এখন প্রশ্ন উঠছে, সেই লড়াই কি রমজান মাসেই শুরু হবে! নাকি তা হতে হতে ইদ গড়িয়ে যাবে। বিশেষ করে রমজান মাসে মুসলিমদের উপবাসের সময় ট্রাম্প ইরান আক্রমণ করলে, তখন বন্ধু ইসলামি দেশগুলিও আমেরিকার বিরোধিতা করবে।
.jpeg.webp)
ইরানের উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলি ও তার শত্রু ইজরায়েলও এখন সমঝোতার চেয়ে সংঘর্ষের সম্ভাবনাকেই বেশি দেখছে। ছবি এআই দিয়ে তৈরি।
শেষ আপডেট: 21 February 2026 16:23
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ওয়াশিংটন–তেহরান টানাপড়েন দ্রুত সামরিক সংঘাতের দিকে গড়াচ্ছে। এমনটাই বলছেন দুই পক্ষের কর্মকর্তারা এবং উপসাগরীয় ও ইউরোপীয় কূটনীতিকরা। এখন প্রশ্ন উঠছে, সেই লড়াই কি রমজান মাসেই শুরু হবে! নাকি তা হতে হতে ইদ গড়িয়ে যাবে। বিশেষ করে রমজান মাসে মুসলিমদের উপবাসের সময় ট্রাম্প ইরান আক্রমণ করলে, তখন বন্ধু ইসলামি দেশগুলিও আমেরিকার বিরোধিতা করবে। ফলে, প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত দু-একদিনের ভিতরে ইরান আক্রমণ হবে বলে অনেকে আগাম আঁচ করলেও তার কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় উঠছে। যদিও তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে কূটনৈতিক সমাধানের আশা ক্রমেই ক্ষীণ হচ্ছে। ইরানের উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলি ও তার শত্রু ইজরায়েলও এখন সমঝোতার চেয়ে সংঘর্ষের সম্ভাবনাকেই বেশি দেখছে। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর এই প্রথম এত বড় আকারে অঞ্চলটিতে সামরিক মোতায়েন বাড়াচ্ছে আমেরিকা।
ইজরায়েল সরকারের ধারণা, ওয়াশিংটন ও তেহরান আলোচনা অচলাবস্থায় পৌঁছেছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ সামরিক অভিযানের প্রস্তুতিও নিচ্ছে তারা। যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। গত বছরের জুনে সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র–ইজরায়েলের বিমান হামলার পর এক বছরেরও কম সময়ে এটি দ্বিতীয় হামলা হতে পারে। তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলি আশঙ্কা করছে, সেনাসজ্জা মুখোমুখি অবস্থার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে উপসাগরের স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ইজরায়েলের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের অবস্থানের ফারাক প্রায় দূর করা প্রায় অসম্ভব। অদূর ভবিষ্যতে সামরিক উত্তেজনা তীব্র হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। কিছু আঞ্চলিক কর্মকর্তার মতে, ছাড় পাওয়ার আশায় তেহরান বিপজ্জনক ভুল হিসাব কষছে। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশাল সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে এমন অবস্থায় পৌঁছেছেন যে, ইরান যদি স্পষ্টভাবে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি ত্যাগের প্রতিশ্রুতি না দেয়, তবে পিছু হটা তাঁর পক্ষে ‘মুখরক্ষা’র প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে।
সাবেক মার্কিন কূটনীতিক অ্যালান আইয়ারের কথায়, “দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যদি নিজেদের লক্ষ্মণরেখা কেটে সরে না আসে, অর্থবহ কিছুই সম্ভব নয়।” তাঁর মতে, এত বড় সামরিক সমাবেশ ঘটিয়ে ‘মাঝামাঝি’ চুক্তি করে বাহিনী সরানো ট্রাম্পের পক্ষে কঠিন। “হামলা হলে পরিস্থিতি খুব দ্রুত ভয়াবহ হয়ে উঠবে,” সতর্কবার্তা তাঁর।
ইরান–মার্কিন পরোক্ষ আলোচনার দুই দফাই মূল প্রশ্নে আটকে গেছে— ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ। ওমানের মধ্যস্থতাকারীরা ক্ষেপণাস্ত্র–সংক্রান্ত প্রস্তাব সংবলিত একটি খাম ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির হাতে দিলে তিনি তা না খুলেই ফিরিয়ে দেন বলে সূত্রের দাবি। জেনেভায় সাম্প্রতিক বৈঠকের পর আরাঘচি ‘দিকনির্দেশক নীতিতে’ ঐকমত্যের কথা বললেও হোয়াইট হাউস জানায়, দুই পক্ষের মধ্যে এখনও বড় ফাঁক রয়ে গেছে।
