সুইৎজারল্যান্ডের দাভোসে (Davos) হতে চলা নান্দনিক সৌন্দর্যের স্কি-রিসর্টে ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরাম (WEF)-এর বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিতেই তাঁর এই সফর।
.jpeg.webp)
বুধবারই তিনি শীর্ষ ব্যবসায়ী ও কর্পোরেট নেতাদের সঙ্গে একটি প্রীতিভোজে (reception) অংশ নেবেন।
শেষ আপডেট: 21 January 2026 17:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) সুইৎজারল্যান্ডের (Switzerland) জুরিখ (Zurich) শহরে পৌঁছেছেন। সুইৎজারল্যান্ডের দাভোসে (Davos) হতে চলা নান্দনিক সৌন্দর্যের স্কি-রিসর্টে ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরাম (WEF)-এর বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিতেই তাঁর এই সফর। সূত্রের খবর, বুধবারই তিনি শীর্ষ ব্যবসায়ী ও কর্পোরেট নেতাদের সঙ্গে একটি প্রীতিভোজে (reception) অংশ নেবেন। তার পর দাভোসে ফোরামের মূল মঞ্চে বক্তব্য রাখবেন ট্রাম্প। এই সফরকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ কৌতূহল তৈরি হয়েছে, কারণ সাম্প্রতিক মাসগুলিতে ট্রাম্পের আগ্রাসী বিদেশনীতি (foreign policy), বাণিজ্য যুদ্ধ (trade war) এবং ইউরোপের সঙ্গে টানাপড়েনের প্রেক্ষিতে তাঁর বক্তব্যে কী বার্তা আসে, সেদিকেই নজর বিশ্বের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলের।
গ্রিনল্যান্ড (Greenland) দখলের প্রশ্নে মার্কিন প্রেসিডেন্ট (US President) ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump) আগ্রাসী অবস্থানের জেরে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাই এবার প্রকাশ্যে বিরোধিতা করছেন। তাঁদের মতে, মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্ব-রাজনৈতিক ব্যবস্থা (US-led global order) কার্যত ভেঙে পড়ছে। ইউরোপীয় নেতারা দাভোসে (Davos) ডেনমার্কের (Denmark) সুমেরু প্রদেশীয় দ্বীপটিকে কেন্দ্র করে জোটবদ্ধ অবস্থান নিতে চাইছেন। যাতে অস্পষ্ট হলেও একটি ইঙ্গিত মিলছে যে, ইউরোপীয় দেশগুলি ট্রাম্পের খামখেয়ালি আচরণ আর বরদাস্ত করতে নারাজ। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (World Economic Forum) বার্ষিক সম্মেলনে ট্রাম্পের যোগ দেওয়ার আগেই স্পষ্ট হয়ে গেছে, তাঁর প্রেসিডেন্সির প্রথম বছরেই বিশ্বের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে (global geopolitical and economic order) বড়সড় ফাটল ধরেছে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট (French President) ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ (Emmanuel Macron) বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) উচিত নয়, সবচেয়ে শক্তিশালীর কথার কাছে মাথা নত করা। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের (United States) বিরুদ্ধে ইইউ-কে ‘বলপ্রয়োগবাদ বিরোধী নীতি’ (anti-coercion instrument) ব্যবহারের কথা ভাবতে হচ্ছে। এটাই প্রমাণ করে পরিস্থিতি কতটা অস্বাভাবিক। ম্যাক্রোঁ আরও বলেন, আমাদের বেশি করে একতা দরকার, বেশি স্থিতিশীলতা দরকার। আমরা কথায় কথায় হেনস্তার (bullies) বদলে সম্মান চাই, আর নৃশংসতার বদলে আইনের শাসন (rule of law) চাই।
ফরাসি প্রেসিডেন্টের এই সোজাসাপ্টা ভাষাই দাভোস জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে ট্রাম্পের উপস্থিতিকে ঘিরে আগে থেকেই কূটনৈতিক উত্তেজনা (diplomatic tension) এবং বাজারে উদ্বেগ (market anxiety) তৈরি হয়েছে। সরাসরি ট্রাম্পের নাম না করেও ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট (European Commission President) উরসুলা ফন ডার লেয়েন (Ursula von der Leyen) বলেন, বিশ্বব্যবস্থায় যে ভূকম্পনের মতো পরিবর্তন (seismic shifts) হচ্ছে, তার মোকাবিলায় ইউরোপকে স্বাধীন পথ বেছে নিতে হবে। তিনি বলেন, এটাই সময়, নতুন এক স্বাধীন ইউরোপ (independent Europe) গড়ে তোলার।
বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী (Belgium’s Prime Minister) বার্ট দে ওয়েভার (Bart De Wever) বলেন, ২৭ সদস্যের ইইউ এখন এক “মোড় ঘোরার জায়গায়” দাঁড়িয়ে আছে। ট্রাম্পকে তুষ্ট করে (appease Trump) ইউক্রেন যুদ্ধ (Ukraine war) নিয়ে সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা ইউরোপকে এক “খুব খারাপ অবস্থানে” এনে ফেলেছে। ডে ওয়েভারের মন্তব্য, “হাসিখুশি অনুগত (happy vassal) হওয়া এক কথা, কিন্তু দুঃখী দাস (miserable slave) হওয়া আরেক।” গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি (tariffs) প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখন পিছিয়ে গেলে নিজ নিজ মর্যাদা হারাতে হবে। আমাদের একজোট হয়ে ট্রাম্পকে বলতে হবে, আপনি অধিকারের শেষ গণ্ডি (red lines) পেরিয়ে যাচ্ছেন।
সবচেয়ে কড়া মন্তব্য করেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী (Canadian Prime Minister) মার্ক কার্নি (Mark Carney)। তিনি বলেন, আমেরিকা-নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা (global system of governance) এখন এক ভাঙনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। কার্নির ভাষায়, আমরা কোনো রূপান্তরের মধ্যে নেই, আমরা ভাঙনের মধ্যে আছি। তথাকথিত নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা (rules-based order) আসলে আংশিক সত্য ছিল। শক্তিশালীরা নিজেদের সুবিধামতো নিয়ম মানত না। তিনি আরও বলেন, কানাডা পুরনো ব্যবস্থার সুবিধা পেয়েছিল, এমনকী ‘আমেরিকান আধিপত্য’ (American hegemony) থেকেও। কিন্তু বাস্তব এখন ভিন্ন। তাঁর মতে, এটা এমন এক বিশ্ব, যেখানে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো অর্থনৈতিক যোগাযোগকে (economic integration) চাপের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, মাঝারি শক্তির দেশগুলোর (middle powers) আর ভাবার সুযোগ নেই যে নিয়ম মানলে নিরাপত্তা পাওয়া যাবে, “তা আর হবে না,” স্পষ্ট ভাষায় বলেন তিনি।
গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা বৃহস্পতিবার ব্রাসেলসে (Brussels) জরুরি শীর্ষ বৈঠক (emergency summit) ডাকতে চলেছেন। ট্রাম্পের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি (trade deal) হওয়ার পর যেসব মার্কিন পণ্যের ওপর ৯৩ বিলিয়ন ইউরো শুল্ক স্থগিত ছিল, সেগুলি ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে আবার কার্যকর হতে পারে। ম্যাক্রোঁ চাইছেন, ইইউ প্রথমবার তাদের ‘অ্যান্টি-কোয়ারশন ইনস্ট্রুমেন্ট’, যাকে অনানুষ্ঠানিকভাবে বলা হচ্ছে ‘ট্রেড বাজুকা’ (trade bazooka), ব্যবহার করুক। এতে মার্কিন সংস্থার জন্য সরকারি টেন্ডার (public tenders) বা ডিজিটাল পরিষেবা (tech platforms) সীমিত করা যেতে পারে।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ডেনমার্কের (Denmark) সার্বভৌমত্ব (sovereignty) কেড়ে নেওয়ার ট্রাম্পের প্রচেষ্টায় ইউরোপের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক মারাত্মকভাবে তিক্ত (soured) হয়েছে। শুধু বাণিজ্য নয়, নানা কূটনৈতিক ইস্যুতেও এই ফাটল স্পষ্ট। হাঙ্গেরি (Hungary) একমাত্র ইউরোপীয় দেশ, যারা ট্রাম্প ঘোষিত ‘বোর্ড অফ পিস’ (Board of Peace)-এ যোগ দিয়েছে। অন্যদিকে, ফ্রান্স এই নতুন সংস্থায় যোগ দিতে রাজি হয়নি। কারণ তারা মনে করছে এটি রাষ্ট্রসঙ্ঘের (United Nations) ভূমিকা দুর্বল করতে পারে।
যদিও এ নিয়ে ট্রাম্প রীতিমতো হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমি ম্যাক্রোঁর ওয়াইন আর শ্যাম্পেনে (wines and champagnes) ২০০ শতাংশ শুল্ক বসাব, তখন দেখবেন সে যোগ দেবে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, দাভোস সফরে তিনি ন্যাটো মহাসচিব (NATO Secretary-General) মার্ক রুট্টে (Mark Rutte)-র সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে বৈঠক করবেন। কিন্তু বাস্তবে গুরুত্বপূর্ণ অনেক দেশই সেই বৈঠকে যোগ দিচ্ছে না। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী সুইৎজারল্যান্ডের স্কি-রিসর্ট দাভোসেই আসেননি ট্রাম্পকে এড়াতে। আর ম্যাক্রোঁও ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা না করেই সুইৎজারল্যান্ড (Switzerland) ছেড়ে চলে যান।
সব মিলিয়ে, দাভোসে উঠে আসা বার্তাটিতে স্পষ্ট— গ্রিনল্যান্ড শুধু একটি দ্বীপ নয়, এটি এখন সেই প্রতীক, যার মাধ্যমে বিশ্বনেতারা ঘোষণা করে দিলেন, ট্রাম্প-যুগে আমেরিকা আর এককভাবে বিশ্বের চালকের আসনে নেই।