ট্রাম্প ২.০ (Trump 2.0)-এর মেয়াদ শেষ হতে এখনও বাকি ১,০৯৬ দিন। শুধু মার্কিন নাগরিকরাই নন, বিশ্ববাসী এর মধ্যেই দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছেন যে, আরও তিন বছরের বেশি সময় ট্রাম্পে খেপামি ও তাঁর প্রশাসনের (Trump administration) তুঘলকি কর্মকাণ্ড সহ্য করতে হবে!
.jpeg.webp)
ছবি এআই দিয়ে তৈরি করা।
শেষ আপডেট: 21 January 2026 15:53
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) দ্বিতীয়বার হোয়াইট হাউসে (White House) বসেছেন ঠিক ৩৬৫ দিন আগে। অর্থাৎ ট্রাম্প ২.০ (Trump 2.0)-এর মেয়াদ শেষ হতে এখনও বাকি ১,০৯৬ দিন। শুধু মার্কিন নাগরিকরাই নন, বিশ্ববাসী এর মধ্যেই দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছেন যে, আরও তিন বছরের বেশি সময় ট্রাম্পে খেপামি ও তাঁর প্রশাসনের (Trump administration) তুঘলকি কর্মকাণ্ড সহ্য করতে হবে! প্রতিদিনই নতুন বিতর্ক, নতুন উত্তেজনা— শুধু আমেরিকার জন্য নয়, গোটা বিশ্বের জন্যই। তাই এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, এই বাকি দিনগুলো কি ট্রাম্পই প্রেসিডেন্ট থাকবেন?
ট্রাম্পের প্রায় সীমাহীন ক্ষমতার (unbridled power) উপর সবচেয়ে বড় লাগাম আসতে পারে চলতি বছরে আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে (US midterm elections)। এই নির্বাচনই ঠিক করে দেবে, কংগ্রেসের (Congress) নিয়ন্ত্রণ থাকবে কার হাতে? ট্রাম্প, যিনি সবসময় অন্যদের উদ্বেগে ফেলতে ভালোবাসেন, এখন তাঁকেই দেখা যাচ্ছে কিছুটা দুশ্চিন্তায়। ৩ নভেম্বর হতে চলা মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে তিনি প্রকাশ্যেই অস্বস্তি দেখিয়েছেন। রয়টার্সকে (Reuters) দেওয়া সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তিনি দু’বার বলেছেন, তাঁর এত ‘সাফল্যের’ পর নাকি নির্বাচনই হওয়া উচিত নয়। যদিও হোয়াইট হাউস পরে জানায়, তিনি ‘মজা করেই’ বলেছেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে ঠিক হবে মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে। এই মুহূর্তে রিপাবলিকানদের (Republicans) সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে, তবে অনেক জায়গাতেই সেটা খুব সামান্য ব্যবধানে। হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস বা জনপ্রতিনিধিসভায় (House of Representatives) রিপাবলিকানদের ২১৮টি আসন, ডেমোক্র্যাটদের (Democrats) ২১৩টি, আর চারটি আসন খালি। মার্কিন সংসদের উচ্চকক্ষ সেনেট (Senate) রিপাবলিকানদের দখলে ৫৩টি আসন, ডেমোক্র্যাটদের ৪৫টি, আর দু’জন নির্দল সদস্য (Independents) ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে রয়েছেন।
২০২৬ সালের নির্বাচনে মোট ৩৫টি সেনেট আসন এবং হাউসের সব ৪৩৫টি আসনেই ভোট হবে। ফলে ফলাফলে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যেতে পারে, আর ট্রাম্পের ডানা কাটা পড়তে পারে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকানরা ভালো ফল করলেও, ২০২৬-এ যে পথ একদম মসৃণ হবে না, তা ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার রেখাচিত্র দেখলেই বোঝা যায়।
২০২৬ সালের জানুয়ারি অনুযায়ী রিয়ালক্লিয়ারপোলিংয়ের (RealClearPolling) হিসাবে ট্রাম্পের গড় জনপ্রিয়তা ৪২.৪ শতাংশ, আর অসন্তুষ্টির হার ৫৫.৬ শতাংশ। এটা ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে প্রায় ৫০ শতাংশ ছিল। মর্নিং কনসাল্ট (Morning Consult) দেখাচ্ছে ৪৬ শতাংশ, সিএনএন (CNN) দেখাচ্ছে মাত্র ৩৯ শতাংশ। এই সংখ্যা তাঁর প্রথম মেয়াদের গড় ৪২.৮ শতাংশের কাছাকাছি, আর জো বাইডেনের (Joe Biden) সামগ্রিক রেটিং ৪৩.২ শতাংশের মতো ছিল।
