরের ভয়, একাকিত্ব ও অজানাকে প্রকাশ করেছেন ভূতের রূপকে ব্যবহার করে।
তবে আজকের আলোচনার বিষয় দুই দাদাকে নিয়ে। প্রথমজন, গড়ের মাঠের কিংবদন্তি। সেই গোরা সার্জেন্টকে ঠেঙিয়ে স্কুল-ফাইনালে যিনি একা হাতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। দ্বিতীয়জন, ব্রাজিল-ফেরত ফুটবলার, বিলেত ঘুরে এলেও যাঁকে মেমসাহেবরা ‘ম্যারি মি’ বলে আকুতি জানিয়েছিলেন।
পাঠকদের আলাদা করে আর এঁদের পরিচয় দেওয়ার দরকার পড়ে না। দুই দাদা আর কেউ নন, ভজহরি মুখোপাধ্যায় ও প্রদীপ নারায়ণ দত্ত। সহজে চেন যায় টেনি আর পিনডি নামে। টেনিদার ‘দশাননচরিত’ আর পিনডিদার ‘মানবিক ভূত’— বাঙালির সাহিত্যরসে ভয়ের সঙ্গে হাসির মিশেল এনে দিয়েছে অনবদ্যভাবে।
নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের টেনিদা লিখেছিলেন এক চমকপ্রদ কাহিনি, ‘দশাননচরিত’। গল্পের নায়ক দশানন, এক সময় কলকাতার দুর্ধর্ষ পকেটমার। ব্রিটিশ পুলিশ তাকে নির্বাসন দিল সুন্দরবনে, বাঘের সঙ্গে লড়াই করতে করতে সে গিয়ে পড়ল এক ভূতুড়ে কেল্লায়। সেখানে দেখা পেয়ে যায় মনসবদার জবরদস্ত খাঁ, যিনি এক মুঠো মণিমুক্তো দেখিয়ে রাতারাতি মিলিয়ে গেলেন।
পরদিন দশানন সেই মণিমুক্তো নিয়েই দেশে ফিরল, দানধ্যান করল, পুকুর কাটল, অতিথিশালা বানাল, এবং শেষ পর্যন্ত “মহাপুরুষ” হয়ে উঠল। প্যালারাম বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করেছিল, “টাকা-পয়সা পেল কোথায়?” টেনিদার তির্যক উত্তর, “ভূতের পকেট মেরেছে!” বাঙালির মগজ থেকে বেরোনো এই ধরণের কল্পনা সত্যিই অদ্ভুত। অন্তত ভূতের পকেট মারা তো বটেই।
প্রদীপনারায়ণ দত্ত, ওরফে পিনডিদাকে নিয়ে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ভয় আর কৌতুককে এমনভাবে মিশিয়েছিলেন যে পাঠকের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলেও মুখে হাসি ফুটত। তাঁর গল্প ‘মানবিক ভূত’-এর মঞ্চ বিদেশ বিভূঁই, এক হন্টেড কাসল। একরাতে পিনডি, তাঁর ভাইঝি জুলি এবং এক মেম প্রতিবেশি সেখানে ভৌতিক উপদ্রবের মুখে পড়লেন।
কিন্তু পিনডিদা ভয় পাননি। ঠান্ডা জলে ভূতকে স্নান করিয়ে শান্ত করলেন! পরদিন সকালে বাগানে দেখা গেল সেই ভূত, নাম তার মাইকেল, নাক টানছে কনকনে হাওয়ায়। জানাল, সে ভূতের সমাজে আর মুখ দেখাতে পারছে না। এমনই নাকানি চোবানি কথা, যে কারণে তার প্রেস্টিজ গেছে! তাই আত্মহত্যা করতে এসেছে।
হ্যাঁ, ভূতই আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে। পিনডি বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলেন। মানুষের সমাজে যেমন মান-সম্মানের প্রশ্ন থাকে, ভূতের সমাজেও যে আছে, তা কে জানত! শেষ পর্যন্ত মাইকেল ভূত নিজেই নিজের কাহিনির ইতি টানে, এবং সেই কাসল থেকে ঘুচে যায় হন্টেড বদনাম।
বাঙালির ভূতের গল্পে ভয় যেমন আছে, তেমনই আছে এক ধরনের কোমল হাস্যরস। টেনি-পিনডির গল্পে সেই দুই মিশ্রণ এত নিখুঁত যে পাঠক ভয় পেয়ে হেসে ফেলেন। একদিকে ভূতের পকেট মারার গল্প, অন্যদিকে ভূতের আত্মহত্যা, দুইয়ের মাঝখানে মানবিকতার রেশটুকু রয়ে যায়।