শিগগিরই ইরান লিখিত প্রস্তাব দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চুক্তি না হলে “খুব খারাপ কিছু” ঘটবে। তিনি দশ থেকে পনেরো দিনের সময়সীমার ইঙ্গিত দিয়েছেন। পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। হামলা হলে অঞ্চলজুড়ে মার্কিন ঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্য করা হবে। উত্তেজনার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও বাড়তে শুরু করেছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, সামরিক শক্তি ব্যবহারের বিষয়ে ট্রাম্প এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি, যদিও সীমিত হামলার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ইরান প্রসঙ্গে বৈঠক করবেন। শীর্ষ মার্কিন এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সব বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত হতে মার্চের মাঝামাঝি সময় লাগতে পারে।
ইউরোপীয় ও আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান মার্কিন মোতায়েন ইরানে হামলা চালানোর পাশাপাশি নিজেদের ঘাঁটি, মিত্রদেশ ও ইজরায়েলকে রক্ষা করার সক্ষমতা দেয়। ওয়াশিংটনের মূল দাবি অপরিবর্তিত। ইরানের মাটিতে কোনও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চলবে না। ইরান বলছে, পারমাণবিক সক্ষমতা বজায় রাখা তাদের সার্বভৌম অধিকার, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা নয়। তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা অস্বীকার করে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ডেভিড দে রশেসের মতে, আলোচনা ভেস্তে গেলে প্রথম ধাপে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অকার্যকর করা হতে পারে, এরপর হামলা হতে পারে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌ শাখায়—যারা অতীতে তেলবাহী জাহাজে হামলা ও হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকির সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে অনেক ইউরোপীয় ও আরব কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলছেন, ট্রাম্পের শেষ লক্ষ্য কী? কেবল পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দুর্বল করা, নাকি আরও বড় লক্ষ্য— শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন? ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই এবং শক্তিশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা রাষ্ট্রযন্ত্রকে সামরিক হামলা আদৌ বদলাতে পারবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। তাঁদের মতে, যুদ্ধ শুরু করা সহজ হলেও তা নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন। কৌশলগত সাফল্যে রূপান্তর করা আরও কঠিন।
সমঝোতার ইঙ্গিত খুবই কম। খামেনেই–ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা আলি লারিজানি জানিয়েছেন, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উদ্দেশ্য নেই— এ প্রমাণে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার বিস্তৃত নজরদারি মেনে নিতে ইরান প্রস্তুত। তবে প্রকৃত সিদ্ধান্তের চাবিকাঠি খামেনেইর হাতেই, এমনটাই জানিয়েছেন আঞ্চলিক কূটনীতিকরা। তাঁর কাছে সমৃদ্ধকরণ ও ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন সার্বভৌম অধিকারের প্রশ্ন।ওয়াশিংটনের ধারণা, অভূতপূর্ব সামরিক চাপ তেহরানকে নতি স্বীকারে বাধ্য করবে। তেহরানের বিশ্বাস, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে যাওয়ার রাজনৈতিক ইচ্ছা ট্রাম্পের নেই। আর ইজরায়েলের মতে, দুই পক্ষের ফারাক এতটাই গভীর যে সংঘর্ষ প্রায় অনিবার্য।