ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেফতারের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস।

মাদুরোর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস
শেষ আপডেট: 3 January 2026 19:49
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে (Venezuelan President Nicolas Maduro) গ্রেফতারের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস (Cilia Flores)। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ভেনেজুয়েলায় চালানো এক বৃহৎ অভিযানে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে দেশ থেকে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই ঘোষণার পরেই প্রশ্ন উঠছে— কে এই সিলিয়া ফ্লোরেস, যিনি ভেনেজুয়েলার ক্ষমতার অলিন্দে দীর্ঘদিন ধরেই এক প্রভাবশালী মুখ?
শৈশব থেকে আইনজীবী হওয়ার লড়াই
১৯৫৬ সালের ১৫ অক্টোবর ভেনেজুয়েলার উত্তর-পশ্চিমের ছোট শহর টিনাকুইয়োতে জন্ম সিলিয়া ফ্লোরেসের। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। কাঁচা মাটির ঘরে—চরম দারিদ্র্যের মধ্যেই কেটেছে তাঁর শৈশব। পরে ফ্লোরেসের পরিবার কাজের খোঁজে পাড়ি দেয় রাজধানী কারাকাসে। সেখানেই একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে অপরাধ আইন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন ফ্লোরেস।
রাজনীতিতে অনীহা থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রে
ছাত্রজীবনে রাজনীতির প্রতি তেমন আগ্রহ না থাকলেও জীবনের মোড় ঘোরে ধীরে ধীরে। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি একটি পুলিশ স্টেশনে সাময়িক কাজ করতেন— সাক্ষীদের জবানবন্দি টাইপ করাই ছিল তাঁর দায়িত্ব। সেই সময়ে এক পুলিশ গোয়েন্দাকে বিয়ে করে তিন সন্তানের মা হন তিনি। আইন ডিগ্রি পাওয়ার পর দীর্ঘদিন একটি বেসরকারি সংস্থায় ডিফেন্স আইনজীবী হিসেবে কাজ করেন।
‘কারাকাসো’ আর রাজনৈতিক জাগরণ
১৯৮৯ সালে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে ভেনেজুয়েলায় যে ভয়াবহ দাঙ্গা ও গণবিক্ষোভ হয়— ‘কারাকাসো’— সেখান থেকেই ফ্লোরেসের রাজনৈতিক চেতনার জন্ম। পরে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ওই ঘটনাই তাঁর মধ্যে ‘বিপ্লবী ভাবনা’ জাগিয়ে তোলে।
এই সময়েই তাঁর নজরে আসেন তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা হুগো চাভেজ, যিনি ১৯৯২ সালে ব্যর্থ অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেন। চাভেজের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাঁর আইনি লড়াইয়ে পাশে দাঁড়ানোর প্রস্তাব দেন ফ্লোরেস। সেখান থেকেই শুরু তাঁদের ঘনিষ্ঠতা।
মাদুরোর সঙ্গে পরিচয়, ক্ষমতার পথে উত্থান
চাভেজের আইনি পরামর্শদাতা হিসেবেই সিলিয়া ফ্লোরেসের পরিচয় হয় আর এক শ্রমিক নেতা নিকোলাস মাদুরোর সঙ্গে। দু’জনেই তখন ব্যক্তিগত জীবনে বিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্ক গভীর হয়।
১৯৯৭ সালে চাভেজের নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন ফ্লোরেস। পরের বছর চাভেজ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। একই সময়ে রাজনীতিতে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করতে থাকেন মাদুরোও।
কড়া স্বভাবের ‘পাওয়ার ব্রোকার’
২০০০ সালে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন সিলিয়া ফ্লোরেস। সংসদের ভিতরে তাঁর কড়া মনোভাবের জন্য পরিচিতি তৈরি হয়। ২০০৭ সালে জাতীয় পরিষদের স্পিকার হওয়ার পর বিরোধীদের প্রকাশ্যে ‘পাপী’ বলেও আক্রমণ করেন তিনি।
২০১২ সালে হুগো চাভেজ তাঁকে দেশের অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ করেন। চাভেজের মৃত্যুর পর ২০১৩ সালে নিকোলাস মাদুরো প্রেসিডেন্ট হন এবং সেই বছরই বিয়ে করেন সিলিয়া ফ্লোরেসকে।
ফার্স্ট লেডি থেকে ক্ষমতার মুখ
প্রথমে রাষ্ট্রপতি ভবনের অন্দরসজ্জায় কিছু ছোটখাটো বদল আনলেও খুব দ্রুতই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করেন সিলিয়া ফ্লোরেস। অনেকেই তাঁকে ভেনেজুয়েলার শাসকগোষ্ঠীর ‘সবচেয়ে প্রভাবশালী মহিলা’ বলে মনে করেন। কেউ কেউ আবার কটাক্ষ করে তাঁকে ‘লেডি ম্যাকবেথ’ নামেও ডাকেন।
এবার মার্কিন বাহিনীর হাতে গ্রেফতারের খবরে সেই সিলিয়া ফ্লোরেসই নতুন করে বিশ্ব রাজনীতির শিরোনামে। মাদুরোর পাশাপাশি তাঁর ভবিষ্যতও এখন অনিশ্চিত— নজর রয়েছে পরবর্তী মার্কিন আইনি ও কূটনৈতিক পদক্ষেপের দিকে।