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি কমেছে তাঁর শুল্ক নীতি (tariff policies) আর আক্রমণাত্মক বিদেশনীতির (aggressive foreign strategies) কারণে। সাম্প্রতিক ঘটনা হল, গ্রিনল্যান্ড (Greenland) দখলের কথা, তার আগে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে (Nicolas Maduro) সরানোর ঘটনা। ক্ষমতায় আসার এক বছরের মধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসন প্রায় সব দেশের উপর চড়া শুল্ক বসিয়েছে। এতে যেমন অন্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্যে সমস্যা হয়েছে, তেমনই আমেরিকার আমদানির গড় শুল্ক হার ২ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ১৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা তিরিশের দশকের পর সবচেয়ে বেশি। এর ফলে প্রতিটি পরিবারকে বছরে গড়ে ১,১০০ থেকে ১,৬০০ ডলার বেশি খরচ করতে হচ্ছে।
পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকনমিক্স (Peterson Institute for International Economics) বলছে, এই শুল্ক নীতি ২০২৫ সালে আমেরিকার বৃদ্ধি ০.২৩ শতাংশ কমাবে, আর ২০২৬ সালে কমাবে ০.৬২ শতাংশ। সঙ্গে বাড়াবে মূল্যস্ফীতি (inflation)। এদিকে ট্রাম্পের আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বেশি মনোযোগ দেওয়ায় দেশের ভেতরের সমস্যা, যেমন— স্বাস্থ্য খরচ (healthcare costs) আর আর্থিক বৈষম্য (economic inequality) উপেক্ষিত হচ্ছে বলে সমালোচনা বাড়ছে।
ব্যুরো অফ লেবার স্ট্যাটিসটিক্সের (Bureau of Labor Statistics) তথ্য অনুযায়ী, অর্থনীতি নিয়ে তাঁর অনুমোদন নেমে এসেছে প্রায় ৩৭ থেকে ৪৪ শতাংশে। অভিবাসন (immigration) সামলানো নিয়েও রেটিং ৩৮ থেকে ৪৮ শতাংশের মধ্যে। বেকারত্বের হার (unemployment) ২০২৪ সালের শেষে ছিল ৪.১ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের নভেম্বরে বেড়ে ৪.৬ শতাংশ হয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি এখন ২.৭ শতাংশ থাকলেও, বিশেষজ্ঞরা বলছেন এর প্রভাব ২০২৬ সালে আরও বাড়তে পারে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের (Pew Research Centre) সমীক্ষায় ৫৫ শতাংশ দেশবাসী বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদে শুল্ক নীতির প্রভাব নেতিবাচক হবে।
তথ্য বলছে, গত ৮০ বছরের বেশি সময় ধরে প্রায় সব মধ্যবর্তী নির্বাচনেই হোয়াইট হাউসে থাকা দলের আসন কমেছে। অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম দ্য কনভারসেশন (The Conversation)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই প্রেসিডেন্টের দল হাউসে আসন হারিয়েছে। ১৯৪৬ সালের পর থেকে ২০টি মধ্যবর্তী নির্বাচন হয়েছে। এর মধ্যে ১৮ বারই প্রেসিডেন্টের দল হেরেছে। অর্থাৎ রিপাবলিকানদের বর্তমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখা কঠিন। বিশেষ করে যখন প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা ৫০ শতাংশের নীচে নামে, তখন প্রায় নিশ্চিতভাবেই আসন কমে। হ্যারি ট্রুম্যান (Harry Truman) থেকে শুরু করে প্রায় সব প্রেসিডেন্টই এই পরিস্থিতিতে হেরেছেন।
শুধু দু’টি ব্যতিক্রম আছে। ১৯৯৮ সালে বিল ক্লিনটন (Bill Clinton)-এর সময় ডেমোক্র্যাটরা পাঁচটি আসন বাড়িয়েছিল, কারণ তখন অর্থনীতি ভালো ছিল আর মানুষ তাঁর ইমপিচমেন্টের বিরোধিতা করেছিল। আর ২০০২ সালে ৯/১১-এর পর জনপ্রিয়তার ঢেউয়ে জর্জ ডব্লু বুশ (George W Bush) আটটি আসন বাড়াতে পেরেছিলেন।
তাই প্রশ্ন একটাই, ২০২৬-এ কি ইতিহাস আবার ফিরবে? দ্য কনভারসেশনের বিশ্লেষক রবার্ট এ স্ট্রং (Robert A Strong)-এর মতে, সরল হিসেব বলছে, হ্যাঁ। তবে রাজনীতি কখনও সরল হয় না। আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের চালচলন তো আরও কম সরল। মধ্যবর্তী নির্বাচন মানেই নাটক, হিসেব-নিকেশ আর অনিশ্চয়তা। আমেরিকার গণতন্ত্র (democracy) এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী ও সচেতনই রয়েছে। আগামী ১০ মাসে কী হবে, তা সময়ই বলবে। কিন্তু গত ৩৬৫ দিনে ট্রাম্প যেভাবে বিশ্বকে চমকে দিয়েছেন, তাতে বলা যায়, সম্ভাবনা তাঁর বিপক্ষেই। মধ্যবর্তী নির্বাচন তাঁর ক্ষমতার লাগাম টানতে পারে। পুরো ‘খেপামির’ শেষ না হলেও, অন্তত তার রকমসকম কমতে পারে।